সোমার স্বপ্ন

16

 

আকলিমা খাতুন

 

দূর এক গ্রামের একটি মেয়ে সোমা। ছোট বেলা থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির। সব সময় তার কাজ ছিল ছুটোছুটি আর দুরন্তপনা। তবে সে ছিল অনেক মেধাবী। স্বপ্ন মামার মতো অর্থোপেডিক ডাক্তার হওয়া। পড়ালেখা করতো মনোযোগ দিয়ে। কেবল পাড়া শুদ্ধ লোককে অস্থির করে রাখতো বলে বাবা ও মেজ ভাই মাঝে মধ্যে শাসন করতো। অতিরিক্ত দুষ্টুমির জন্য মা আলাদা লক্ষ্য রাখতেন। প্রচন্ড ভালবাসতেন। শাসন করতে গিয়েও কাছে নিয়ে আদর করতেন। কিন্তু মেজ ভাই ও বাবার কাছে ধরা পড়লে সেদিন আর রক্ষে নেই।

 

দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। সকালে সোমা স্কুল যাবার জন্য তৈরি হতে হতে মাকে বলল, ‘মা খেতে দাও। আজ সকাল করে স্কুলে যাব’। সেদিন ছিল গণিত পরীক্ষা। ১২টার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মা জিজ্ঞেস করল, “কিরে আজ তাড়াতাড়ি যাচ্ছিস। স্কুলে কিছু আছে নাকি?”

সোমা বলল, “আমার গণিত টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, তাই তাড়াতাড়ি যাচ্ছি।”

কথা শুনে মায়ের মন ভরে গেল। মনে মনে বললেন, ‘‘সোনা মা তুই অনেক বড় হ। তোর স্বপ্ন পূরণ হোক।’ যাওয়ার সময় সোমাকে বললেন,’ছুটির পর তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস।’

সোমা মহানন্দে রওনা হল। ১০টা বেজে গেছে। ম্যাডাম পরীক্ষা নেবার জন্য ক্লাসে ঢুকতেই সবাই দাঁড়িয়ে ম্যাডামকে সালাম দিল। পরীক্ষা শেষে সোমা পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে মনে মনে ভাবছিলো, “আল্লাহ আমি যেন পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পাই।”

 

বাসায় ফিরে দেখলো মা কিছু ভাবছে। সোমা জানতে চাইলে মা বললেন, তোর ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম। তুই বড় ডাক্তার হবি সেটাই আমার স্বপ্ন।’’ মায়ের কথা শুনে সোমা বলছিল, “মা তোমার ইচ্ছা পুরণ হবে। কাল থেকে আমি পড়ালেখার প্রতি আরও মনোযোগি হব।’’ মেয়ের কথা শুনে মা খুব খুশি হলেন। মনে মনে আশীর্বাদ করলেন।

সোমা নিয়মিত মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করছে। প্রতিদিন ভোর বেলা ওঠে পড়ে। এখন তার একটাই স্বপ্ন বড় ডাক্তার হবে।

মেয়ের এমন আগ্রহে মা বেশ খুশি। সোমা এক সময়ে স্কুলের পাঠ চুকিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। নিয়মিত কলেজে যায়। তাকে প্রতিদিন ৪০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কলেজ যেতে হত। কলেজের সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু সোমার সুখের দিনে নেমে এলো অন্ধকার। একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় সোমা তার চলন শক্তি হারিয়ে ফেলে। সব স্বপ্ন নিমেষে ভেঙে যায়। একেবারে দিশেহারা হয়ে যায়। কি করবে ভেবে পায় না।

 

আগের মতোই তার ভোরে ঘুম ভাঙে। বিছানায় ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। শুয়ে শুয়ে কাঁদে। সকাল হলে মা তুলে বিছানায় বসিয়ে দেয়। সমস্ত শরীরটা একেবারে শক্তিহীন। সারাক্ষণ বিষণ্ণতায় ভরা থাকতো মুখটা। কারও সাথে কথা বলে না। ভাবে, সবাই কেমন যেন হয়ে গেছে। পরিবারের কেউ তার দায়িত্ব নিতে চায় না। সবাই তাকে বোঝা মনে করে। কিন্তু মা মেয়ের প্রতি এমন অবহেলা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তিনি প্রতিবাদ করলেন। মা ঠিক করলেন, ‘সোমাকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। আগের মত লেখাপড়া করবে। স্বপ্ন পুরণ করবে, সে ডাক্তার হবেই।’

মা বার বার সোমাকে বোঝাতে লাগলেন। হতাশা থেকে তাকে বের করতে সব ব্যবস্থা করলেন। একদিন সকালে সোমার ঘুম ভেঙে গেল। মাকে ডেকে বলল, “মা আমাকে একটু তুলে বসাবে? মা তাকে তুলে বসিয়ে দিলেন। সেদিন নাস্তার পর সোমা বইয়ের তাক থেকে গল্পের বই নামালো পড়ার উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ এক বছর পর সে বই হাতে নিলো। এতদিন সে কেবল চার দেয়ালের ভেতর নিজের মৃত্যু কামনা করেছে। কিন্তু তার মৃত্যু হয় নি।

 

সেদিন সে ‘হেলেন কেলার’ বইটা পড়ে শেষ করল। পড়ে তার মনে হল, এভাবে তো জীবন কাটানো সম্ভব নয়। জীবনে কিছু করতে হবে। মনে মনে ভাবলো, ‘লেখাপড়া একেবারে ছেড়ে দেয়াটা ঠিক না। একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক!’’

বই নিয়ে অনেক পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ কিছুতেই পড়ায় মন বসে না। টপ টপ করে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে।

মা ঘরে মেয়ের এ অবস্থা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। বললেন, ‘ওরে মা কাঁদছিস কেন? এখন বই রাখ, পড়তে হবে না।’ অতীতে যে সোমা একদিনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকত না। আজ সে স্কুল, কলেজ, বন্ধু সবাইকে খুব মিস করতে শুরু করলো।

 

সোমার জীবন দ্রুত পাল্টে যেতে লাগলো। আশেপাশের মানুষদের ব্যবহারও পরিবর্তন হতে লাগলো। এক সময় বন্ধু বান্ধব ও প্রতিবেশীরা  ভাল ব্যবহার করতো, ভালবাসত। আজ তারা সোমার হুইলচেয়ার দেখে দূরে দূরে থাকে। কেউ কেউ নানা কটু কথা বলে, উপহাস করে। সোমা ভেবেছিল তার বন্ধুরা আগের মতই ভালবাসবে। তারাও অনেক মিস করে তাকে। কিন্তু এই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হল। সোমা নিজের প্রতি নিজেই খানিকটা বিরক্ত। প্রতিবন্ধী মানুষ হওয়াটাই কি পাপ, অভিশাপ? এই ভেবে চোখের জল মুছে সোমা। সিদ্ধান্ত নেয়, আর বন্ধ ঘরে বসে থাকা নয়। সমস্ত হতাশা ভুলে আবার শুরু এক নতুন অধ্যায়ের। মাঝে মাঝে গভীর রাত পর্যন্তও জেগে পড়া তৈরি করে সে। কিন্তু কলেজে আর যাওয়া হয় না। কারণ হুইলচেয়ার নিয়ে কলেজে যাবার পরিবেশ ছিল না। তবুও সোমা হাল ছাড়ল না। বাড়িতে বসেই পড়ে সোমা পরীক্ষা দিল। বেশ ভাল ফলাফলও করে।

 

এবার ডাক্তার হবার স্বপ্ন পূরণের পালা। সোমার প্রার্থনা, যেন মেডিকেল পরীক্ষায় টিকতে পারে সে। তাহলে ডাক্তার হবার স্বপ্নটা পূরণ হবে।’’ সে মেডিকেল কলেজে হুইলচেয়ার নিয়ে সোমা তিন তলায় উঠতে পারল না। সারাদিন কলেজে বসে থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষকে বার বার অনুরোধ করেও কোন লাভ হলো না। নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরে কাঁদতে লাগল সে। মাকে বলল, “প্রতিবন্ধিতা আসলেই অভিশাপ?  প্রতিবন্ধী মানুষেরা মানুষ না। তাদের বাঁচার অধিকার নেই? সবার মতো আমিও তো মানুষ! আমারও তো আছে স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার!’’  হতাশ সোমা মাকে বলে, “মা, আমার আর ডাক্তার হওয়া হলো না। আমার স্বপ্ন আর পুরণ হলো না।”