প্রভেদ

7

ফারজানা জ্যোতি

 

তুমি বলছ আমি আর তুমি দুজনেই সৃষ্টির সেরা মানুষ। দেখো, আমাকে অন্য দশজনের মতো। মুখেও তা বলো। কিন্তু সত্যিই কি অনুভব করতে পারো?

ঠিক আছে, ধরে নিলাম করুণা নয়, কিন্তু বলো, তবুও এত বৈষম্য কেন তোমার আর আমার মধ্যে?

 

তোমার পড়তে ভালো লাগে না, তাও তুমি বাধ্য শিক্ষ্যালয়ে যেতে। বাবা-মায়ের অর্থের অভাব থাকলেও তোমাকে মানুষ করে গড়ে তুলতে তাঁরা দিনরাত এক করেন অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে। কিন্তু এসব কেবলই সম্ভব হয় তোমার বেলায়! তবে আমার বেলায় এত শত বাধা কেন? আমিও তো তোমার মতো তাঁদেরই সন্তান।

মানুষ সবকিছুতেই পূর্ণতা পায় না, একটা কমতি থাকবেই…কিন্তু তোমার-আমার কমতিতে আকাশ-পাতাল ব্যবধান কেন?

 

তুমি চাইলেই পারো ঘণ্টায় পুরো শহর ঘুরে বেড়াতে। আর আমি বাসার সামনের রাস্তাটায় আসতেই লাগে দেড়-দুই ঘণ্টা। সঙ্গে অজস্র পরিশ্রম!

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দাও তুমি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে চৌদ্দবার। আর আমার বেলায় সময়জ্ঞান এবং সবার সুবিধা মাথায় নিতে হয়। ঘণ্টা দেড়েক কিংবা তিনেক কখনো তার চেয়েও হয়তো বেশি সময় নিজেকে সামলে রাখতে হয় হোক না গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। আমাকে দুই দিন পরপরই গোসল করতে হবে। তারপরও কীভাবে বলো তুমি আর আমি এক?

 

তোমার বেলায় ভালো লাগতেই পারে যে কাউকে। মনে জাগতে পারে ভালোবাসা। হোক না হাফ সেঞ্চুরি, ইচ্ছেমতো সম্পর্কের পরেও সমাজের অলিখিত নিয়মে তোমার জীবনসঙ্গী হতে পারে যে কেউ। আবার খাপ খাওয়াতে না পারলে পরিবর্তন করতেও নেই কোনো বাধা!

আর আমার বেলায়? ভালো লাগলেও বলতে নেই, ভাবতে নেই! আমার জন্য জীবনসঙ্গী মানে আকাশ-কুসুম স্বপ্ন! এমতাবস্থায় কীভাবে বলছ তুমি আর আমি এক?

 

তোমার সামনে অনুমান করা ভবিষ্যৎ, চেষ্টা করলেই পারো মনের মতো গড়ে নিতে। কিন্তু আমি? আমার সামনে কেবলই অন্ধকার, যেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনই দায়, সেখানে এই ব্যাপারটা নিতান্তই বিলাসিতা।

অথচ চাইলেই সম্ভব মানুষে মানুষে এই ‘বৈষম্য’ এড়াতে। ভেদাভেদ ঘোচাতে। শুধু দরকার মনুষ্যত্ববোধ আর রুচিশীল মননের সমাজ।

 

একেকজনের বৈচিত্র্য একেক রকম, আমারটা না হয় তোমার থেকে একটু বেশিই জটিল। এটা মেনে কি পাশে দাঁড়ানো সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব, ইচ্ছে হলেই সম্ভব। মানুষ চাইলেই সব পারে এ জন্য শুধু দরকার স্বার্থহীন, উদারতাসমৃদ্ধ মন।

তুমি কালো, ফর্সা, মোটা, পাতলা, বেঁটে, লম্বা যা-ই হও না কেন, তোমার জন্য আছে কোনো একজন কিন্তু আমার বেলায়!

 

কেউ বোকা বা সহজ-সরল হলে সবাই বলে, ওর সঙ্গী যেন উল্টো, মানে চালাক হয়, তাহলে সংসার সুন্দর হবে।

আমার বেলাতেও তো এমনটা হতে পারত… যার পা দিয়ে আমি পৃথিবী ঘুরব। ফিরে এসে আমাকে গল্প শোনাবে… আমি মুগ্ধ হয়ে শুনব। তার দেখাতেই আমার দেখা, অপূর্ণতা পূর্ণ হবে।

কেন আমার বেলায় এটি সম্ভব নয়? আমার এই শারীরিক বৈচিত্র্যের জন্য দায়ী কি আমি?

 

যার দৃষ্টিশক্তি নেই, সে তার সঙ্গীর চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখতে চায়। চায় কেউ একজন তাকে ভালোবাসুক, যে ভালোবাসাটা শুধু ওই একটা মানুষই পারে দিতে… এটা কি তার খুব বেশি চাওয়া? এতে কি স্বার্থপরতা প্রমাণ পায়?

তোমরা সব পারো… কেন পারো না সমাজকে বদলে দিতে? দূর কোনো ভিনদেশির জন্য রাস্তায় নেমে পড়ো আন্দোলনের হুজুগে, কিন্তু তোমার পাশের বাসার হুইলচেয়ারে আবদ্ধ মানুষটা যে ‘প্রতিবন্ধী’ নামকরণ নিয়ে গুমরে কাঁদে, তার জন্য কেন সম্মান নেই তোমার!

 

তোমাদের মতো করে একটু বাঁচতে চাই, দুনিয়া উপভোগ করতে চাই… খুব বেশি কি আমাদের চাওয়া?