‘ভবন পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া সঠিক নয়; কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতাই দায়ী’

16

 

অধ্যাপক জেবুন নাসরিন, স্থাপত্য বিভাগ, বুয়েট

 

বাংলাদেশের ভবনগুলোসর্বজনীন প্রবেশগম্যতার নিয়মানুসারে যথাযথ পর্যবেক্ষণ করা হয় না। সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকল্পে নেই কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা। এছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবেও এই প্রক্রিয়া সঠিক হয় না এমনটি মনে করেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক জেবুন নাসরিন।

 

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি), গৃহায়ণ এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত বিভাগসহ স্থাপত্য অধিদফতর, এইচবিআরআই, নগর উন্নয়ন অধিদফতরের মতো সংস্থাগুলো, যারা স্থাপনা নির্মাণের বিষয়গুলো দেখভাল করবে তাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে (এইচবিআরআই) নতুন বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড আইন (বিএনবিসি) তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। ফলে এইচবিআরআইও এই বিষয়ে তদারকিতে থাকতে পারে। এডুকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের (ইইডি) ভূমিকাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে গণপূর্ত অধিদফতর এবং এলজিইডি একে অপরের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করতে পারে।

 

এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ভবন পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াও স্পষ্ট নয়। খুবই ভাসাভাসা উপায়ে এই কাজ চলে। তার মতে,পর্যবেক্ষণ কর্মকা- তারাই পরিচালনা করতে পারেন, যারা এ বিষয়ে ধারণা রাখেন এবং তা করা দরকার ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী। আইন ধরে ধরে সেটব্যাকগুলো এবং কারিগরি দিকগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে হয়। পর্যবেক্ষণের কাজ মূলত ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছাড়ের বিষয়টি লক্ষ রাখা, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাপ মেনে চলা, ফুটপ্রিন্ট ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া বা কতটুকু জায়গা নিয়ে ভবনটি নির্মাণ হচ্ছে ইত্যাদি পরিসংখ্যান নেওয়া। কিন্তু ভবনকে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা (Universal Accessibility) বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো পর্যবেক্ষণ নেই। পর্যবেক্ষণের এই ঘাটতি পূরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথম কাজই হচ্ছে প্রশিক্ষিত করা’।

 

কর্তৃপক্ষের এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া, মতামতগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক জেবুন নাসরিন মনে করেন, ভবনগুলোর মালিক/বসবাসকারীদের চাহিদা বা সমস্যার কথা জানার জন্য জরিপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে ভবনের অধিবাসীরাই অংশগ্রহণ করবে। এই জরিপ ভবন/গণস্থাপনাতে বসবাস অথবা ব্যবহার শুরুর ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে করা যেতে পারে। তবে এই জরিপের ফলাফল সবার (নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি) কাছ থেকেই আসতে হবে। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ভবন প্রবেশগম্য হলে তা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্যপ্রবেশগম্য নাও হতে পারে। তাই মতামত প্রদান এবং প্রতিক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। তাহলেই ভবন নির্মাণশৈলীতে নতুন কিছু সংযোজন করা সম্ভব।

তিনি মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনটি নিশ্চিত করতে এর প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে আমাদের ভাবতে হবে। এ সময় ভারতের কলকাতা শহরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে যথাযথ আইন থাকা সত্ত্বেও প্রায়োগিক জায়গায় বাস্তবায়ন দেখা যায় না।

 

পর্যবেক্ষণের কর্মকা- বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনটি জরুরি বিষয়ে জোর দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রথমত, যারা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং যারা বাস্তবায়ন করবেন তাদেরকেই সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাদেরকে প্রশিক্ষিত করতে হবে এবং তৃতীয়ত, এই সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা সম্পর্কে সাধারণ যে ধারণা, তা একেবারে ভুল আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, অনেকে ভবনে শুধু র‌্যাম্প থাকাকেই সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার একমাত্র শর্ত বলে মনে করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘র‌্যাম্প থাকল কি ‘টয়লেট ব্যবহার করা গেল না,তাহলে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত হয় না।’

তিনি বলেন, সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা বলতে মূলত বোঝায় একটি ভবনের সকল স্থানে সবার প্রবেশের সুবিধা। সবার প্রবেশ বলতে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা অনুযায়ী প্রবেশের সুবিধাকে বোঝানো হয়ে থাকে।

 

একটি উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি ব্যাংকে ‘সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা’ থাকার মানে হচ্ছে, সেই ব্যাংকে অন্তত কিছু পরিমাণ প্রয়োজনীয় জায়গায় (সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ) সবাই (নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ) অতি সহজে কোনো সমস্যা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারবেন এবং ব্যাংকটির বিভিন্ন সেবা বিনা বাধায় গ্রহণ করতে পারবেন। যদি ওই ব্যাংকে পাঁচটি কাউন্টার থাকে তবে অন্তত একটি কাউন্টারে সবার সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অপ্রতিবন্ধী মানুষেরা দাঁড়িয়ে সেবা নিতে পারলেও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য কাউন্টার বা ডেস্কটি হুইলচেয়ারে বসে থাকা মানুষটির সমান্তরালে হতে হবে। দৃষ্টি কিংবা স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য টেকটাইলের ব্যবহার, ভিজ্যুয়াল বা কন্ট্রাস্ট বাড়িয়ে ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতার ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের প্রশ্নে খুব বেশি তথ্য আমাদের কাছে নেই। তাদের জন্য জরুরি সেবা ও তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের গবেষণা এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা দরকার।

 

আইন অনুসারে সবার প্রয়োজন ও চাহিদা বিবেচনায় ভবন নকশা করার কথা থাকলেও তা নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে না। অনেকে বলছেন, তারা প্রবেশগম্যতা রেখেছেন, তবে খুব কম ক্ষেত্রে তা তৈরি হচ্ছে। এটা অন্যায়, সবার প্রয়োজনের দিকেই লক্ষ্য রাখা উচিত আমাদের। ‘সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা’ বিষয়টি নিয়ে খুব কম ধারণা থাকা এবং এ সম্পর্কে সঠিক কোনো প্রকার নির্দেশনাবলি না থাকাই এই অবহেলার মূল কারণ বলে তিনি মনে করেন।

 

এই আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন যখন করা হয়েছে, তখন তা সর্বজনীন প্রবেশগম্যতায় সম্পৃক্ত সবার সঙ্গেই কথা বলে করা হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৩ সালের আইন প্রণয়নের কাজকে যথেষ্ট বলে মনে করেন না তিনি। এর প্রায়োগিক দিকগুলোর প্রশ্নেও ভাবনা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮-এ সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার ওপর সংযোজনী বেশ ভালো একটা পদক্ষেপ। এটি গেজেট আকারেও চলে এসেছে। কিন্তু এটি বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) আইন, ১৯৯৩ তে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইতোমধ্যে বিএনবিসিতে নির্দেশনাবলির আকারে এটি স্থান পেয়েছে। আমরা সংযোজনীর প্রতিটি জায়গায় লিখেছি, “সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা” থাকতে হবে। ওই অনুযায়ী ৯০ পৃষ্ঠার অধিক একটি অ্যাপেন্ডিকস তৈরি করা হয়েছে।’

 

নতুন বিএনবিসি ২০১৬ (খসড়া) প্রণীত হলে স্থপতি ও নকশাবিদদের এটা নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। কিন্তু তার জন্য নকশা প্রণয়নকারীদের প্রশিক্ষণ এবং ওয়ার্কশপ করানো দরকার। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ মতামত দরকার। অথচ এ নিয়ে যথাযথ উপলব্ধি এখনো তৈরি হয়নি। শুধু নকশা প্রণয়নকারী নন, নীতিনির্ধারক, বাস্তবায়নকারীসহ মূলত সবার সমন্বিত প্রশিক্ষণ দরকার।

সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় গবেষণার অপ্রতুলতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের গবেষণাগুলোর জন্য আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে তহবিল নেই, যার কারণে খুব বেশি গবেষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) সবসময় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। যে কারণে স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষকেরা প্রয়োজন অনুসারে জায়গার মাপ এবং অন্যান্য চাহিদা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের অনুশীলন করাচ্ছেন, যেন তারা পরবর্তী সময়ে এসব মাথায় রেখে ভবন/স্থাপনার নকশা প্রণয়ন করে।’ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরনের গবেষণা/অনুশীলনগুলো (ACADEMIC RESEARCH) খুব সীমিত আকারে হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

 

‘সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার’ বিষয়টি সামনে আনার জন্য উন্নয়নকর্মীদের উদ্যোগী ভূমিকা পালন করা দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক জেবুন নাসরিন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

ভবন নির্মাণশৈলীর পাঠ্যক্রমের প্রণয়নের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার প্রশ্নটি স্নাতক পর্যায়েই অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। নতুন কিছু সংযোজনের প্রয়োজন হলে তাও আমরা অবশ্যই বিবেচনায় রাখব। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত গ্রহণ করা উচিত, যারা প্রবেশগম্যতা-সংক্রান্ত কাজগুলোর সঙ্গে জড়িত প্রতিবন্ধী মানুষের মতামত খুব সাহায্য করবে, শিক্ষার্থীদের এবং আরও নতুন তথ্য সরবরাহ করবে শিক্ষার্থীদের। তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নতুন কিছু জানবে শিক্ষার্থীরা, যা পরবর্তীকালে এসব জ্ঞান তাদের কাজের ক্ষেত্রে আরও সাহায্য করতে পারবে। তিনি বলেন, আমরা নিজেরাও সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিয়ে বিএনবিসিতে কাজ করেছি। তখন এসব তথ্য ও মতামত আমাদের কাজকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কারণ, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা যারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে থাকেন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

অধ্যাপক জেবুন নাসরিন বলেন, সচেতনতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা পুরোপুরি নিশ্চিতকল্পে আমাদের সহায়তা করতে পারে।