বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানববন্ধন অবিলম্বে বিএনবিসি বাস্তবায়নের দাবি

12

অপরাজেয় প্রতিবেদক

 

ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের মানববন্ধন সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার দাবিতে। ১২ দফা দাবির মধ্যে মূল দাবি ছিল বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) অবিলম্বে প্রণয়ন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদার ভিন্নতা বিবেচনায় তা দ্রুত বাস্তবায়ন।

 

মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের বিষয়গুলোর বাস্তবায়নে সমাজের ক্ষমতাসীনরা বরাবরই উদাসীন বলেই দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে বিএনবিসি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, বিএনবিসি কার্যকর করতে এই বিলম্বের ফলে এবং ক্ষমতাসীনদের টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যা সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছিল, তা সংযোজন-বিয়োজনের নামে পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস ২০১৬ উপলক্ষে গত ২১ মে ২০১৬ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত করে এই মানববন্ধন আয়োজন করে প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ এন্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষেরা সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার দাবিতে যোগ দিয়েছিল এখানে।

 

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী অন্য সংগঠনসমূহের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সোসাইটি অব দ্য ডেফ এন্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজারস (এসডিএসএল), সোসাইটি ফর ইউনিক কেপাবল সিটিজেনস (এসইউসিসি), ফুলবাড়িয়া প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা, মুক্তি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ডিজঅ্যাবিলিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এইচডিডিএফ), বাংলাদেশ ছাত্র বধির সংস্থার সদস্যগণ। এছাড়াও শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবি প্রতিবন্ধী মানুষের উপস্থিতিও ছিল।

সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে অবকাঠামো ও উপরিকাঠামোগত উভয় দিকের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি নীতিমালা ও কার্যক্রমে বাংলা ইশারা ভাষাকে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্রেইল ও বড় হরফের ডকুমেন্ট প্রিন্টিং বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দেওয়া হয় মানববন্ধনে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদার ভিন্নতা মাথায় রেখে অনতিবিলম্বে প্রবেশগম্যতা-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করার উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান বক্তারা। তবে অবশ্যই এসব কর্মকান্ডে জোরালো পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহকে সম্পৃক্ত করে কাজ করার জোর দাবি জানান তারা সরকারের কাছে। সরকারিভাবে বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস পালন করা উচিত বলেও মনে করেন বক্তারা।

 

উল্লেখ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ২০১২ সাল থেকে বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। তবে ২০১৫ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতিবছর মে মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার দিবসটি পালন করা হবে বিশ্বব্যাপী। আয়োজক সংস্থা এ বছর দিবসটি দ্বিতীয়বারের মতো পালন করল।

 

 

বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত কোড ২০১৬ অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের জাতীয় নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি)-এর পক্ষ থেকে ১২ দফা দাবিসমূহ

 

১. বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত কোড ২০১৬ অবিলম্বে দ্রুত বাস্তবায়ন ও জোরালো মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের সরকারি পরিষেবা প্রদানকারী ভবনগুলোকে আদর্শ প্রবেশগম্য ভবন হিসেবে গড়ে তোলা

২. প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহকে (ডিপিও) সঙ্গে নিয়ে স¦ল্প সময়ের মধ্যে অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা 

৩. প্রতিবছর সরকারি-বেসরকারিভাবে তৈরি করা নতুন ও পুরোনো ভবনগুলো সংস্কার করে অ্যাকসেসিবিলিটির অবস্থার পরিসংখ্যান প্রকাশ করা

৪. সব সরকারি নীতিমালা ও কার্যক্রমে বাংলা ইশারা ভাষাকে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্রেইল ও বড় হরফের ডকুমেন্ট প্রিন্টিং বাধ্যতামূলক করা

৫. সরকারি ও বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের উপযোগী করে তৈরি করতে Web Content Accessibility Guidelines (WCAG) 2.0 অনুসরণ করা

৬. দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও স¦ল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তার জায়গা থেকে তাদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সফটওয়্যার, মোবাইল, কম্পিউটারে ব্যবহারের সহায়ক উপকরণসমূহ সহজলভ্য করা

৭. প্রবেশগম্যতা বিষয়ে রিসার্চ এবং উন্নয়ন খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহে ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া

৮. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদার বিষয়ে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা

৯. সরকারের সিআরপিডি বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পক্ষ থেকে সব মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ে সক্রিয় করা

১০. ইন্টারনেট সেবার মূল্য প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের সাধ্যের আওতায় আনা

১১. বিভিন্ন মোবাইল ফোন তৈরির কোম্পানিকে প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা অনুযায়ী মোবাইল ফোন তৈরিতে উৎসাহিত করা এবং BBC Mobile Accessibility Standards and Guidelines অনুসরণ করা এবং

১২. সরকারি সহায়তায় বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস পালন করা।