মাস্কুলার ডিস্ট্রফি নিয়ে জীবন যাপন

13

ছবি: আক্রান্ত পেশী টিস্যু (ডানে) বিশৃঙ্খল হয়ে যায় এবং dystrophin (সবুজ) এর ঘনত্ব স্বাভাবিক পেশীর (বামে) তুলনায় ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়

 

অনন্যা রায়

 

১৮৬০ এর দিকের একটি মেডিকেল জার্নাল থেকে একটি ছেলের দুর্বলভাবে বড় হওয়ার কথা জানা যায়। ধীরে ধীরে সে তার চলন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। একই দশকে ফ্রান্সে গিউম ডিউশেন (Guillaume Duchenne)  নামের এক স্নায়ুবিশারদ ১৩ জন ছেলের ওপর গবেষণা করে আরও বিস্তারিতভাবে এই রোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। পরে তার নাম অনুসারে Duchenne Muscular Dystrophy (ডিউশেন মাস্কুলার ডিস্ট্রফি) নামে এটি পরিচিত পায়।

পরবর্তীতে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায় যে, এই রোগের একাধিক ধরণ রয়েছে। এরপর মাস্কুলার ডিস্ট্রফি ও তার বিভিন্ন ধরণ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়।

 

মাস্কুলার ডিস্ট্রফিকে সংক্ষেপে এমডি বলা হয়ে থাকে। বংশানুক্রমিক এই রোগ মানুষের পেশীসমূহকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সমস্ত পেশীর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। জন্মের পর থেকে আমাদের প্রত্যেকের শরীরে বেশ কিছু প্রোটিন তৈরি হয় যা মাংসপেশিকে সুস্থ ও সবল রাখার জন্য খুবই প্রয়োজন। কিন্তু এমডি সম্মুখীন ব্যক্তির শরীরে কিছু ত্র“টিপুর্ণ জিন এই প্রোটিন তৈরিতে বাধা দেয়। ফলে ব্যক্তির শরীর দিন দিন দুর্বল হতে থাকে এবং তার চলাফেরার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। মূলত সুস্থ ও সবল পেশী তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের অভাব এর মূল কারণ। যা পেশীর কোষ ও টিস্যুর মৃত্যু ঘটায়। ফলে ধীরে ধীরে শরীরের পেশীশক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। বেশিরভাগ মাস্কুলার ডিস্ট্রফি দেহের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শক্তিহীন করে দিতে থাকে যেমন- হৃদপিন্ড, স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, নিঃশ্বাস ও খাদ্যনালী ইত্যাদি। তবে এমডি প্রতিবন্ধী মানুষদের দেহের বিভিন্ন অংশের কাজ অ-প্রতিবন্ধী মানুষের মতই থাকে। যেমনঃ মাংসপেশীর কাজ, প্রজনন ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ তাদের মস্তিষ্কও সম্পূর্ণ কর্মক্ষম থাকে।

 

মাস্কুলার ডিস্ট্রফির ধরণ-

বর্তমান যুগের গবেষকদের মতে, প্রায় ১৫০ ধরণের মাস্কুলার ডিস্ট্রফি রয়েছে। তার মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত ধরণগুলো হলোঃ Duchenne, Becker, Limb-Girdle, Congenital, Facioscapulohumeral, Myotonic, Oculopharyngeal, Distal, Emery-Dreifuss muscular dystrophy| Duchenne এবং Becker প্রধানত যে কারণে হয় তা হল যে জিনটি X ক্রোমোযোমে থাকে তার পরিব্যাপ্তির কারণে। সাধারণত পুরুষের হলেও কদাচিৎ মহিলাদেরও এই রোগের লক্ষণসমূহ প্রকটভাবে দেখা যায়। ডিউশন এবং বেকার এই দুই ধরণের মাস্কুলার ডিসট্রফি হওয়ার প্রধান কারণ হলো পেশী কোষের ডিসট্রফিন প্রোটিন এবং ডিসট্রফিন সংযুক্ত যৌগিক প্রোটিন তৈরি করতে অবনতি হলে। সাধারণত ৩৩ শতাংশ মানুষের এই রোগ হবার প্রধান কারণ হল ডিসট্রফিন প্রোটিনের পরিব্যাপ্তি আর দেহে বিভিন্ন পুষ্টির অভাব। ডিসট্রফিন হল এক ধরণের প্রোটিন যা কিনা পেশীতন্তুর ঝিল্লিতে পাওয়া যায়। এটি স্ক্রুর ন্যায় প্যাচানো গঠন ¯িপ্রং এর মত কাজ করে। ডিসট্রফিন দেহের ক্যালসিয়ামের স্তর নিয়ন্ত্রণ করে।

 

এমডি সন্দেহ হলেই ডাক্তাররা প্রথমেই রক্তের CPK এর মাত্রা পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। Creatine Phosphokinase (CPK)হলো এমন একটি এ্যানজাইম যা সাধারণত মানুষের রক্তের মাঝে প্রতি লিটারে ২২ থেকে ১৯৮ পর্যন্ত থাকে। এরচেয়ে বেশি বেড়ে গেলে মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড, মাংসপেশী ইত্যাদিতেও নানান সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে রক্তে সর্বোচ্চ পর্যায়ের CPK অর্থাৎ এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে মাস্কুলার ডিস্ট্রফি এর বসবাস রয়েছে শরীরে।

ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফি, ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি, টিস্যু বায়োপসি পরীক্ষাও করা যায়। যদিও আমরা জানি মাস্কুলার ডিসট্রফিতে মাংসপেশির পতন হয় তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেদ বা এক ধরণের কলা বা টিস্যু তৈরি হওয়ার কারণে মাংশপেশী আকারে বড় হয়ে যায়। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে সিউডোহাইপারট্রফি বলে।

 

লক্ষণ ও উপর্সগঃ-

ক্রমাগত পেশীনাশক, দেহের বিভিন্ন হাড়ের সংযোগস্থলে অস্বাভাবিকতা, পেশী খিঁচুনি, কারডিয়োমায়োপ্যাথি, Arrythmia, GowersÕ sign । মাস্কুলার ডিস্ট্রফি বংশানুক্রমিক ভাবে বাবা বা মায়ের শরীর বহন করতে থাকে। অনেক পুরুষ পরেও কোন সন্তান আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত সাত/আট বছর বয়সে বা পরিণত বয়সেও এর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণগুলো হল, ব্যক্তি শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারেন না। হাঁটতে গিয়ে ঘন ঘন পড়ে যান। হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে মেরুদন্ডের হাড্ডি বেঁকে যায়। সমতল স্থান ছাড়া হাঁটতে অসুবিধে হয়। দুর্বলতা বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে চলাফেরার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শ্বাসনালী, খাদ্যনালী ও মুখের পেশীও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়। খাওয়া ফুসফুসে জমে কাশি, কফ ইত্যাদির কারণে নিউমোনিয়া হয় ঘন ঘন। কার্ডিওমায়োপ্যাথিও হয়ে যেতে পারে।

 

করণীয়-

এমডি’র বিভিন্ন শাখা প্রশাখা আছে যার মধ্যে গুরুতর থেকে মৃদু মাত্রাও দেখা যায়। আজ অবধি এর কোন চিকিৎসা আবিস্কৃত হয় নি। কিছু ঔষুধ সেবনের মাধ্যমে গবেষণা চলছে উন্নত বিশ্বে। তাই এমডির লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথেই আজীবন শরীরকে সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন চিকিৎসকগণ। প্রথম থেকেই সাঁতার, ঘোড়ায় চড়া, দীর্ঘক্ষণ পানিতে বসে থাকা এবং হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি নিয়মিত করা উচিৎ। ব্যক্তির শরীরে কম চাপপ্রয়োগ বা শক্তি কম খরচ করে যতটা সম্ভব মাংসপেশীকে সচল রাখার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এতে শরীর  দ্রুত শক্তিহীন হয়ে পড়ে না। অর্থাৎ শরীরের পেশীগুলো সচল রাখতে অন্যের সাহায্যে চলাফেরা এবং প্রাত্যহিক কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া অবশ্য কর্তব্য। কোন কোন ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচথেরাপি অনেকটা সাহায্য করে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অপারেশনের পরামর্শ দিতে পারেন যার মাধম্যে কিছুটা উন্নতি হওয়া সম্ভব।

 

এমডি’র ফলে এক পর্যায়ে শ্বাস প্রশ্বাসের পেশী শক্তিহীন হয়ে শ্বাসযন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমে আসতে থাকে। যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় respiratory failure । এমন অবস্থায় খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর মাংসপেশী শুকিয়ে কাছাকাছি চলে আসে অনেকটা। সঠিক নিয়মে খাওয়া দাওয়া করা না গেলে খাওয়ার কিছু অংশ শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করতে থাকে এবং ঘন ঘন নিউমোনিয়া দেখা দেয়। এদিকে কফ ফেলার এবং খাদ্য চাবানোর শক্তিও কমে যায়। এমনকি কথা বলার শক্তিও কমে আসতে থাকে।

উন্নত বিশ্বে নিঃশ্বাসের কষ্ট বেড়ে গেলে ঘরেই ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়া হয়। অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থাসহ সহজ নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের জন্যে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা নেয়া হয় bi-level device (BiPAP)  মেশিনের সাহায্যে।

 

যদিও অ্যামেরিকান গবেষকদের মতে, Supplemental oxygen without ventilation is very dangerous and in many cases can be very harmful for an persons with Muscular Dystrophy”  কিন্তু বাংলাদেশে অক্সিজেন এখনো সিলিন্ডারের সাহায্যে নিঃশ্বাস নেবার পরামর্শ দেন বেশিরভাগ চিকিৎসক| (BiPAP) মেশিন এদেশে পাওয়া গেলেও মাস্কুলার ডিস্ট্রফি প্রতিবন্ধী মানুষকে ভেন্টিলেশন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয় না একেবারেই।

এমন অবস্থায় শুয়ে বা আধশোয়া হয়ে খাওয়া দাওয়া করা উচিৎ নয়। একেবারে পিঠ সোজা হয়ে বসে সঠিক পদ্ধতিতে খেলে খাওয়া সহজে ফুসফুসে যেতে পারে না। কফ জমার সুযোগ থাকে না।

 

সর্বোপরি, কেউ এমডি সম্মুখীন ব্যক্তির জন্য পরিবারই তার মূল অনুপ্রেরণা বা শক্তি হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমডি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রম হাসিমুখে চালিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পেতে পারেন।