শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের অনুপ্রেরণা নাম শিরিন বেগম

5

 

অসংখ্য শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের অনুপ্রেরণার এক নাম শিরিন বেগম। অনন্য এই নারী কেবলই স্বপ্ন দেখেছেন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নের। তার এ স্বপ্ন পূরণে রয়েছে দূরদর্শী পরিকল্পনা।

শিরিন বেগম “সোসাইটি অব দ্যা ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাক্সগুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল)” -এর নির্বাহী সদস্য হলেও তিনি পরিচিত বধির মহিলা কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে।

 

অপরাজেয় এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এদেশের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ও নানা বঞ্চনা বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বেশিরভাগ অভিভাবকেরাই ঘরের বাইরে বের হতে দেয় না শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারীদের। তাদের শিক্ষার অধিকার তথা প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবার পেছনে পরিবারকেই দায়ী করেন তিনি। বেসরকারি সংস্থাগুলোও অনেক সময় পরিবার পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না। তবে পারিবারিক উৎসাহ পেলে তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে যাবে এবং সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় হবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের সামাজিক অবস্থান এখনোও অনেক খারাপ। সামাজিকভাবেও তারা বাধাপ্রাপ্ত। সরকারী বা বেসরকারি সংস্থার তেমন সহায়তাও নেই। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই যদি শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষদের সম্পর্কে নেতিবাচক হয় তাহলে তারা প্রতিষ্ঠিত হবেন কিভাবে?’

 

শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলোকে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে শিরিন বেগম আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সরকারি সংস্থাগুলোকেও মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে তাদের শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক উপকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের সরকারি উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিরিন বেগমের মতে সবচেয়ে ভয়াবহতম সমস্যাটি হল শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারীদের যৌন নিপীড়নের বিষয়টি। তবে সরকারের আইনের প্রয়োগ কঠোর নয়। আইনী প্রক্রিয়াগুলো এমন হওয়া উচিৎ তারা যেন ন্যায় বিচার পায়। বাংলা ইশারা ভাষা প্রশিক্ষণে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদেরকে আরও বেশি উৎসাহিত করা উচিৎ। আমাদের অনেকেই বাংলা ইশারা ভাষা জানেন না তাই চাওয়া-পাওয়াগুলোও প্রকাশ করতে পারি না আমরা। শিরিন বেগম বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের প্রথম দাবী, সারা দেশে বাংলা ইশারা ভাষায় পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ এবং প্রচার প্রসারে কাজ করতে হবে। আমি নিজে দেখেছি দেশের অধিকাংশ স্থানেই বাংলা ইশারা ভাষা অনেক রকম। এক্ষেত্রে আমি মনে করি সরকারীভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় একই ধরনের ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ প্রদান করা উচিত যা সবাই ব্যবহার করতে পারবে। বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকারী ও বেসরকারিভাবে বাংলা ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণের মাত্রা বাড়ানো উচিত। তাহলেই সারা দেশে বাংলা ইশারা ভাষার প্রচলন ঘটানো সম্ভব।’

 

ব্যক্তি জীবনে বাবা শামসুদ্দিন হোসেন এবং মা রিজিয়া খাতুনের দুই মেয়ে এক ছেলের মধ্যে শিরিন সবার ছোট। যদিও তাদের ছেলেটি মারা যায়। পরবর্তীতে দুই কন্যাকেই মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় নেন এই দম্পতি। ১৯৪৫ সালে শিরিনের যখন জন্ম হয় শামসুদ্দিন সপরিবারে থাকতেন কলকাতায়। সেখানেই চাকরি করতেন। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়েও পড়ালেখা শুরু করেন ঢাকা মোহাম্মদপুরের একটি স্কুলে। ১৯৬৯ সালে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে একজন অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বিয়ে করতে বাধ্য হন। তার ধারণা ছিলো অ-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবনধারণকে সহজ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবেন না কখনোই। বাবা-মাকে তিনি অনেক বুঝাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। দুর্ভাগ্যবশত তার আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়। যৌতুকের জন্য স্বামী  বিভিন্নভাবে তাকে নির্যাতন করতেন। তবু এই অবস্থাতেই চেষ্টা করেছিলেন সংসার টিকিয়ে রাখতে। বিয়ের বছরখানেকের মাথায় শিরিন বেগমের প্রথম কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তার এক বছর পর ১৯৭১ সালে এই অমানষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাবার বাড়ি চলে আসেন। পরবর্তীতে এই নির্যাতনের প্রতিবাদে মামলা করেন। তার বাবা-মা তাদের ভুল বুঝতে পারেন। তাই তালাক হওয়ার মেয়ের নতুন করে জীবন শুরু করতে উৎসাহ যোগালেন তারা।

 

পরবর্তীতে শিরিন বিভিন্ন জায়গায় চাকরি খোঁজা শুরু করেন। এসময়ই শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মঞ্জুর আহমেদের সাথে পরিচয় হয় তার। শিরিন বেগমকে দেখে এবং তার সাথে কথা বলে মঞ্জুর আহমেদের ভাল লাগে। এক পর্যায়ে তিনি শিরিনের বাবা-মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। ১৯৮০ সালের ৭ই জানুয়ারিতে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৯৩ সালের দিকে শিরিন বেগম ও একজন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারী নাসিমা বেগমের প্রচেষ্টায় তার বাসাতেই প্রতিবন্ধী নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেন। এক বছর ভালই চলে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে নাসিমা বেগমের বাসায় এই কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয় নি। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সাল থেকেই তারা দুজন এবং আরও কয়েকজন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারী মিলে “বধির মহিলা কল্যাণ সংস্থা” গঠন করেন। সে সময় থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেলাই প্রশিক্ষণে কিছু ব্যাংক অনুদান দিয়েছিলো। সেই অনুদান থেকেই সেলাই প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত ভাতা দেয়া হত। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে এই কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে তখন ১৯৯৮ থেকে এখন পর্যন্ত সংস্থার সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

মঞ্জুর আহমেদ এর প্রথম স্ত্রী তারই চাচাতো বোন (অ-প্রতিবন্ধী) ছিলেন। তাদের পরিবারে দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান। পরবর্তীতে মঞ্জুর আহমেদ ও শিরিন বেগমের পরিবারে একজন কন্যার জন্ম হয়। শিরিন বেগম তার সন্তান এবং মঞ্জুর আহমেদের আগের পরিবারের সন্তানসহ সবাইকে মায়ের মমতায় বড় করেছেন। বর্তমানে দুই মেয়ে ছাড়া অন্য সন্তানরা সবাই দেশের বাইরে রয়েছেন। শিরিন বেগম এবং মঞ্জুর আহমেদ তাদের ছোট মেয়ের সাথেই থাকেন। তার স্বামী মঞ্জুর আহমেদ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে মাইল্ড স্ট্রোক করেন। বর্তমানে তিনি একদমই শয্যাশায়ী। শিরিন নিজেই তাকে খাওয়ান। যত্ন নেন। এছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার বধির মহিলা কল্যাণ সংস্থায় আসেন। বিভিন্ন নারীদের সাথে তাদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আলোচনা করেন। তার নিজের পরিবার, স্বামীর সেবাযত্ন আর শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নের সারাজীবন কাজ করে বাকি জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দেয়ার ব্যপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন – ফিরোজা বেগম রানী এবং তানজিলা তারতুসী

(ইশারা ভাষা দোভাষী, এসডিএসএল)