মুক্ত হোক সমাজ যৌতুকের বিষবা®প হতে

15

 

জাহান আরা বেগম হেনা

 

এক্সেস টু জাস্টিস ফর অল পিপল উইথ ডিজএ্যাবিলিটি ইন বাংলাদেশ, ব্লাস্ট এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর আর্থিক সহযোগিতায় চট্টগ্রামে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে আইনি পরামর্শ, মামলা পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে গত ১৮টি মাস কাজ করেছি। প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ে তা হল, প্রতিবন্ধী নারীদের করুণ দুর্দশা, বহুবিবাহ যৌতুক, আর প্রতিবন্ধী মানুষের পারিবারিক সম্পত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানা বাধা বিপত্তি।

 

প্রতিবন্ধী নারীদের পরিবার গঠন অত্যন্ত কঠিন। তার উপর যৌতুক আমাদের সমাজে মরণ ব্যাধী ক্যান্সারের মত মারাত্বক রূপ ধারণ করেছে। যদিও কিছু কিছু পরিবারে ব্যতিক্রম দেখা যায়। দরিদ্র পরিবারের প্রতিবন্ধী নারী, অপ্রতিবন্ধী নারী উভয় শ্রেণির নারীরা স্বামীর হাতে নির্যাতনের স্বীকার। অনেক নারী হারিয়েছে তার দৃষ্টি শক্তি, অনেক নারী বরণ করেছে শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। কত নারী মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে তা আমাদের জানা নাই। প্রতিটি ঘটনার পেছনে মূল কারণ বহু বিবাহ এবং যৌতুক, নারী লিপ্সা ইত্যাদি। শুধু দরিদ্র পরিবারের নারীরা নির্যাতনের স্বীকার তা নয়, সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীরাও রেহাই পাচ্ছে না। কিছু লোভী পুরুষ যৌতুকের জন্য কয়েক বছর পর পর বিভিন্ন স্থানে গিয়ে নতুন পরিচয়ে, নাম পরিবর্তন করে বিয়ের পিড়িতে বসে।

 

পাশাপাশি মোটা অংকের যৌতুক নিয়ে তার খায়েশ পূরণে লিপ্ত হয়। কৌশলে সে ভুল ঠিকানা, ছদ্ম নাম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত নারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর কন্যা দায়গ্রস্ত প্রতিবন্ধী, অপ্রতিবন্ধী নারীদের পিতা মাতা তেমন খোঁজ খবর না নিয়ে নিজের সম্বলটুকু বন্ধক বা বিক্রি করে, কখনো ঋণ করে মেয়ের বিয়ে দেয়। কিছুদিন যেতে না যেতে টাকা শেষ হয়ে গেলে মেয়ের পরিবারের কাছে যৌতুক দাবি করতে থাকে। দাবি পূরণ করতে না পারলে শুরু হয়  শারীরিক মানসিক নির্যাতন। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যে দুই তিনটি সন্তান হওয়ার পর সে পালিয়ে যায়। ছদ্ম নাম, ভুল ঠিকানার কারণে ছেলেটির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে গেলে তারা পড়ে যায় বিপাকে। তারপর মেয়েটির করার কিছুই থাকে না। আর তাতেই পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী, ক্রমশ বাড়ছে বর্বরতা। সহায় সম্বলহীন মাতা পিতার ঘাড়ে সে আবার বোঝা।

 

আমাদের সমাজের সকল স্তরে সকলকে যৌতুক এবং নৃশংস নির্যাতনের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করতে হবে। বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন আর এ পবিত্রতাকে কলংকিত করছে কিছু বিবেকহীন নরপিশাচ। এই লেলিহান অন্ধকার জীবন থেকে মুক্তির জন্য পরিবারের ভ’মিকা অপরিহার্য। পক্ষান্তরে নারীদের সক্ষমতা, সচেতনতা এবং আত্নবিশ্বাস বাড়াতে হবে। কোন অবস্থাতে দূর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।  বিয়ে মানে শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবারের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরী করে। তাই বন্ধ হোক যৌতুক প্রথা, প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য ও ন্যায় বিচার, জয় হোক  ভালবাসার।

 

লেখক: সভাপতি, ওম্যান উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি ডেভেলপম্যান্ট এ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিওডিডিএ)