প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গে বৈষম্যের কেবলই বৈষম্য

12

অনুকম্পায় নয়। দয়া-দাক্ষিণ্যেও নয়। সোচ্চার হয়ে অধিকার অর্জন করে নিতে হয়। সম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এবং প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

 

পৃথিবীতে যুগে যুগে তাই হয়ে এসেছে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনের আন্দোলনে মাথানত না করে সোচ্চার হতে হয়েছে। ইতিহাস বলে, ইউরোপ-আমেরিকার মতো বিভিন্ন উন্নত দেশেও তাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে নিজ অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে। শিক্ষা প্রাপ্তি থেকে শুরু করে সম্মানজনক মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণসহ নাগরিক সব অধিকার নিশ্চিতের জন্য যে গোষ্ঠীকে লড়াই করতে হয়, তারা সত্যিকার অর্থেই সাহসী।

 

যদিও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন নই। অথবা সোচ্চার ভূমিকা রাখতে পারি না। চেষ্টাও করি না। ‘আমাদের ছাড়া, আমাদের বিষয়ে কোনো কিছু নয়’ স্লোগানটি পৃথিবীব্যাপী আলোচিত। যা আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা অনেকবার শুনেছি। কিন্তু নিজেদের জীবনধারণে এই স্লোগানের বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কতটা ভেবেছি আমরা! নিজেদের চেতনাকে পরনির্ভশীলতার জঠর থেকে উপড়ে ফেলে দেওয়ার বিষয়ে আমরা কি আদৌ ভাবি?

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়ে যেখানে কথা বলা হয়, সেখানে কাদের প্রতিনিধিত্ব বেশি জরুরি এই প্রশ্ন খোদ আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের করি না। ভাবলেও স্বীকারও করতে চাই না। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন তাদের নিজেদের হাতে, অপ্রতিবন্ধী মানুষের হাতে নয়। কিন্তু আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত যখন অপ্রতিবন্ধী মানুষেরা নির্ধারণ করছে, তখন কি আমরা ভাবতে চেষ্টা করি যে আমরা আসলে পরাধীনতার শিকলে বন্দি?

 

উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় নারী আন্দোলনের দিনগুলোর কথা। নিজেদের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার তীব্র লড়াইয়ের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে একটা সময় গিয়ে পুরুষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে; পুরুষের মাধ্যমে নারীর জীবন নিয়ন্ত্রিত। ফলে নারীর ক্ষমতায়নে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে। তাদের পদচারণা আজ দেশজুড়ে। প্রায় দুই দশকের শক্তিশালী আন্দোলনের মাধ্যমে নারীর অবস্থান আজ সব ক্ষেত্রেই শীর্ষে। কিন্তু তার জন্য শিকল ভাঙার লড়াইয়ে বিদ্রোহী হতে হয়েছে। প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হয়েছে। রাস্তায় নামতে হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য নেওয়া নানামুখী উদ্যোগে সরাসরি তাদের সম্পৃক্ত করে কাজ করার দাবি জানাচ্ছে বেশ কিছু প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন। সরকারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য জাতীয় কমিটি এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন সব পর্যায়ে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি উঠেছে। কারণ, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কোনো অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয় কোনোভাবেই।

 

অথচ সরকারি-বেসরকারি ক্ষমতাসীন পর্যায়ের মানুষেরা প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবির প্রশ্নে কেবলই বিস্মিত হতে জানে। প্রতিবন্ধী মানুষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করবে এ যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের বস্তু। নিজ অধিকার সুরক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধী মানুষ নিজেরাই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে সমাজ এখনো তা ভাবতেই শেখেনি। খুবই সাদামাটা চাওয়া প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব প্রতিবন্ধী মানুষই করবে, কোনো অপ্রতিবন্ধী মানুষ নয়।

কিন্তু এ ধরনের কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধী মানুষকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও নেই।

 

২০০১ সালের কল্যাণ আইনের নীতিসংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে যখন শ খানেক অপ্রতিবন্ধী মানুষের ভিড়ে মাত্র দু-তিনজন প্রতিবন্ধী মানুষ প্রতিনিধিত্বের স্বীকৃতি পায়, তখনো আমরা চুপ থাকি। পনেরো বছর পর বর্তমানের বাস্তবতায় অধিকার আইনের ছায়াতলে এসে আমরা দেখি, এই আইনের জাতীয় কমিটিও একই পথে হাঁটছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর জাতীয় সমন্বয় এবং নির্বাহী দুই কমিটিতে মাত্র একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠই অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি। নেই কোনো নারী প্রতিবন্ধী সদস্যও। নামে বেসরকারি হলেও দুই কমিটিতেই রয়েছেন সরকারি বেতনভোগী কর্মকর্তা। অন্যদিকে আইনের ধারা সরাসরি ভঙ্গ করে নির্বাহী কমিটিতে দুইজন পুরুষের  পরিবর্তে একজন পুরুষ সদস্যের রাখা হয়েছে।

এবং যথারীতি আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এ নিয়ে সোচ্চার হওয়ার সাহস পাচ্ছি না এবং আশ্চর্য রকমের নীরব ভূমিকায় আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আন্দোলনের নেতারা।

 

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী মানুষেরাই হতে পারেন মুখ্য নিয়ন্ত্রক। অর্থাৎ প্রতিবন্ধী মানুষের পরিচালিত সংগঠনের প্রতিনিধি। প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নে তাদের সংগঠনের কোনো বিকল্প নেই এই সত্য আমাদের শুধু বুঝলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।