প্রতিবন্ধী নারীর বিয়ে বনাম সামাজিক ভাবনা

181

এক

‘তুমি স্বাভাবিক নও। তোমার কোনো চাহিদা থাকতে নেই। বন্ধুতার প্রয়োজন নেই। যৌন আকাংক্ষা, পরিবার গঠন, বিয়ে, সামাজিকতা এসবে তোমার অধিকার নেই। এহেন স্বপ্ন মহা পাপ! ওসব তোমার নয়। সুতরাং সমাজের আর দশটা কিশোরী মেয়ের মতো প্রেম/ভালোবাসা/বিবাহ ইত্যাদি ভাবনা বহুদূরের, ভুলেও বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি নজর দিয়ো না তুমি। কারণ, তুমি স্বাভাবিক নও।’

 

ছোটবেলা থেকেই আমাদের চিন্তা আর মননে গেঁথে দেওয়া হয় এসব ভাবনা। দিনের পর দিন এ কাজটি নিঃসংকোচে করে যায় আমাদেরই পরিবার তথা সমাজের স্বজনেরা । উঠতে-বসতে এসব উপদেশ শুনে শুনে বেড়ে ওঠার সময়গুলোতে কিশোরী কন্যাটি ধরেই নেয়, প্রতিবন্ধিতা যার বর্তমান অবস্থা, তার আবার পরিবার গঠন কিসের। তার যেন মন নেই। ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার নেই। জীবনসঙ্গীর হাত ধরে নিজের জগৎটি সাজিয়ে নেওয়ার আকাংক্ষা নেই। যেন তার যৌন চাহিদাও থাকতে নেই। এ ধরনের মানসিকতা নিয়েই বেড়ে ওঠে বেশির ভাগ প্রতিবন্ধী নারী।

 

সমাজের চোখেই এক অপার বিস্ময় প্রতিবন্ধী মানুষ, বিশেষত নারীদের পরিবার গঠনের স্বপ্ন। অধিকাংশের মানসিকতাতেই প্রতীয়মান যে প্রতিবন্ধী নারীর বিয়ে আলোচনার বিষয় হতে পারে না। তারা সন্তান জন্মদান বা প্রতিপালনে সক্ষম সমাজ এমনটি ভাবতেই শেখেনি। নারী-পুরুষের স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদাগুলো কিংবা সহজ করে বলা যায়, প্রতিবন্ধী মানুষের সেক্স, সেক্সুয়ালিটি, সেক্সুয়াল ডিজায়ার ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেরাও অনেকে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। যেন বড় কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ড করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে।

 

দুই

অপরদিকে সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী নারীর তুলনায় প্রতিবন্ধী পুরুষেরা বৈবাহিক জীবনে প্রবেশে বাধার সম্মুখীন কম হয়। আবার তুলনামূলক প্রতিবন্ধী নারীদের বিয়ের হার কম হলেও প্রতিবন্ধী পুরুষদের তুলনায় তাদের বিবাহবিচ্ছেদের হার বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৫-এর ‘ডিজঅ্যাবিলিটি ইন বাংলাদেশ; প্রিভিল্যান্স অ্যান্ড প্যাটার্ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন মতে, আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের পরিবার গঠন প্রক্রিয়া দুইভাবে নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। এক. প্রতিবন্ধী মানুষের বিয়ের চেয়ে বিচ্ছেদের হার বেশি। দুই. সমাজের ধারণা, প্রতিবন্ধী মানুষের বিয়ের প্রয়োজনীয়তা নেই।

বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে প্রতিবন্ধী নারীর পরিবার গঠনে। কারণ, নারী যেভাবে প্রতিবন্ধী পুরুষকে গ্রহণ করছে, কোনো পুরুষ তা পারছে না। আবার অভিভাবকেরা যেমন প্রতিবন্ধী ছেলের বিয়ের কথা ভাবছে, ঠিক একইভাবে প্রতিবন্ধী মেয়ের ক্ষেত্রে তারা ততটাই নির্লিপ্ত, উদাসীন। নানা অমূলক আশঙ্কা বা ভাবনায় প্রতিবন্ধী মেয়েকে আশপাশের কোনো পুরুষের সঙ্গে মিশতে পর্যন্ত বাধা দেওয়া হয় পরিবার থেকে। তার মানে পরিবার, অভিভাবক তথা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে তাদের বৈবাহিক জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে।

 

তিন

স্বাধীন জীবনযাপনে প্রতিবন্ধী নারীকে নানা বাধার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়, এটা সত্য। নিদারুণ এক লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হতে হয়। আবার এর মধ্য দিয়ে অনেকেই শিক্ষাজীবন শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। অনেকেই চার দেয়ালের আঁধারে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদে জীবনধারণকে নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছে। পরিবার বা সমাজের সামনে নিজের পরিবার গঠনের বা বিবাহিত জীবনযাপনের অধিকার নিয়ে প্রতিবন্ধী নারীদের কজন কথা বলার সাহস অর্জন করে!

আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন, বিশেষত নারী সংগঠনগুলো এ নিয়ে কি ভাবছি? আমাদের পরিবারে এ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা আমরা কতটা অনুভব করছি? পরিবার জাগলে পরেই সমাজের ঘুম ভাঙে, তা কি আমরা বিশ্বাস করি? ছোটবেলা থেকে মগজে গেঁথে যাওয়া এই ভাবনা থেকে বেরোতে আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করার বিষয়ে কি ভাবছি?