নীতিমালা বন্দি লাল ফিতায়

10

 

সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি কার্যক্রমে অবহেলিত প্রতিবন্ধী মানুষেরা

 

শরিফুল ইসলাম খান

১০০ বছর আগে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন আর আজকের প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এ পরিবর্তন ইতিবাচক ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্যই এ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণেই স্টিফেন হকিং তার বিজ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখতে পেরেছেন।

 

প্রতিবন্ধী মানুষের প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে প্রবেশগম্যতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যেকোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রধানত অপ্রতিবন্ধী মানুষের কথা বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রতিবন্ধী মানুষদের বিশেষ ব্যবস্থায় ওই প্রযুক্তির উপকারিতা ভোগ করতে হয়।

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন-সম্পর্কিত প্রযুক্তির উন্নতি সাধিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী মানুষের প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতার দাবিও জোরালো হয়েছে। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক আইসিটি নীতিমালায় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে এবং সরকার এ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর ও সমন্বিত প্রক্রিয়ায় হচ্ছে, আসুন, তা জানার চেষ্টা করি।

 

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্প প্রধানত প্রযুক্তি ও এর প্রবেশগম্যতার বিষয়গুলো নিশ্চিতকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে আইসিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক কোনো ফোকাল কর্মকর্তা নেই। অটিজম বিষয়ে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকলেও তিনি বর্তমানে বদলি হয়ে অন্য একটি বিভাগের দায়িত্বে আছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কথা হলে সেখান থেকে জানানো হয়, উপসচিব মর্যাদার একজন কর্মকর্তা বর্তমানে সাময়িকভাবে অটিজম-সম্পর্কিত ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এই দায়িত্ব বিষয়ে একেবারেই জানতেন না তিনি।

 

এদিকে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের গৃহীত যেকোনো উদ্যোগে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কোনো সংগঠনের মতামত নেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটটি এখন পর্যন্ত স্ক্রিনরিডার সফটওয়্যার ব্যবহারকারী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সম্পূর্ণ প্রবেশগম্য নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, যদি কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখে জানানো হয়, তাহলে ওয়েবসাইটটিকে প্রবেশগম্য করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইউএনডিপির অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকার এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) নামের যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে, তার প্রতিটি উদ্যোগকে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্য বা উপযোগী করতে সরকারের তরফ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাস্কর ভট্টাচার্য। যিনি ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট হিসেবে বর্তমানে কর্মরত। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এটুআইয়ের ওয়েবসাইটটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রবেশগম্য হবে, এটাই তাদের প্রত্যাশা।

 

এদিকে এটুআই কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে এবং দেশব্যপী নতুন অভিনব চিন্তার খোঁজে তৈরি করা হয়েছে আইডিয়া ব্যাংক নামের একটি ওয়েবসাইট। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষেরা এ সাইটে সম্পূর্ণভাবে ব্রাউজ করতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, এটুআই সাইটটি আসলে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। আইডিয়া ব্যাংকটিকে প্রবেশগম্য করার জন্যও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠনকে এ বিষয়গুলো আরও সক্রিয়ভাবে সামনে আনতে হবে।

 

শেষ কথা: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগসমূহের সমন্বয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স’ নামে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ টাস্কফোর্সের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ টাস্কফোর্স কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ যদি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করা যায়, তবে তা সব প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞরা। তবে এ টাস্কফোর্সেও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির দাবিসমূহ পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নেটওয়ার্কসমূহকে আরও তৎপর হয়ে কাজ করতে হবে। কারণ, আইসিটি নীতিমালা, ২০০৯-এর ‘খ’ অনুচ্ছেদে এই নীতি বাস্তবায়ন মনিটরিংয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনকে নিয়ে কাজ করার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর হলে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি প্রযুক্তিগত বিভাজন দূর হবে বলে আশা করা যায়।