কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিকূলতা এবং তা উত্তরণে করণীয়

16

 

স্বপন চৌকিদার

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক ও আইনগত মর্যাদার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ অপ্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে সমভাবে মূল্যায়িত হন না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সম্পর্কে তাদের মধ্যে কতগুলো নেতিবাচক ধারণা বিদ্যমান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাগুলো সামাজিক বিন্যাস, কুসংস্কার প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত। এসব ধারণা তাদের অধিকার ও আইনগত অবস্থানকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।

 

বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা একইভাবে মানুষের ভুল ধারণার দরুণ বৈষম্যের শিকার হন। তাদের আইনগত সামর্থ্যকে অস্বীকার করা হয় এবং তারা যুক্তিসংগত বাস্তবায়ন থেকেও বঞ্চিত হন।

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বঞ্চিত হন। এখানে আমি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মে প্রবেশের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালে তারা যেসব বাধার সম্মুখীন হন, তা নিয়ে আলোকপাত করেছি।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। তাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ মেধা, দক্ষতা ও সামর্থ্য রয়েছে। তারা এই মেধা, দক্ষতা ও সামর্থ্যকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। একীভূত এবং বাধাহীন সমাজব্যবস্থা তাদের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে পারে।

রিজনেবল অ্যাকোমোডেশন, অবকাঠামোগত প্রবেশগম্যতা এবং সহায়ক সামগ্রী সরবরাহের দ্বারা কর্মে নিযুক্তির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যেন সঠিক ও সুচারুরূপে কর্তব্য পালন করতে পারেন, সে বিষয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কর্মের সুযোগ তাদের জীবনধারণের নিশ্চয়তা ও স্বনির্ভর হওয়ার পথ সুগম করে।

 

কিন্তু তারা সাধারণভাবে উপযুক্ত কর্মে নিযুক্ত হতে বাধার সম্মুখীন হয়। নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষ প্রায়শ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চাকরিতে নিয়োগ দিতে চায় না অথবা দিলেও তাকে পরবর্তীকালে সেখানে রাখতে অনীহা প্রকাশ করে। কর্তৃপক্ষ এ জন্য নানা রকম অজুহাত ও সুযোগ খুঁজতে থাকে। কর্মে নিযুক্তির পরও প্রতিবন্ধী মানুষেরা নানা রকম বাধা মোকাবিলা করেন। এমনকি যেসব ব্যক্তি কর্মে নিযুক্ত থাকার পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন, তাদেরও চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতি বৈষম্য একটি সাধারণ ঘটনা, যার মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, অপসারণ, বেতনভাতা, কর্মবণ্টন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, চাকরির সুযোগ-সুবিধা ও শর্তাবলি।

 

এই বৈষম্য কখনো দৃশ্যমান আবার কখনো অদৃশ্যমান হয়ে থাকে। তবে বিশ্বে ধীরে ধীরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মের সুযোগের বিষয়টি স্বীকৃতি পাচ্ছে। জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ ২০০৬, যা ২০০৮ সালে গৃহীত হয় বিংশ শতাব্দীতে জাতিসংঘের প্রথম দলিল। এর ২৭ অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মে নিযুক্তি ও সুরক্ষা স¤পর্কে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা বর্ণিত হয়েছে। তার সঙ্গে সংগতি রেখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষাবিষয়ক আইন প্রণয়ন করে। যদিও ২০০১ সালে প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিল, তথাপি ওই আইন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার রক্ষায় যথেষ্ট না হওয়ায় ২০১৩ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।

এই আইনের মুখবন্ধ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে জাতীয় আকাক্সক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার সামনে রেখে এই আইন প্রণীত হয়েছে। যার অর্থ, একবিংশ শতাব্দীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা পেয়েছে।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের মুখবন্ধ নিম্নরূপ:

যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে সকল সমঅধিকার, মানবসত্তার মর্যাদা, মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হইয়াছে; এবং যেহেতু বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদ (United Nations Convention on the Rights of the Persons with Disabilities) অনুসমর্থন করিয়াছে; এবং যেহেতু প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে এতদ্সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন রহিতক্রমে পুনঃপ্রণয়নের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।

এবার দেখি এই আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মে প্রবেশসংক্রান্ত কী কী বিধান রয়েছে। এই আইনের ১৬ ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মের সুযোগের বিষয়টি বর্ণিত হওয়ার পাশাপাশি আরও কতিপয় অধিকার বর্ণিত হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে নিম্নোক্ত কয়েকটি দফা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মে নিযুক্তি ও সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট। যেমন:

(১)

(ক) পূর্ণমাত্রায় বাঁচিয়া থাকা ও বিকশিত হওয়া;

(খ) সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে, প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী, পূর্ণ ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ;

(গ) সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মে নিযুক্তি;

(ঘ) কর্মজীবনে প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তি কর্মে নিয়োজিত থাকিবার, অন্যথায়, যথাযথ পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি;

(ঙ) শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রসহ প্রযোজ্য সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও ন্যায্য সুযোগ সুবিধা  (রিজনেবল অ্যাকোমোডেশন) প্রাপ্তি;

(চ) শারীরিক, মানসিক ও কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করিয়া সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে স¤পূর্ণভাবে একীভূত হইবার লক্ষ্যে সহায়কসেবা ও পুনর্বাসন সুবিধাপ্রাপ্তি;

(ছ) মাতা-পিতা বা পরিবারের উপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাতা-পিতা বা পরিবার হইতে বিচ্ছিন্ন হইলে বা তাহার আবাসন ও ভরণ-পোষণের যথাযথ সংস্থান না হইলে, যথাসম্ভব নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন;

 

 

(২) কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে উপ-ধারা (১) এ উল্লেখিত অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা কোন প্রকারের বৈষম্য প্রদর্শন বা বৈষম্যমূলক আচরণ করিতে পারিবে না।

আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কর্মক্ষেত্রে নানা রকম বৈষম্যের শিকার হতে হয়। উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, ন্যায্য সুযোগ সুবিধা অর্থাৎ রিজনেবল অ্যাকোমোডেশন ইত্যাদি উপেক্ষিত হয়ে থাকে, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।

এ ছাড়া সহকর্মীদের অসহযোগিতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মক্ষেত্রকে দারুণভাবে অসুবিধাজনক করে তোলে। অনেক সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাজের স্বীকৃতি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দিতে চান না। কারণ তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে পদোন্নতি দিতে হবে। তা ছাড়া যিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাজের মূল্যায়ন করবেন তার আশঙ্কা, তার সঙ্গেই দীর্ঘদিন সংযুক্ত হিসেবে রেখে দিতে পারে, যা একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা।

 

আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে কতগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন ৪২০ ধরনের কাজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই তালিকা প্রতি তিন বছর পরপর হালনাগাদ করা হচ্ছে। তা ছাড়া প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট সহায়তার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মকাল যেন সহজ ও সুগম হয়, সে বিষয়ে নানা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কতগুলো রয়েছে চাকরিতে প্রবেশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা।

চাকরিপ্রার্থী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যেন সহজে চাকরি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও তাতে উত্তীর্ণ হতে পারেন, সে জন্যও রয়েছে বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা, যা বাংলাদেশে নেই।

যারা শ্রুতলেখকের সহায়তায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন, তাদের জন্য ঘণ্টাপ্রতি অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়।

 

তা ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অন্য একজন সাধারণ পরীক্ষার্থী কিংবা চাকরিপ্রার্থীর তুলনায় ৫ শতাংশ কম নম্বর পেলেও তা সাধারণ পরীক্ষার্থীর সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রার্থীগণ যেন সহজেই পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেন, সে জন্য সুব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে বারবার আবেদন করেও আমরা এখনো তা পাইনি। চাকরিতে প্রবেশের পর কর্মক্ষেত্রে যেন তিনি বাধাহীনভাবে অবদান রাখতে পারেন, সে লক্ষ্যে রয়েছে কতিপয় ব্যবস্থা। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণের লক্ষ্যে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

 

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

* বাধাহীন কর্মপরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা, যেমন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সাদাছড়ি ও আংশিক দৃষ্টিসহায়ক সামগ্রী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য হুইলচেয়ার সরবরাহ, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য শ্রবণযন্ত্র ইত্যাদি। এ ছাড়া রয়েছে কম্পিউটার, স্ক্যানারসহ আধুনিক সফটওয়্যার ও ডিভাইস সরবরাহ।

* কর্মস্থল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহজে প্রবেশগম্য যেন হয়, সে জন্য শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য র‌্যা¤প সুবিধা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য লিফটসমূহে ব্রেইল ও অডিও ব্যবস্থা, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ইশারা ভাষার ব্যবহার ইত্যাদি।

* প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য অতিরিক্ত ১০টি নৈমিত্তিক ছুটির ব্যবস্থা,

* প্রতিবন্ধী চাকরিজীবীর জন্য ১৫ মিনিট পূর্বে অফিস ত্যাগের অধিকার,

* পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান,

* অতিরিক্ত ভাতা বরাদ্দ,

* প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহায়ক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ,

* সরকারি আবাসন, যানবাহন, টেলিফোন সংযোগ ইত্যাদি প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ইত্যাদি। এসব সুযোগ-সুবিধার কোনোটিই বাংলাদেশে দেখা যায় না। এসব সুবিধা অপ্রতুল থাকার দরুন আমরা চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মপরিবেশ আরও সহায়ক ও সুগম হবে বলে প্রতিবন্ধী চাকরিজীবীগণ মনে করেন।

 

বর্ণিত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করলে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও কর্মক্ষেত্রে অন্যান্য অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির মতোই অবদান রাখতে পারবেন এবং আমরা একীভূত সমাজ প্রতিষ্ঠায় এক ধাপ এগিয়ে যাব বলে বিশ্বাস করি।

 

লেখক: সহকারী সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ