মায়ের ছায়াতলে হাওয়ার উড়ে চলা

15

সন্ধ্যাকাশে দীপ্যমান আলোকিত ছোট ছোট তারা আমাদের নজর কাড়তে পারে না তেমন। কিন্তু নিজ আলোতেই দ্যুতি ছড়িয়ে যায় অবিরত। রাতের আকাশ আলোকিত করা এমনই এক তারার গল্প আজ।

একটা তারার গল্প; একটা মেয়ের গল্প। মেয়েটা জলরঙে, তেলরঙে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে নিজের ছোট্ট পৃথিবী। সময় পেলে একা একাই বেরিয়ে পড়ে শেষ বিকেলের সোনালি রোদ্দুরের সঙ্গে সখ্য পাতাতে। আশপাশের শতেক ব্যস্ততা-কোলাহলের মাঝের স্তব্ধতা স্থিরচিত্রে বন্দি করতে মগ্ন হয়ে পড়ে কখনো। আচমকা মন ছুটলেই কবুতরের সঙ্গে বাকবাকুম শব্দে উড়ে বেড়ায় বাড়ির উঠোনে। নতুবা দু পায়ে সাইকেল চালিয়ে দূরে ফেলে যায় সব সীমাবদ্ধতা, নিজের ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার। সবকিছুই সম্ভব হয়েছে যে মহীয়সী মায়ের শক্তিশালী ভূমিকায়, এবার তার মুখোমুখি হয়েছিল অপরাজেয়।

সাক্ষাৎকার ও লেখনী: আলম দেওয়ান ও সাজিয়া আফরিন (তন্বী)

 

 

হাওয়া আক্তার। পিতা রহমান মাতব্বর, মাতা রোকেয়া বেগমের সংসারে ১৯৯১ সালের ১৩ জুন মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার ভান্ডারীপুরের টেংরামারী গ্রামে জন্ম তার। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে হাওয়া সবচেয়ে ছোট এবং আদরের সন্তান। তিন বছর বয়সী হাওয়া ডাকলে সাড়া দেয় না। কথাও বলতে শেখেনি। এই ভাবনা পরিবারের সবাইকে যখন ভাবিয়ে তুলেছে, তখন ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানা গেল, জন্ম থেকে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী তাদের এই মেয়েটি। নিম্নবিত্ত পরিবারের আদরের মেয়ের এমন অবস্থায় ভেঙে পড়ে সবাই। কিন্তু হাওয়ার চঞ্চলতা, বুদ্ধিমত্তা দেখে দ্রুত নিজেকে সামলে নেন হাওয়ার মা রোকেয়া বেগম। তিনি বললেন, ছোটবেলা থেকে হাওয়ার ছবি আঁকার প্রতি প্রবল আগ্রহ। খুঁটে খুঁটে এখানে-সেখানে, ঘরের মেঝেতে, দেয়ালে কচি দুহাতে পেন্সিলে এঁকে চলত মনগড়া নানান চিত্র। কখনো ছোট্ট কুটির, সবুজে ঘেরা গ্রাম কিংবা ডানা মেলে উড়ে চলা পাখি ইত্যাদি সে ফুটিয়ে তুলতো নিখুঁতভাবে। মেয়ের এই মেধায় তাকে শিক্ষিত করে তোলার অনুপ্রেরণা জোগায় মায়ের মধ্যে। ভর্তি করিয়ে দিলেন বিজয়নগরে ঢাকা বধির উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেই থেকে হাওয়ার পথচলা শুরু। যে পথে চলতে গিয়ে এসেছে নানা বাধাবিপত্তি। একে তো দারিদ্র্যের কশাঘাত, তার ওপর পাড়া-প্রতিবেশী আর স্বজনদের কটু কথা। নানা রকম কুসংস্কার পদে পদে বিদ্ধ করেছে। যদিও সেসব কথার কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি তারা। সে সময় আশপাশের মানুষ সহনশীলতা দেখায়নি, বরং হাওয়ার প্রতি তাদের আচরণও ছিল প্রতিকূলে।

 

২০০৭ সালে এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৩.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় হাওয়া। তবে পড়ালেখার প্রতি হাওয়ার তেমন আগ্রহ কখনোই ছিল না। ছবি আঁকাতেই ছিল তার মন। পরবর্তীকালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে বিএফএতে অনার্সে চার বছর পড়েছে। ভবিষ্যতে সেখানেই এমএফএ করার ইচ্ছে হাওয়ার। সে বলল, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী শিশু থেকে শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলায় তাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন তার মা। নিম্নবিত্ত সংসারের গন্ডিতে মেয়ের শিল্পী প্রতিভার মূল্যায়ন করতে মাঝে মাঝে হিমশিমও খেয়েছেন হাওয়ার মা। কিন্তু উঁচু-নিচু পথটায় শক্ত করে ধরে রেখেছেন হাওয়ার হাত। হাল ছাড়েননি কোনো দিনও। ভাইবোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহপাঠীরাও অনেক সহযোগিতা করেছে হাওয়াকে।

এ দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পদে পদে মুখোমুখি হতে হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত নানান সমস্যার। নিজের প্রতিবন্ধিতার চেয়ে এই পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো যেন আরও বেশি কণ্টকময় করে তোলে তাদের সম্ভাবনার পথ। তাদেরকে নিয়ে ঘরের বাইরে চলাচলে পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। ভোগান্তিটা যেন সবাই বাড়িয়েই চলে। কমানোর মানুষের সংখ্যা অতি অল্প। তবু এসব যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে হাওয়ার পরিবার তাকে সাহস জুগিয়েছে মানুষের কটু কথাকে কানে না তুলে এগিয়ে যাওয়ার। যেসব অসচেতন অভিভাবক পুনর্বাসন কেন্দ্র কিংবা হোস্টেলের সন্ধান করেন বা তাদের সমাজের বোঝা মনে করেন, তাদের প্রতি হাওয়ার মায়ের আহ্বান, প্রতিবন্ধী সন্তানদের সমাজ ও পরিবারের বোঝা না ভেবে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলুন।

 

সরকারের প্রতি হাওয়ার মায়ের দাবি, প্রতিবন্ধী মানুষদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়সহ কর্মসংস্থান উপযোগী করে তুলতে হবে সমাজব্যবস্থাকে। প্রতিবন্ধী মানুষের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবতার রং দিতে হলে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের পরিবারগুলোকে কোণঠাসা না করে বরং তাদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে প্রতিবন্ধী শিশুকে যথাযথভাবে লালন পালন করার জন্য উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে হবে। বৈষম্য দূরীকরণ ও অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যথাযথ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সোসাইটি ফর ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজারস (এসডিএসএল) থেকে বাংলা ইশারা ভাষায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে হাওয়া। এই সংগঠনের একটি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছে সে। তবে তার মতে, এ দেশে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী মানুষেরা সরকারি স্কুলে সঠিকভাবে বাংলা ইশারা ভাষা শিখতে পারে না। এমনকি পাঠ্যবই থেকেও সঠিক পদ্ধতি পড়ানো হয় না তাদের। এতে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পূর্ণমাত্রায় মেধার বিকাশ হয় না। হাওয়া অভিযোগ করে, তাদের সীমিত কিছু শব্দ শেখানো হয়। এতে তাদের নানা ধরনের বই পড়া কিংবা সমাজ-সভ্যতাকে জানার, বোঝার গন্ডি সীমিত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মরত সংস্থাগুলোকে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে আরও বেশি তৎপর হওয়ার আহ্বান জানায় সে।

 

নাম হাওয়া; হাওয়ার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে যেন তার উড়ে চলা। ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে সে পুরস্কার জিতে নেয় প্রতিবছর। ছবি আঁকার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও দারুণ আগ্রহ। ঢাকা বধির উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বর্শা নিক্ষেপ, দৌড়, রিলে দৌড়, চাকতি নিক্ষেপ, গোলক নিক্ষেপ ইত্যাদি পুরস্কারও পেয়েছে সে অনেকবার।

হাওয়ার প্রিয় চিত্রশিল্পী কেÑ এই প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, সে নিজেই নিজের সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী। নিজের স্বপ্নকে নিজের হাতে বুনে তোলে ক্যানভাসে। তার চিত্রকর্মে ফুটে ওঠে সমাজ আর প্রকৃতির গুপ্তচোরা রং। স্বপ্ন দেখে চিত্রশিল্পী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ওপরেও প্রশিক্ষণ নিয়েছে হাওয়া। সে বলল, এসডিএসএলের কোষাধ্যক্ষ রফিক জামানের সহায়তায় সে এই প্রশিক্ষণ পেয়েছে। তার সহযোগিতায় হাওয়া এখন টিউশনি করে। আশপাশের শিশুদের ছবি আঁকা শেখায়। রংতুলির ক্যানভাসে আরও কিছু শিশুকে স্বপ্নের হাত ধরে বাস্তবতার পথে চলতে শেখায়। যাদের ছোট ছোট আশা আর্ট খাতার মোটা সাদা পাতাজুড়ে রঙিন হয়ে ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে।