যখন বিক্ষুব্ধ প্রতিবন্ধী মানুষের রাজপথ দখল, তীব্র যানজটে স্থবির নগরবাসী

21

শিরোনাম দেখে চমকে উঠেছেন? প্রিয় পাঠক। এ ধরনের চিত্র বাংলাদেশে দেখা যাবে এমনটি আমরা ভাবতে পারি না। তবে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সুযোগ-সুবিধা দেখে আমাদের মনে প্রায়শ ভাবনাগুলো দোলা দিয়ে যায়, তাদের জীবনযাত্রা কতই না সহজ। প্রবেশগম্য যানবাহন, একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা, মর্যাদার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা আরও কত কী। প্রতিবন্ধী মানুষেরা এসব দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এবং চরম হতাশায় ডুবে ভাবতে থাকেন অপ্রতিবন্ধী মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে তাদের দয়াতেই বাঁচতে হবে। এ ছাড়া যেন উপায় নেই।

কিন্তু উন্নত বিশ্বের একসময়কার দয়াদাক্ষিণ্যমূলক কার্যক্রম এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বিরাজমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সেখানকার প্রতিবন্ধী মানুষেরা আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে এক অভাবনীয় আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়েছিলেন। আত্মসম্মানবোধ এবং মর্যাদাময় জীবন ও নাগরিক অধিকার অর্জনের জন্য শত শত প্রতিবন্ধী মানুষ রাজপথ অবরোধের মাধ্যমে কঠিন আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বিবিসি নিউজ থেকে অনুবাদ করেছেন শারমিন নিয়ন এবং লেখনী রূপ দিয়েছেন শারাবান তোহরা সেঁজুতি

 

আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের একেবারে শুরুর দিককার কথা। লন্ডনের বিভিন্ন ব্যস্ততম সড়কে ঘটছে একের পর এক চমকপ্রদ সব ঘটনা। রাজপথ কাঁপিয়েছে বিক্ষুব্ধ শত শত প্রতিবন্ধী মানুষ। তাদের ওপর ঘটতে থাকা বৈষম্য-অবিচারের প্রতিবাদ জানিয়েছে নানান অভিনব উপায়ে। কখনো নিজেদের হাতকড়া পরিয়ে বাসের সঙ্গে বেঁধে রাখত তারা, অথবা ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে সারি বেঁধে বসে পড়ত। নিমেষেই গাড়ি চলাচল বন্ধ। বাসের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষেরা। অতঃপর রাস্তা অবরোধ করে জোরে জোরে গান গেয়ে এবং চিৎকার করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করত প্রতিবন্ধী মানুষেরা। যা লন্ডনের মানুষ আগে কখনো দেখেনি।

পুলিশ বিক্ষোভকারীদের থামাতে তাদের হুইলচেয়ার থেকে নামিয়ে দিত। টেনেহিঁচড়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিত। আর এসব শক্তিশালী বিক্ষোভের চিত্র নব্বই দশকের শুরুর দিকে টেলিভিশনের খবরে প্রায়ই দেখা যেত। প্রতিবন্ধী মানুষের এই আন্দোলন অভাবনীয় সাড়া ফেলে এবং চাপের মুখে সরকার ডিজঅ্যাবিলিটি ডিসক্রিমিনেশন আইন প্রণয়নে বাধ্য হয়।

 

 

সে সময় পাশ্চাত্যের অন্যতম পুরোনো শহর লন্ডনের প্রতিবন্ধী মানুষদের বঞ্চিত করা হতো নাগরিক অধিকার থেকে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করতে চাইলে তিন দিন আগে তাকে নোটিস দিতে হতো। এরপরও তাকে পূর্ণ ভাড়া দিয়ে বসতে দেওয়া হতো মালপত্র বহনকারী বগিতে। কোনো কোনো রেস্টুরেন্টে প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হতো তাদের হুইলচেয়ার বেশি স্থান দখল করে এই অভিযোগে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষদের ঝামেলাজনক মনে করে সিনেমা হল, বিনোদন কেন্দ্র এসব জায়গাতেও প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। গণপরিবহন, সরকারি অফিস, আদালত কোথাও ছিল না কোনো ধরনের প্রবেশগম্যতা। মোদ্দা কথা, সমাজের প্রতিটি স্তরের কোথাও প্রতিবন্ধী মানুষদের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সচেতন ও বিশ্বাসী ছিল না। এমনকি তাদের দিনের পর দিন ঘটে যাওয়া বৈষম্যকে  স্বীকার করা হতো না। লন্ডনের অপ্রতিবন্ধী মানুষের সমাজে মনে করা হতো প্রতিবন্ধী মানুষেরা হলো দুর্ভাগা, যারা নিজেরা কাজ করতে পারে না। তাই তাদের যানবাহন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দরকার নেই। প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে সবচেয়ে অসম্মানজনক ছিল তাদের নিয়ে কর্মরত বেশ কিছু এনজিওর কর্মকান্ড। তারা প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে যতটা না কাজ করত, তার চেয়ে বেশি ছিল মূলত দয়াদাক্ষিণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

 

 

জনসাধারণকে এই বৃত্তের বাইরে ভাবিয়ে তুলতে বেশ কয়েকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নেতৃত্বে আরও অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের নাগরিক অধিকার অর্জনের আন্দোলন শুরু করেন সে সময়। ডিরেক্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সংক্ষেপে ড্যান নামের একটি সুসংহত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তারা, যা অন্যান্য তৃণমূল সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রকে নাড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়। শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষ, বাক প্রতিবন্ধী মানুষ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ, শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনে।

তবে ড্যান কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে গঠন করা হয়নি। প্রতিবন্ধী মানুষের নিজস্ব নেটওয়ার্ক হিসেবে যা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের একটি প্ল্যাটফর্ম। যেখানে সবাই একত্র হয়ে নিজেদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে একত্র হয়েছিলেন। দুভাবে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন তারা। একটি প্রবেশগম্য যাতায়াতব্যবস্থা ও অপরটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়নের দাবিতে।

 

ছোট ছোট ঘটনা প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার তৈরি করলেও, তাদের প্রতি বৈষম্য রোধে সংসদ সদস্যদের কাছে বারবার দাবি জানানোর পরও যখন কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন মূল আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ সমাবেশটি ঘটে টেলিথন নামের একটা দাতব্য টিভি অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতিবছর বেসরকারি চ্যানেল আইটিভিতে প্রচারিত এই অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আর্থিক অনুদান তোলা হতো। বিশেষত মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা রাস্তায় নেমে ভায়োলিন বাজিয়ে গান গেয়ে এই অনুদান তুলছেন অথবা ছোট ছোট প্রতিবন্ধী শিশু কতটা অসহায় অর্থাৎ প্রতিবন্ধী মানুষদের অক্ষমতা ও পরনির্ভরশীলতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হতো এতে; যা প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এর ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৯০ সালে মাত্র অল্প কয়েক সপ্তাহের প্রচেষ্টায় ড্যানের নেতৃত্বে ২০০ জন প্রতিবন্ধী মানুষ আইটিভির টেলিথন স্টুডিও ঘেরাও করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে ছয় মাস ধরে নানান প্রচারণা চালিয়ে সে বছরের জুলাইতে ১৫০০ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষকে সংঘবদ্ধ করে ড্যান। সবাই মিলে আবারও ঘেরাও করেন এই স্টুডিও এবং এর নিচতলা দখল করে নেন তারা। সেখানে অবস্থান নিয়ে তারা গান করেন এবং নিজের মতো বিনোদনসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। তার মধ্যে অন্যতম ছিল Block Telethon, Piss On Pity স্লোগানযুক্ত ৫০০ টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায় স্টুডিওতে অবস্থান নেওয়া। পুলিশ তাদের এই টি-শার্ট খুলে ফেলতে বললে তারা হেসে উত্তর দেন, আমরা ভেতরে অন্য কিছু পরিনি, তবু খুলে ফেলতে বললে তাই করব। পুলিশ কর্মকর্তারা বিব্রত হয়ে পড়েন এই জবাবে।

 

এ ছাড়া প্রবেশগম্য গণপরিবহনের জন্য ড্যানের নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী মানুষেরা রাজপথ দখল করে নেন। কয়েক শ প্রতিবন্ধী মানুষ হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় নিজেদের বাসের সঙ্গে বেঁধে রেখে অফিস টাইমে সেন্ট্রাল লন্ডনের প্রধান সড়কগুলোতে অবস্থান নেন। ব্যস্ত রাস্তা মুহূর্তেই স্থবির হয়ে পড়ে। থেমে যায় সমস্ত গাড়ি, বাস। এমনকি জরুরি প্রয়োজনে একটি অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার উপায় ছিল না রাস্তাগুলো দিয়ে। সে সময় চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিলেন তারা। ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এই সমাবেশের কারণে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ভাষ্য ছিল যে তারা অসহায় নন বরং তারাও ট্যাক্স দেন, ভোট দেন। সুতরাং ভোটাধিকারের কারণে অপ্রতিবন্ধী মানুষের যা প্রাপ্য, তাদেরও অধিকার রয়েছে তা পাবার। কোনোভাবেই তাদের যখন সরানো সম্ভব হচ্ছিল না, তখন পুলিশ এসে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। হুইলচেয়ার থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে দেয়। এই বিক্ষোভে ১৬ জন প্রতিবন্ধী মানুষকে গ্রেপ্তার করে মেরিলিবোন পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। দুজনকে ছেড়ে দিয়ে ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করা হয়। কিন্তু শুনানির দিন আদালতেও এই ১৪ জনকে নিয়ে বেকায়দায় পড়ে পুলিশ। সমাজের প্রতিটি স্তরেই প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা অভাবের চিত্র প্রকট হয়ে চোখে পড়ে তখন।

 

 

সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম বারবারা লিসিকি এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করে ঠিকই কিন্তু বিষয়টি হাস্যকর এক ঘটনার জন্ম দেয়। প্রবেশযোগ্য একটি বাসও নেই। আমাদের নেবে কীভাবে এই ভাবনায় পুলিশ বিচলিত হয়ে পড়ে। অতঃপর দেখা যায় পুলিশ স্টেশনের কয়েদিখানা থেকে শুরু করে আদালতের কাঠগড়া কোথাও আমাদের জন্য প্রবেশগম্যতা নেই। আমাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তারা।

প্রবেশাধিকারের এই মৌলিক অধিকারের অভাবে রাষ্ট্রের বেকায়দা পরিস্থিতি হাস্যরসের উপাদান জোগালেও প্রতিবাদীদের জন্য এক দারুণ অর্জন হয়ে দাঁড়ায়। এই বিক্ষোভটি প্রতিবন্ধী মানুষদের দারুণ অনুপ্রাণিত করে এবং উপলব্ধি করতে পারে, তারাও সংসদ সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে। যেহেতু এমন আন্দোলন ইংল্যান্ডে একেবারেই নতুন কিছু ছিল, তাই এটা যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র তথা সমাজ কখনো ভাবেওনি যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা রাস্তায় নেমে এসে তাদের দাবি জানাতে পারে এবং এর জন্য তাদের গ্রেপ্তার করার পরেও এমন অদ্ভুত ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে পুলিশ। এমনই নানামুখী তীব্র আন্দোলনের ফলে অবশেষে ১৯৯৫ সালে ৮ নভেম্বর ডিজঅ্যাবিলিটি ডিসক্রিমিনেশন আইনটি প্রণয়ন করা হয়, যা ডিডিএ নামে পরিচিত।

 

নিজের ভাগ্য নিজে বদলাতে চেষ্টা না করলে সৃষ্টিকর্তাও সাহায্য করেন না। আর তাই নব্বইয়ের দশকের ইংল্যান্ডের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কঠোর আন্দোলন তাদের বর্তমান অধিকারগুলো ভোগ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। স্বপ্ন তো দেখাই যায়, আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী মানুষেরাও এভাবে জেগে উঠবে। প্রতিবাদী হয়ে উঠবে নিজের মর্যাদাবোধ আর অধিকারের দাবিতে, যা একসময় ঘুম ভাঙাবে সমাজের।