প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীন যাতায়াতে সাংবিধানিক ও আইনি লঙ্ঘন

14

 

ইফতেখার মাহমুদ রনি

 

এক

মুষলধারে এক পশলা হয়ে যাওয়ার পর যখন টিপটিপ করে ঝরছে বাদলধারা, তখন সাহসের ওপর নির্ভর করে ডান হাতে সাদা ছড়ি ও বাম হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। চোখের ঝাপসা আলোয় কেবল কাদা পানিই সম্বল। কোনো রিকশা, অটোরিকশা বা টেম্পোর সাক্ষাৎ মিলল না। প্রায় এক ফুট পানি মাড়িয়ে গেলাম উত্তরা দক্ষিণখান বাজারে। সেখানে তখন কাদা পানি আর অফিসমুখী যাত্রীর ক্যামেস্ট্রি। নিদারুণ প্রতিযোগিতায় ডারউইনের সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট সূত্রকে হার মানিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ও চোখের জলকে ককটেল বানিয়ে হেঁটে যাত্রা শুরু তিন কিলোমিটারের রাস্তায়। যদিও অর্ধেক পথ যেতেই এক পথিক জোর করে টেম্পোতে উঠিয়ে দিলেন। প্রাথমিক পরীক্ষার ধকল কাটিয়ে পৌঁছলাম এয়ারপোর্ট বাসস্ট্যান্ডে। কোন বাস কোথায় থামবে, তার ঠিক নেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাফিক জ্যাম। বাসে ওঠার জন্য এবার শুরু দ্বিতীয় যুদ্ধের। আমি বাসের আগে দাঁড়াই অথবা বাস আমার আগে। যেন আমার সঙ্গে তার কানামাছি খেলা। সৃষ্টিকর্তার কাছে তাই প্রার্থনা, অন্তত বাসে ওঠার সময় আমি যেন অন্তর্যামী হতে পারি!

 

বাংলাদেশের গণপরিবহনব্যবস্থা প্রতিনিয়ত চোখে আঙুল তাক করে জানান দিচ্ছে, প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীন চলাচলের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। অথচ প্রচলিত ব্যবস্থায় দেখা যায়, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আমরা কেবল আসন সংরক্ষণ করতেই ব্যস্ত। তাদের বাসে উঠতে নিদারুণ সমস্যার সম্মুখীন হওয়া যেন কারোরই চোখে পড়ে না। এ দেশে বাসে লাইন ধরে ওঠার কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে বাসশ্রমিকদের আচরণের কথা বলাই বাহুল্য। এই অবস্থায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্রাচ ব্যবহারকারী ব্যক্তিসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষের বাসে ওঠা যে কতটা দুরূহ, তা কেবল ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। বিশেষত মাঝারি ও গুরুতর মাত্রার শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ, যাদের পক্ষে বাসে ওঠার ভাবনা একমাত্র স্বপ্নেই ।

 

বাস, ট্রেনে হুইলচেয়ার ওঠানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। শহরের রাস্তায় নেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব পরিবহন। যাত্রীদের আচরণও অনেকের মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় পরিবার-স্বজন  একা বের হতে বাধা দেয়। যা আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠানে বা নৈমিত্তিক কার্যক্রমে স¦াধীনভাবে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে প্রতিনিয়ত। অথচ আমাদের সরকার ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘ বাস্তবায়িত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ’ অনুস¦াক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য প্রবেশগম্য যাতায়াত ও পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাধ্য। তা ছাড়া স¦াধীন চলাচলের বাধা সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু অনেকে মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপযোগী বাস-ট্রেন-লঞ্চস্টেশন তৈরি অসম্ভব ও ব্যয়বহুল। অথচ উপযোগী পরিবহন ও স্টেশনসমূহ সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা অনুসরণ করলেই প্রতিবন্ধী মানুষদের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমে যায়।

প্রতিবন্ধী মানুষেরা এখন আর আগের মতো ঘরে বন্দি থাকতে চায় না। শিক্ষা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসংস্থানমূলক কাজে অংশ নিয়ে উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত হচ্ছে তারা। তাই আগের সময়ের চেয়ে তাদের চলাচল বেড়েছে। কিন্তু এ দেশের অধিকাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। যাতায়াতব্যবস্থা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব না হওয়ায় তাদের যাতায়াত খরচ বেড়ে যাচ্ছে ১০ থেকে ৪০ গুণ। আবার চাকরিজীবীদের যাতায়াতের অতিরিক্ত খরচ জীবনমানকে নিম্নগামী করে তোলে।

 

 

দুই

প্রতিবন্ধী মানুষ রাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ ও অধিকার নিয়ে বসবাস করবেএই আমাদের কাম্য। রাষ্ট্রের সব পরিকল্পনা নাগরিকদের উপযোগী করে তৈরি ও সাংবিধানিকভাবেই তার প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি  অনুযায়ী তা অনুসৃত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সময়ের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের স্বাধীন চলাচল বা যাতায়াত অধিকারের বিষয়টি অবহেলিত আজ অবধি।

আমাদের মহান সংবিধানের ১৯.১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের সুযোগের সমতা বিধান নিশ্চিত করার জন্য সচেষ্ট হবার নির্দেশনা রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩৬-এ সকল নাগরিকের দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩২ নম্বর ধারায় ৫ শতাংশ আসন বরাদ্দ করেই আইন প্রণয়নকারীরা তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন। এতেই বোঝা যায়, আইনটি অপ্রতিবন্ধী মানুষদের তৈরি এবং প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠস¦র কতটা দুর্বল। শুধু হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষই নয়, ক্রাচ ব্যবহারকারী, মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নিউরোলজিক্যাল কারণে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ বাসে উঠতে পারেন না বা কষ্ট হয়। তাহলে প্রশ্ন এসেই যায়, আসন সংরক্ষণ কি আদৌ কোনো কাজে আসবে আমাদের?

 

আবার একই আইনের ৩৩ নম্বর ধারায় সব গণস্থাপনা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য উপযোগী করার নির্দেশনা থাকলেও তারা বেমালুম ভুলে গেছেন এর অবকাঠামোগত পাহাড়সম বাধা ডিঙিয়ে তারা কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন!

সরকার সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৬ প্রণয়ন করতে চলেছে, যা ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশের স্থলাভিষিক্ত হবে। অথচ এই আইনে প্রবেশগম্য পরিবহনের বা প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচলের কোনো নির্দেশনা নেই। এমনকি এই আইনের খসড়া প্রণয়ন কমিটিতে মতামত প্রদানের জন্য কোনো প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠনেরও অংশগ্রহণ নেই।

স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি), ২০০৫-এ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্যবস্থা রাখার কথা উল্লেখ করা হলেও গত এক যুগে তা অনুসৃত হয়নি। বাংলাদেশ জাতীয় সড়ক পরিবহন নীতিমালা, ২০০৪-এর তৃতীয় অনুচ্ছেদে সকলের স¦ার্থ সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে যানবাহন পরিচালনা ও জোগানের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া চতুর্থ অধ্যায়ের তৃতীয় অনুচ্ছেদে জনগণের ভূমিকা প্রসঙ্গে সরকারের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কর্তৃপক্ষের কাঠামোতে তাদের স^ার্থ সম্পৃক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সরকার তার সড়ক পরিকল্পনায় জনগণের ভূমিকা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু আজও সরকারের কোনো সড়ক-সংক্রান্ত কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ তো নেই-ই, এমনকি কোনো পরিকল্পনাতেও প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি কোনো প্রকার দৃষ্টিপাতের নিদর্শন মিলছে না।

 

এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১১তম লক্ষ্য ‘টেকসই নগর ও সম্প্রদায়, নগর ও মানব বসতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করে তোলা’ এর দ্বিতীয় নির্দেশনায় সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও প্রবেশগম্য পরিবহন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব পরিবহনব্যবস্থার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আমরা জানি, এই লক্ষ্যমাত্রাসমূহের অগ্রগতি প্রতিবেদন বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারকেও জাতিসংঘে পাঠাতে হবে। সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কেবল কাগুজে উদ্যোগ নয়, বরং বাস্তবমুখী ও কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চাই আমরা।

মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০১২ সালে সে¦চ্ছাসেবী সংগঠন বি-স্ক্যান-এর হুইলচেয়ার র‌্যালিতে এসে বিআরটিসির কিছু বাস হুইলচেয়ার উপযোগী করার প্রতিশ্রুতির পর আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর বি-স্ক্যান নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে বিআরটিসিকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে, যার ফলে ২০১৪ সাল থেকে গাজীপুরের বিআরটিসি বাস ডিপোতে হুইলচেয়ার র‌্যাম্প তৈরির কাজ শুরু হলেও বর্তমানে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে অজ্ঞাত কারণে তা থমকে রয়েছে।

 

তিন

দেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশসমূহের তালিকাভুক্ত। দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হতে চলেছে। কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল তৈরি হচ্ছে, ঢাকায় মেট্রোরেল স্থাপন চূড়ান্ত। দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে দারুণ উন্নতি হচ্ছে। অথচ প্রতিবন্ধী মানুষদের উপযোগী ফুটপাত, রাস্তা, স্টেশন, বাস, রেলের কামরা, নৌযান, বিমানে ওঠার সুব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। যা এ দেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া আমাদের জন্য সত্যিই যন্ত্রণার।

প্রতিবছর খোদ ঢাকা শহরেই ৩০০-এর বেশি গণপরিবহন নিবন্ধন হচ্ছে। অথচ তা জনমুখী করার প্রকৃত উদ্যোগ নেই। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ভাগে ভাগে ৩০০০ বিআরটিসি বাস নামাতে যাচ্ছে। যথারীতি এগুলো হয়তো প্রতিবন্ধী মানুষের অধরাই থেকে যাবে।

 

গণপরিবহনের এই বেহাল দশার কারণে প্রতিবন্ধী মানুষের যাতায়াত খরচ, যাতায়াতকালীন মানসিক চাপ ও পারিবারিক প্রতিকূলতা বেড়ে যায়, তা আগেই উল্লেখ করেছি। আমার প্রশ্ন, এর দায়দায়িত্ব কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে? প্রতিবন্ধী মানুষের দেখভালের দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নিজ হাতে রেখে সড়ক, রেল, নৌ ও বিমানপথের যাতায়াতে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার কীভাবে বঞ্চিত করছে?

এ জন্য আমাদেরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ফোকাল কর্মকর্তাদের সক্রিয় করতে হবে। তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য বাজেট পেশ ও প্রকল্প প্রস্তাবে উদ্যোগী করতে আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

ভুক্তভোগী হিসেবে আমার এ লেখার মাধ্যমে সরকারের কাছে প্রতিবন্ধী মানুষদের কিছু দাবি উপস্থাপন করছি:

   সরকারের বাজেট প্রণয়নের সময় পরিবহন খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব বাস, রেলের কামরা ক্রয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।

   সড়ক পরিবহন আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব গণপরিবহন আমদানিতে প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে।

   বাস প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার সময় ২৫ শতাংশ বাস হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য করার জন্য নীতি তৈরি করতে হবে।

   দেশের সর্বত্র ফুটপাতে র‌্যা¤প ও ট্যাকটাইল ব্লক নিশ্চিত করতে হবে।

   বাস সার্ভিসসমূহকে কাউন্টার সার্ভিস চালু বাধ্যতামূলক করতে হবে।

   নিয়ম মেনে চলার জন্য নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা রাখতে হবে।

   মনিটরিং কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

 

এত কিছুর পরেও প্রতিবন্ধী মানুষের শুধু পত্রিকায় বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দুই লাইন লিখে ঘরে বসে থাকলেই হবে না। প্রতিবন্ধী মানুষকে সংগঠিত হয়ে প্রতিটি দাবির মতো প্রবেশগম্য গণপরিবহনের দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারের কাছে হাজার দাবির মাঝে আন্দোলনহীন ইস্যুগুলো রাতারাতি হারিয়ে যায়। তাই একা সরকারের দোষ দিলে হবে না, প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠনগুলোকেও ব্যর্থতার দায় নিতে হবে সমানভাবে।

 

লেখক: পলিসি এন্ড আ্যডভোকেসি কর্মকর্তা, সিডাব্লিউএফডি এবং যুগ্ম সম্পাদক, ভিপস