চাকরির আশ্বাস, দীর্ঘ দুই বছরের দীর্ঘশ্বাস!

22

টিপু সুলতান

 

নাগরিক অধিকার সত্ত্বেও যোগ্যতানুসারে একটি চাকরির প্রত্যাশায় একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে দ্বারে দ্বারে হতে হয় অবহেলিত, সহ্য করতে হয় যুক্তিহীন কিছু অজুহাতে গড়া অবস্থার। হতে হয় প্রতারিত। এর থেকে মুক্তি কোথায়?

 

আমি মো. টিপু সুলতান। ২০১৩ সালে স্নাতক পাস করার পর আমার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কোচিং সেন্টার এবং একটি ওষুধের দোকান চালু করি। উদ্দেশ্য, নিজের বেকার জীবনের মুক্তি, পাশাপাশি গ্রামের মানুষের সেবা। পাশাপাশি একটি বিদ্যালয়েও শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছিলাম। মোটামুটি ভালোই আয়ের পথ সৃষ্টি হলো। এভাবে চলেছে প্রায় দেড় বছর। ছেলেবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করে এত দূর এসেছি। ভাবছিলাম, আমার যন্ত্রণাময় জীবনের বুঝি সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

 

আমার এক চাচাতো বোন আমাকে প্রায়ই ঢাকার সাভারে সেন্টার ফর রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) কেন্দ্রের কথা বলত। সেখানে ছয় মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী মানুষদের চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে সে জানায়। তার পরামর্শে আমিও অনেক আশায় বুক বেঁধে আগস্ট ২০১৪ তে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের উদ্দেশে আমার জীবনবৃত্তান্ত ও অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিতে সেখানে যাই। সে সময় ভোকেশনালের অফিস সহকারী সুভাসদার সঙ্গে চাকরির ব্যাপারে আলাপ করে জানতে পারলাম, প্র্রশিক্ষণ শেষে গার্মেন্টসের ভালো পদে চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

২২ ডিসেম্বর ২০১৪ তে সিআরপি থেকে আমাকে জানানো হয়, ২০১৫-এর ১ জানুয়ারি থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণে যোগ দিতে হবে। যথাসময়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয় আমার। ২৪ মার্চ সিআরপির মাধ্যমে চাকরির জন্য গণকবাড়িতে বাছাই অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের ডাকা হয়।

 

বাছাই শেষে আমাকে জানানো হয়, কুমিল্লার ইপিজেড ব্র্যান্ডিক্স কারখানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে আমার চাকরি হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে যোগদানের কথা। ২০১৫-এর জুনে প্রশিক্ষণ শেষ হলো। জুলাই-এর ১ তারিখে চাকরিতে যোগদানের কথা ছিল আমার। এখানে বলে রাখা ভালো, প্রশিক্ষণের শেষ দিকে আমি প্রায় সময় সিআরপির মাধ্যমে পাওয়া কারখানাতে ফোনে যোগাযোগ রাখতাম।

সিআরপিতে ভোকেশনালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাক্ষাতের সমন্বয় সাধনের জন্য দায়িত্বরত নূপুর ম্যাডাম এবং কুমিল্লার ইপিজেড ব্র্যান্ডিক্স পূর্ব কথা অনুসারে ১ জুলাই চাকরিতে যোগদান করতে গেলে কোম্পানির স্যাররা রোজার ঈদের পরে যোগদান করতে বলেন। গ্রামের বাড়ি গিয়ে নূপুর ম্যাডামের সঙ্গে ফোনালাপে জানালাম, ঈদের পরে যোগ দিতে বলেছেন তারা। তিনি বললেন, ঠিক আছে, ঈদের পরে আসো।

 

কিন্তু ঈদের পরে বলতে আমাকে প্রায় দুই মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কারণ, রোজার ঈদ শেষে গেলে বললেন কোরবানির পরে এসো। তাদের কথা অনুসারে আবার কোরবানির ঈদের পরে চাকরিতে যোগ দিতে যাই। এবার কারখানার বড় স্যার জানালেন আরও এক মাস পরে যেতে। মাঝে মাঝে ফোনে খোঁজ নিতাম। তখন তারা জানাতেন, চিন্তা করো না, তোমাকে আমরা ডাকব। এভাবে আমি চার মাস ধরে প্রতারিত হয়েছি। সিআরপির ভোকেশনাল কো-অর্ডিনেটর রমেশ হালদারকে সবকিছু খুলে বললাম। তিনি আবার তোমাকে ডাকবে বলে আশ্বাস দেন আমাকে। কিন্তু তা আর হলো না। পুনরায় সিআরপিতে যোগাযোগ করি। নূপুর ম্যাডাম এবার সব শুনে বললেন, আমি আবার তোমার চাকরির ব্যবস্থা করছি। পুনরায় গণকবাড়িতে বাছাইয়ের জন্য গেলাম। ২৫ নভেম্বর ২০১৫ আমার সাক্ষাৎকার নিয়ে সেই বছরের ১ ডিসেম্বর আমাকে আশুলিয়ার সোনিয়া সোয়েটার কারখানায় যোগদানের কথা বলা হয়।

 

এবার ভাবলাম, সত্যিই বুঝি চাকরিটা আমার হয়ে গেল। কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে বুঝি এমনই আচরণ হয়! এই প্রতিষ্ঠান আমাকে ডিসেম্বরের ৫ তারিখে যেতে বলে। উক্ত ১০ দিন ঢাকা থেকে পুনরায় ৫ ডিসেম্বর সেখানে গেলে স্যাররা বলেন, আমাদের এই মৌসুমে কারখানায় তেমন বেশি কাজ নেই। তুমি ফেব্রুয়ারিতে অবশ্যই চাকরিতে যোগ দিতে পারবে। সিআরপির স্যার ও ম্যাডাম দুজনকেই জানাই আমি এবার। তারা বললেন, এত ধৈর্য ধরেছ আর দুই মাস ধৈর্য ধরো। আমি তাদের কথা অনুসারে আরও দুই মাস ধৈর্য ধরলাম। প্রায় আড়াই মাস অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত সিআরপি এবং কারখানা দুই জায়গাতেই নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি। তারা বরাবরই বলেছেন, চাকরিতে যোগদান করবে তুমি। কোনো চিন্তা করো না।

এরপর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সেই কারখানা ও সিআরপি থেকে ফোন করে চাকরিতে যোগদান করতে বলা হয় আমাকে। আমার মনে আনন্দের সীমা নেই। এবার তারাই জানিয়েছে আমাকে। আর সত্যিই কোনো ভয় নেই!

 

কিন্তু অবাক হবার ভাষাও আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম, যখন দেড় বছর ধরে নানাভাবে ভোগান্তি আর হয়রানির পর কারখানায় গেলে আমাকে বলা হয়, তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুসারে তোমাকে কোনো চাকরি দেয়া সম্ভব নয়। এ কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি অনেকবার অনুরোধ করে বলি, স্যার আমাকে প্রায় তিন মাস আপনাদের চাকরির জন্য অপেক্ষা করানো হয়েছে। আমাকে যেকোনো একটি চাকরি দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার আর চাকরি হলো না। আমি ওই দিনই সিআরপিতে গিয়ে নূপুর ম্যাডাম, ভোকেশনাল কো-অর্ডিনেটর রমেশ হালদার ও সিআরপির ম্যানেজার স্যারদের সবাইকে বারবার জানাই আমাকে প্রতারিত করার কথাগুলো। তারা তখন আমাকে একটি জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। আমি সবার কাছে আলাদাভাবে জমা দিয়ে আসার পরেও আজ পর্যন্ত আমার চাকরির কোনো খবর নেই।

 

নতুনভাবে জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে সিআরপিতে গিয়ে আজ আমি সর্বস্বান্ত। কারণ, ছয় মাসের এই প্রশিক্ষণ ও দেড় বছর চাকরির আশ্বাসে ঘোরাঘুরি করতে করতে গ্রামে আমার আয়-রোজগারের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সব হারিয়ে আমি এখন হতাশাময় এক জীবন যাপন করছি। সিআরপিতে না গেলে হয়তো আমি আগে যে অবস্থায় ছিলাম, ধীরে ধীরে এত দিনে আরও উন্নতি করতে পারতাম। পাঠক, আপনারাই বলুন, আমার এখন কী করণীয়?

ইটলা, কিশোরগঞ্জ।