বন্দুকের গুলি থেকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়

13

 

 

মেজর মো. জহিরূল ইসলাম

 

কেউ প্রতিবন্ধিতার মুখোমুখি হলে তিনি নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হন। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

আমার জন্ম ১৯৬৬ সালে, টাঙ্গাইল জেলার এক গ্রামীণ সম্ভ্রান্ত পরিবারে। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। ছোটবেলাটা কেটেছে দক্ষিণের বিভাগীয় জেলা খুলনায়। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ওয়াপদা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি। সেখান থেকেই মাধ্যমিক, এরপর বিএল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি অনার্স পাস করি। সম্প্রতি কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বছরব্যাপী একটি শিক্ষাসংক্রান্ত অনলাইন সার্টিফিকেট কোর্সে অংশগ্রহণ করি। যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, ‘সমাজে প্রতিবন্ধিতা: কমিউনিটিভিত্তিক পুনর্বাসন (সিবিআর) এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন শীর্ষক ক্ষেত্রের আওতায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন।’

 

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে দুই বছর ট্রেনিং, এরপর ১৯৮৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর আর্মিতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগদান করি। শুরু থেকেই নানা ধরনের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বদানের গুণাবলি নিয়ে গড়ে উঠেছি। ধীরে ধীরে লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন থেকে মেজর হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ১৯৯৮ সালে জর্জিয়ায় জাতিসংঘের অধীন অবজারভার মিশনে (UNOMIG) পরিদর্শক হিসেবে মনোনীত হলাম। সে বছরের ২১ সেপ্টেম্বর, প্রধান মিলিটারি অবজারভারের এডিসি (এইড-দে-ক্যা¤প) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আমরা একদল বন্দুকধারী দুষ্কৃত কর্তৃক আক্রান্ত (Ambushed) হই। ক্রমাগত গুলিবর্ষণে ও গ্র্রেনেড হামলায় আমি মেরুদন্ডে এবং ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হই এবং ডান পায়ের ওপরের অংশে স্পিøন্টার বিদ্ধ হই।

 

প্রাথমিক চিকিৎসা জর্জিয়াতেই হয়। এরপর আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য ২২ সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুলের (তুরস্ক) আন্তর্জাতিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় আমার ফুসফুস এবং বুকের ডান দিকে বাতাস জমে (নিউমোথোরাক্স)। এ জন্য আমার বুকে ক্লোজড টিউব ড্রেনেজের জন্য একটি টিউব ঢোকানো হয়। হাড় এবং বুলেটের অংশবিশেষ বের করা হয় অপারেশনের মাধ্যমে। এ সময় আরেকবার ফুসফুস এবং বুকের খালি জায়গায় বাতাস জমে। পরবর্তী তিন দিন আমাকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে অচেতন রাখা হয়। তুরস্কে প্রায় পাঁচ মাসের চিকিৎসা শেষে ১৯৯৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার টেক্সাসে ‘দ্য ইনস্টিটিউট ফর রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (TIRR) এ উন্নত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের জন্য গেলাম। সেখানে সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিজের শরীরের যতœ এবং দৈনন্দিন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য অকুপেশনাল এবং ফিজিওথেরাপি দেয়া হয়। প্রাত্যহিক অন্যান্য কার্যক্রমেও অংশগ্রহণ করি। এই সময়টায় অবশ্য আমি শিখেছি কীভাবে নিজে নিজে টয়লেট, গোসলসহ প্রাত্যহিক কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়।

তিন মাসের এক সার্বিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৯ সালের ৫ মে ভিনদেশের হাসপাতাল ছেড়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ঘটল। দীর্ঘ আট মাস পর পরিবারের সঙ্গে মিলিত হলাম। পরবর্তী সময়ে চেকআপের জন্য নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান ¯পাইনাল কর্ড ইনজুরি সেন্টারে ২০০০ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে হয়। আমি জানি, আমার বিবাহিত জীবনে পরিবারের জন্য আমার এই শারীরিক অবস্থা এক দুর্বিষহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তাই চেয়েছিলাম অপেক্ষাকৃত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে। তবে শেষাবধি যতটা আবার না হাঁটতে পারার চিন্তায় ছিলাম, তার চেয়ে বেশি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা ছিল আমার মলমূত্র নিষ্কাশন-প্রক্রিয়া যেন আগের অবস্থায় ফিরে আসে এবং তীব্র ব্যথাময় জীবন থেকে যেন মুক্তি পাই।

 

পরবর্তী কিছু বছর আমার জন্য খুবই যন্ত্রণার ছিল। নতুন এই বাস্তবতা মেনে নেয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। যতই দিন যাচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম, বেঁচে থাকতে হলে নিজের সব মনোযোগ দিতে হবে আমার সন্তানের দিকে এবং সেই সঙ্গে আরও যারা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি আছেন তাদের কল্যাণের জন্য। বুঝতে পেরেছিলাম, অন্যান্য হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তির জন্য উন্নত কিছু করার মাধ্যমেই আমি মানসিকভাবে ভালো থাকতে পারব। ধীরে ধীরে নিজের জীবনে বিধাতার অমোঘ সিদ্ধান্তই মেনে নিই। মেরুদন্ডের আঘাত নিয়ে প্রায় ষোলো বছর কাটিয়ে দিলাম। এখন আমি নিজের ভেতরে অন্য এক কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, যে আমাকে নিয়ে গর্ব করে। আশা করে, আমি এই অবস্থা নিয়েই সমাজে বহুদূর এগিয়ে যেতে পারব।

 

বিপুল জনসংখ্যা-অধ্যুষিত এই বাংলাদেশে প্রতিবছরই বিভিন্ন কারণে মানুষ মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হচ্ছে। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনা, যেমন কোনো গাছ, বাসাবাড়ির ছাদ বা কোনো বাহনের ওপর থেকে পড়ে, সড়ক দুর্ঘটনায়, পানিতে ঝাঁপ দেয়াজনিত দুর্ঘটনায়, গুলিতে আঘাত পেয়ে এবং অন্যান্য আঘাতের ফলে ঘাড়ের বা পিঠের কেন্দ্রীয় স্নায়ুরজ্জু ভেঙে গেলে বা গুরুতরভাবে নষ্ট হলে মেরুরজ্জু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বয়স্ক ও কিশোরদের মধ্যে মেরুরজ্জুর আঘাত বেশি দেখা যায় এবং আমাদের সমাজে নারীদের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়। মেরুরজ্জু হলো স্নায়ুর একটা শ্রেণিবদ্ধ সারি, যা মস্তিষ্ক থেকে নেমে মেরুদন্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই রজ্জু থেকে স্নায়ু আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মেরুরজ্জুর মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে সংবাদ গ্রহণ ও প্রেরণের মাধ্যমে অনুভূতি এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রিত হয়। মেরুরজ্জু ক্ষতিগ্রস্ত হলে, আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের নিচের স্তর থেকে অনুভূতি ও নড়াচড়া করার ক্ষমতা কমে যায় বা লোপ পায়।

 

আমরা প্রায় সবাই হুইলচেয়ারবিহীন একটি জীবনের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু এও ঠিক, অনেকেই নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণের স্বপ্নও দেখেন। সত্যি বলতে, মেরুদন্ডের আঘাত শুধু জড়তা বা চলাচলের অক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ফলে চলাচল ছাড়াও নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন টয়লেট নিষ্কাশন, প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্পিন্ড, শ্বাসপ্রশ্বাস ইত্যাদি নানামুখী সমস্যাই হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের দৈহিক কার্যক্রম শুধু যে বাধাগ্রস্ত হয় তা নয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্বাভাবিকও হতে পারে, যা ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং অনেক যন্ত্রণাদায়ক। শুধু ভুক্তভোগী ব্যক্তিটিই নন, তার পরিবার, স্বজন আর বন্ধুরাও এর মুখোমুখি হন।  স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি দেহের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এটি যে শুধু কিছু অনুভূতির ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় তা-ই নয়, আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে নানা ধরনের অস্বাভাবিক সমস্যারও সৃষ্টি হয়। যেমন আক্রান্ত স্থান বা তার ওপরে বা নিচে খিঁচুনি, অসহ্য যন্ত্রণা বা ব্যথা এবং অটোনমিক ডিসরেফ্লেক্সিয়া নামক সমস্যা ইত্যাদি।

 

অনেক থেরাপি আছে, যা স্পাইনাল কর্ডকে ঠিকমতো কাজ করায় অনেকটা সাহায্য করে। যদিও এগুলো তেমন প্রচলিত নয় এবং সেগুলো এখনো অনেক গবেষণার দাবি রাখে। দেহে স্টেম সেল প্রতিস্থাপন হলো এই ধরনের আঘাতের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি চিকিৎসা, যা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। আমাদের সমাজে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি সম্পর্কে অনেকেই তেমন কিছুই জানেন না। সত্যি কথা বলতে, দুর্ঘটনার আগে আমি নিজেও বিষয়টি নিয়ে সচেতন ছিলাম না।

আমি খুব হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সামনে কোনো পথ দেখছিলাম না। প্রায় দশ বছর এই অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছি। ঘর থেকে খুব একটা বের হইনি। আমাকে নানা বয়সী পথিকের অবাক দৃষ্টির সামনে পড়তে হতো। বাবা-মায়ের বাসায় থাকতাম এবং নিজেকে যতটা পারা যায় বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করতাম। কারও ওপর নির্ভরশীলতা আমার পছন্দ ছিল না বলেই আমাকে কারও কাছে ছোট হয়ে থাকতে হয়নি।

 

২০১০ সালের ৬ মার্চ চ্যানেল আই টিভির একটি টক শো আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেখানে প্রধান আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সমন্বয়কারী সিস্টার ভ্যালেরি অ্যান টেইলর, অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব দ্য ডিজঅ্যাবল্ড পিপল (এড—উডিপি)-এর সেক্রেটারি ও সমন্বয়কারী এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সহসভাপতি প্রয়াত মোহাম্মদ মাহবুবুল আশরাফ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)-এর সভাপতি সাবরিনা সুলতানা ও সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব। এই অনুষ্ঠানে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার ওপর জোর দিচ্ছিলেন সবাই। বেশির ভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই প্রবেশগম্য যানবাহন এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে ঘরে বন্দি হয়ে থাকেন। শিক্ষা কিংবা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এই আলোচনাটি আমার মধ্যে এক প্রচন্ড উৎসাহের জন্ম দেয় এবং তখনই আমি আমার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে ফেলি। তা হলো আমি যত দিন বাঁচব, মানবসেবা করব এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাব।

 

২০১২ সালের ২ মার্চ, শুধু আমার জন্যই নয়, বাংলাদেশের যেকোনো প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। বি-স্ক্যান একটি র‌্যালি এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে আরও অন্যান্য ডিপিও সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে, যার প্রতিপাদ্য ছিল ‘ভেঙে যাক সকল বাধা, তৈরি হোক চলাচলের সমতা’। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং সিস্টার ভ্যালেরি অ্যান টেইলর। এই র‌্যালি অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শুধু নয়, আমার নিজের জীবনেও এক অন্য দিগন্তের সূচনা করে। সেখানেই প্রথমবারের মতো আমি সিস্টার ভ্যালেরির সঙ্গে কথা বলি। যদিও তার সঙ্গে আমার আগেও মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ হতো। তিনি ছাড়াও আমি প্রয়াত শহীদুল ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হই, যিনি আমার মতোই স্পাইনাল কর্ডে আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি আমাকে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিস ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (সিডাব) সম্পর্কে জানান এবং সেখানে যোগদান করতে বলেন। তিনি আমাকে সিআরপিতেও আমন্ত্রণ জানান। ২০১২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আমি প্রথমবারের মতো সিআরপিতে যাই। এ স্থানটি আমার মতো আরও অসংখ্য স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত মানুষের দ্বিতীয় জীবন শুরু করার ভিত্তিভূমি।

 

শক্তি, সাহস, দক্ষতা, ধৈর্য এসব অন্তর্নিহিত শক্তির উৎসগুলো আমাকে শুধু যাদের স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির কারণে কোমরের নিচ থেকে অবশ হয়ে যায়, সেই সব ভাইবোনকে কীভাবে স্বতন্ত্র এবং স্বাভাবিক জীবন কাটাতে হবে, সেই শিক্ষা প্রদানে উৎসাহ দেয়নি। উপরন্তু আমাকে আবার সেই আগের ভালোবাসার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে আমি আগের মতো প্রতিযোগিতামূলক বাধাগুলোর মুখোমুখি হবার সাহস দেখাতে পারছি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রটায় আরও বেশি করে জানার আগ্রহ আমার মনকে সর্বদা উদ্দীপ্ত রাখছে। আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও উন্নত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতাকে এবং নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কিছু করতে চাই। ফলপ্রসূভাবে নিজের জীবনটা কাজে লাগাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আমি যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সমাজ উপকৃত হয়। আমার প্রতিটি দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতাকে নিজের জন্য সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাই।

 

মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত ভাইবোনদের বলব, পরিমিত ও সুষম খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করূন, পেট পরিষ্কার করে টয়লেট করুন এবং ভালো ও অর্থবহ একটি সুন্দর জীবন যাপন করুন। মনে রাখবেন, চাপজনিত ঘা, ঠান্ডাজনিত জ্বর এবং কিডনি ইনফেকশন- এই তিনটি বিষয়ে মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ একটু সচেতন থাকলে অন্য দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

ছয় বছর ধরে আমি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ২০১০ সাল থেকে বি-স্ক্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ সংগঠনের সাধারণ সদস্যও। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবল্ড ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি)-এর কাউন্সিল সদস্য হিসেবে এবং সেপ্টেম্বর ২০১২ থেকে সিডাব-এর সহসভাপতি এবং ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ তে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষদের একমাত্র কণ্ঠস্বর ত্রৈমাসিক ‘অপরাজেয়’-এর প্রথম প্রকাশকাল ২০১২ থেকেই এর একজন সংগঠক এবং লেখক হিসেবে নিয়োজিত আছি।

 

একত্রিশ বছর বয়সে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টায় দাঁড়িয়েছিলাম। যখন আমার সামনে ছিল এক উত্তেজনাপূর্ণ এবং সন্তুষ্টিতে ভরা জীবনের হাতছানি। কিন্তু ১৯৯৮ সালের একটি দিন আমার জীবনের মোড় চিরতরের জন্য ঘুরিয়ে দেয়। তবু জেগে উঠতে চেয়েছি। নিজের মনোযোগ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়েছি। প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি সচেতনতা, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে চলেছি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, প্রতিবন্ধিতা কোনো অভিশাপ নয়!