প্রতিবন্ধী নারীর মাসিককালীন পরিচর্যা এবং প্রজনন স্বাস্থ্য

26

অপরাজেয় প্রতিবেদক

 

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীর বিয়ে, পরিবার গঠন ও মাসিক পরিচর্যার মতো শব্দগুলো একেবারেই অপরিচিত। কারণ অপরিচিত এ শব্দগুলো বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় থাকলেও তার চর্চা এবং বাস্তবায়ন একেবারেই নেই।

গত ২৬ মে ২০১৬ ‘প্রতিবন্ধী নারীর মাসিককালীন পরিচর্যা এবং প্রজনন স্বাস্থ্য, ব্যবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় আলোচকেরা এসব কথা বলেন।

 

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক এবং ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন আখতার প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, অপ্রতিবন্ধী নারীরা যেভাবে অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে এসেছে, প্রতিবন্ধী নারীদেরও সেভাবে বেরিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ে স্কুলগুলোতেও গুরুত্বারোপ করতে হবে। জাসদের কর্ম এলাকায় প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়টি যুক্ত করা এবং ফেনীর নিজ এলাকায় কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

 

বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (বিএমপি)-এর সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, প্রতিবন্ধী নারীদের মাসিককালীন পরিচর্যা এবং প্রজনন স্বাস্থ্ যএই বিষয়ের ওপর মতবিনিময় সভা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমাজের অন্তর্দৃষ্টি খুলল কিছুটা। বিএমপির কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়ে আগে কাজ হলেও এখন থেকে তাদের মাসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

 

মতবিনিময় সভায় পঠিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, প্রতিবন্ধী নারীদের বিয়ে, পরিবার গঠন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় থাকলেও তার বাস্তবায়ন একেবারেই নেই। এমনকি বাংলাদেশ সরকারের নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০১১ তে প্রতিবন্ধী নারীদের একীভূত হবার বিষয়ে খানিকটা উল্লেখ থাকলেও কোথাও নেই তাদের পরিবার গঠনের অধিকারের কথা। জাতীয় বাজেটে তারা বঞ্চিত। এমনকি ২০১৪ সালে জাতীয় পর্যায়ের পরিচালিত হাইজিন বেজলাইন সার্ভেতেও প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী মাসিক পরিচর্যার জন্য নেই সঠিক দিকনির্দেশনা। প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পর্যায়ের এ সংশ্লিষ্ট জরিপে অন্তর্ভুক্তকরণসহ, জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখার দাবি জানানো হয় প্রবন্ধে। এ ছাড়া অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারী এবং মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি সব পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে প্রতিবন্ধী নারীবান্ধব উপযোগী করে তুলতে অনুরোধ জানানো হয়।

 

প্রবন্ধ পাঠ শেষে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেয় প্রতিবন্ধী নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন, মূলধারার নারী সংগঠন, সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিগণ।

২৮ মে ২০১৬ মাসিক পরিচর্যা দিবস উপলক্ষে সমবায় অধিদপ্তর মিলনায়তনে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বি-স্ক্যান। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল কনসার্নড উইমেন ফর ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট (সিডব্লিউএফডি), প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন, সাজিদা ফাউন্ডেশন, ওয়াটারএইড এবং ওয়াশ অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ।

 

প্রতিবন্ধী নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে মূল প্রবন্ধের প্রস্তাবনাসমূহ –

১. প্রতিবন্ধী নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যগত জ্ঞান/চর্চা/আচরন, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য জরুরি সেবার প্রয়োজনীয়তা, প্রাপ্ত সেবার গুন-মান, ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য জাতীয় পর্যায়ে জরিপ পরিচালনাসহ গবেষণা কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কর্মসূচি হাতে নেয়া

২. প্রতিবন্ধী নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবা’র সংবেদনশীল বিষয়গুলো স্বাস্থ্য নীতি’র অন্তর্ভুক্তি ও তার বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করা; নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর সেবার মান পর্যালোচনা করা

৩. জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধী নারীর হাইজিন ও প্রজননস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখাসহ অসচ্ছল ভাতা বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে প্রতিবন্ধী নারীর বিষয়ে উলে¬খ করা

৪. নারী উন্নয়ন নীতিমালার অধীনে তৈরি কর্ম পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে কাজ করা

৫. অ-প্রতিবন্ধী নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রস্তাবিত প্রকল্প বা কর্মসূচী প্রতিবন্ধী নারীবান্ধব করার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা

৬. অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারী এবং মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণ

৭. ভবঘুরে বা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য করণীয় নির্ধারণ

৮. উপজেলা, জেলাসদর, মাতৃসদন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ‘স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা’ বিভাগে প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের জন্য প্রতিবন্ধী নারী সহায়ক কর্নার রাখা

৯. দেশের সকল স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীর হাইজিন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্তত একজন করে কর্মী নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ এবং তাদের কাজ সুষ্ঠভাবে মনিটরিং করা (এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডাক্তার বা নার্স নয় বরং সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বস্তরের  কর্মচারীদের এমনকি হুইলচেয়ার বা স্ট্রেচার বহনকারী, ল্যাব-টেকনিশিয়ান ইত্যাদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে)

১০. ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধী নারীদের সেবা ও তাদের প্রতি হয়ে যাওয়া বৈষম্য রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ

১১. প্রজননস্বাস্থ্য সেবা ও তথ্য, প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজে গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা

১২. প্রতিবন্ধী নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবা’র বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের উৎসাহী বা আগ্রহী করে তোলা।

১৩.গুরুতর প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য পরিবারের মধ্য হতে একজন ‘সাহায্যকারী’ নির্বাচন করা; সাহায্যকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীর পছন্দের বিষয়টি মনে রাখা জরুরি

১৪. তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিবন্ধী নারী’র ‘সাহায্যকারী’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচী অধিগ্রহন ও সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনা করা

১৫. প্রজননস্বাস্থ্য সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো যতখানি সম্ভব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করে তোলা ও প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য উপযোগী যানবাহন এর ব্যবস্থা করা