জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদে পরিবার গঠন এবং স্বাস্থ্যসেবা

11

অপরাজেয় ডেস্ক

 

২০০৬ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ক সম্মেলন’-এর ঘোষণাপত্রের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধী মানুষেরও রয়েছে অপ্রতিবন্ধী মানুষের মতোই একই রকম যৌন চাহিদা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য  স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার।

 

সিআরপিডি’র প্রতিবন্ধী নারীসংক্রান্ত ধারা ৬-এ বলা হয়েছে:

শরিক রাষ্ট্র স্বীকার করে যে প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুরা বহুমুখী বৈষম্যের শিকার এবং এই প্রেক্ষাপটে তারা যাতে সব মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার সমান ও পূর্ণ উপভোগ করতে পারে, সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

গৃহ ও পরিবারের অধিকার-সংক্রান্ত ধারা ২৩-এ বলা হয়েছে:

১. শরিক রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিবাহ, পরিবার, পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব এবং আত্মীয়তা-সম্পর্কিত সব বিষয়ে, অন্যদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে, বৈষম্য দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর মাধ্যমে যেন:

ক) বিবাহযোগ্য বয়সের সব প্রতিবন্ধী আগ্রহী ব্যক্তির মুক্ত ও পূর্ণ সম্মতির ভিত্তিতে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন ও পরিবার গঠনের অধিকার স্বীকৃতি পায়।

খ) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীন ও দায়িত্বশীলভাবে সন্তান সংখ্যা ও জন্মবিরতি নির্ধারণ, বয়স অনুযায়ী প্রজনন ও পরিবার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত তথ্য ও শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত হয়। এই অধিকার চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদ্ধতি যেন তাদের জন্য সহজলভ্য হয়।

গ) অন্যদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে শিশুসহ সব প্রতিবন্ধী নারীর প্রজনন উর্বরতা বজায় রাখা নিশ্চিত হয়।

 

 স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ধারা ২৫-এ কোনোরূপ বৈষম্য না করে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শরিক রাষ্ট্রকে তাগিদ দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো

ক) অন্যদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে একই ধরন, একই গুণ ও মানসম্পন্ন বিনা মূল্যের বা স্বল্পব্যয়ী স্বাস্থ্য কর্মসূচি গ্রহণ ও সেবা প্রদান করবে। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং জনস্বাস্থ্য এই কর্মসূচি ও সেবায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে;

গ)  গ্রামীণ এলাকাসহ সর্বত্র যত দূর সম্ভব গ্রহীতার নিজ এলাকাতেই এই স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবে;

ঘ) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্যদের মতো সমমানসম্পন্ন সেবা প্রদানের জন্য পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করবে। সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নৈতিক মান নির্ধারণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের মানবাধিকার, আত্মমর্যাদা, স্বাধিকার এবং বিশেষ চাহিদা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে তাদের অবাধ ও সচেতন সম্মতির ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবে।

 

 

এক ঝলকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবা

এ দেশে ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী মানুষ বিশেষত নারীরা নিয়মিত কর্মস্থলে বা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন:

বস্তুগত: যানবাহন, সিঁড়ি, সরু করিডোর, রোগীদের জন্য সংরক্ষিত চেয়ার, শারীরিক পরীক্ষার উঁচু বিছানা, প্রবেশগম্য টয়লেট, টেকটাইল ও দিক নির্দেশনা ইত্যাদি অপ্রতুলতা।

মানসিকতা: প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবনটাই গুরুত্বহীনÑ এমন নেতিবাচক ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক চিকিৎসক রোগের মূল কারণ নির্ণয় বা পূর্ণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে তেমন মনোযোগী কিংবা যতœবান হন না।

নীতিগত: প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সহায়ক চিকিৎসা নীতিমালার অভাব, চিকিৎসাসেবীদের অমনোযোগিতা কিংবা নেতিবাচক মনোভাব।

 

যদিও সর্বশেষ ২০১১ সালে প্রণীত বাংলাদেশের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির ১৫টির মধ্যে ১৩তম উদ্দেশ্যটিতে বলা হয়েছে, ‘মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক মানুষের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা’ হবে কিন্তু এ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধী নারী-সহায়ক সেবার কোনো ব্যবস্থাও নেই। এই নীতিমালার কর্মকৌশলের ৩১ নম্বর অনুযায়ী মনোসামাজিকসহ অন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি সাধনে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলা হয়েছে; এমন উদ্যোগ আলোর মুখ দেখুক এটাই প্রত্যাশা।