চট্টগ্রামের দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বহিষ্কারাদেশ অন্য শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নির্দেশ

9

অপরাজেয় প্রতিবেদক

 

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে সরকারি দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বহিষ্কার আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনের অব্যবস্থাপনা এবং অরক্ষিত অবস্থা সম্পর্কে অন্য সব শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সারা দেশের সরকারি বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পর্যায়ক্রমে অন্য সব বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় এটুআই প্রকল্প পরিচালক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার গত ১১ জুন ২০১৬ বিনা নোটিশে চট্টগ্রামের মুরাদপুর বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। এরপরেই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব . চৌধুরী মো. বাবুল হাসানের কাছে প্রমাণসহ এই বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গন প্রচন্ড নোংরা, আবর্জনায় পরিপূর্ণ এবং অরক্ষিত। দশ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের কাছে জবাব চাওয়া হয়। অপরাজেয় এর এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

বিদ্যালয় ভবনের ভগ্নদশা এবং কর্মচারী সংকটের কথা স্বীকার করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, এখানে অনেক সমস্যা আছে, একথা ঠিক। আমরা উচ্চপর্যায়ে অনেকবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। বাবুর্চি না থাকায় ছাত্রীদের সঙ্গে বুয়া দিয়ে কোনোরকমে কাজ সারিয়ে নিচ্ছি।

 

চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয় এবং এই বিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের ভবনগুলো নতুন করে নির্মাণ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কেন এই বিষয়টি গতি পাচ্ছে না, তা গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বলতে পারবে।

সরেজমিন পরিদর্শনে আরও জানা যায়, সমাজসেবা অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক বরাদ্দ থাকে ৩০০০ টাকা। কিন্তু এই টাকাও যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে বরিশালের বিদ্যালয়টিতে কোনো শিক্ষক নেই। অন্যগুলোর অবস্থাও কম বেশি একই রকম।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রমতে, সারা দেশের অন্য বিদ্যালয়গুলোতেও একই অবস্থা বিরাজমান। বিশেষত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন অভিভাবকেরা। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিদ্যালয়টিতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ রয়েছেন পাঁচজন, তার মধ্য চারজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষক। কারিগরি শিক্ষকের পদটি শূন্য দীর্ঘদিন ধরে। অন্যদিকে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সাতজন নিয়োগের কথা থাকলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ রয়েছেন তিনজন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ৬৮ জনের মধ্যে ৫০ জন আবাসিক হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। তার মধ্যে ৩০ জন ছেলে ও ২০ জন মেয়ে। শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে ৩০ জন।

 

অভিভাবকদের অভিযোগ, পরীক্ষার সময় বই দেখেই লিখতে বলা হয় শিক্ষার্থীদের। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আহমেদ তাহমিদ চৌধুরী এভাবে পরীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার মা প্রধান শিক্ষককে অভিযোগ করেন। কিন্তু শিক্ষক কোনো পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তীতে তাহমিদকে তার অভিভাবক চট্টগ্রামের অন্য একটি সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন

সূত্র জানায়, ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় বই এবং শিক্ষা উপকরণ অপর্যাপ্ত হওয়ায় তাদের শিক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। সবচেয়ে বেহাল দশা আবাসিক হোস্টেলের। দীর্ঘদিন বাবুর্চি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মচারী নিয়োগ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, হোস্টেলের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের রান্নাবান্নার কাজে লাগানোসহ আরও নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।

 

উল্লেখ্য, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে সাবেক এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নিজ অভিজ্ঞতা এবং সরেজমিন ঘুরে এসে সেখানকার বিরাজমান অবস্থা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন পাঠালে তা প্রকাশিত হয় অপরাজেয়র ডিসেম্বর, ২০১৪ সংখ্যায়। সেই প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুরাবস্থা, বখাটেদের উৎপাতের পাশাপাশি মেয়ে শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ছিলো। প্রতিবেদন মতে, সবকিছু জেনেও নীরব ভূমিকায় কর্তৃপক্ষ। বিদ্যালয়ের পাশেই সমাজসেবা কার্যালয় থাকলেও কোনো তদারকি নেই এমন অভিযোগ জানিয়ে বেশ কিছু অভিভাবক মন্তব্য করেন, সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এত সমস্যা নেই।