শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বনাম উচ্চ শিক্ষার ঠুনকো স্বপ্ন

12

রবিন তন্চংগ্যা

 

বাবা কৃষক, দাদুও কৃষক কিন্তু মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। রাঙামাটির পাহাড়ী অঞ্চলে বসবার আমাদের। তাই বোধহয় মনটা তাদের পাহাড়ের মতোন উদার। খুব ছোট্ট বয়সে তাঁরা আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আমাকে। মানুষ তার আশা আর স্বপ্নের সমান বড় এই শুনে আমার বেড়ে ওঠা। চৈত্রের মেঘহীন জ্যোৎনা রাতে বাড়ির উঠোনে তারা আমাকে তাদের চমৎকার বন্ধুদের কথা শোনাতেন যারা আকাশ ছুঁয়েছিলেন। সেগুলো শুনে শুনে আমার কচি মন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতো প্রতিনিয়ত। তারা সবচাইতে বেশি যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হল মানুষ হওয়ার শিক্ষা। বলতেন যাই হও না কেনো, মানবিকতার গুণাবলী অর্জন করার চেষ্টা করো। তবে তারা নিজেদের ও অন্যদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ছিলেন কিছুটা খামখেয়ালি। এই অসচেতনতার কারণে অন্যদের দৃষ্টিতে আমি হয়ে গেলাম অস্বাভাবিক। আর সামাজিক কুসংস্কার একজন মানুষের জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করতে পারে তার চূড়ান্ত উদাহরণ হতে পারি আমি।

 

মানুষ হয়ে গড়ে ওঠবার জন্যে আমাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শৈশবের দুরন্তপনায় বিদ্যালয়ের দিনগুলো বেশ আনন্দেই যাচ্ছিল। ছেদ ঘটলো কোন এক উন্মত্ত ভরা বর্ষায়। তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। কথা নেই, বার্তা নেই হুট করে বাম কানে ব্যথা শুরু হল। ব্যথা মানে নরকের তীব্র ব্যথা। রাতে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কানফাটা আর্তনাদ করতাম। এভাবে কয়েকদিন চলে গেলে, অনেকে পরামর্শ দিলেন হোমিওপ্যাথিক খাওয়াতে! তারপর? বাবা হোমিওপ্যাথিক খাওয়ালেন। ধীরে ধীরে আমার কানের ব্যথা কমলেও কানে কম শুনা শুরু করলাম। যদিও শুরুতে তা অতটা প্রকট ছিল না। মা-বাবারা শুধু কাজ আর কাজে ব্যস্ত থাকায় আমাকেও অতটা সময় দিতে পারেন নি। পরে যখন বুঝতে পারলেন ডাক্তার না দেখিয়ে অনেকের কথায় বৈদ্য (কবিরাজ) দেখালেন। কানে দুধ, তেল, আদার পানি কত কিছু ঢেলে দিয়েছেন তার কী ইয়াত্তা আছে!

 

এগুলো এখন ভাবলে গাঁ শিউরে ওঠে। আর এইদিকে দিনের পর দিন শ্রবণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছিলো। ক্লাশে শিক্ষকদের কথা কিছুটা বুঝতে পারতাম। আর ছাত্র হিসেবে অসাধারণ না হলেও ভাল ছিলাম। অন্তত আমাদের ক্লাশে এবং স্কুলের পরিপ্রেক্ষিতে। প্রথম স্থান সবসময় আমার জন্যে বরাদ্দ থাকতো। আর না শুনেও পড়াশোনার প্রতি ছিল আমার খুব আগ্রহ। এভাবে একসময় এস.এস.সি পাশ করলাম। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসকদের কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার বললেন  আমি আর কানে শুনবো না, আমার অন্তকর্ণের টিউব নষ্ট হয়ে গেছে, তাই শোনার জন্য আমাকে যন্ত্র লাগাতেই হবে। আমি নাছোড়বান্দা, কিছুতেই যন্ত্র ব্যবহার করবো না। কারণটা খুব সাধারণ! লজ্জা লাগত।

 

কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ভর্তি হলাম। যুদ্ধটা ঠিক সেই সময় থেকে শুরু হলো। একে তো মফস্বলের ছেলে তার উপর কানে শুনি না। ফলস্বরূপ থাকতাম সংকোচে আর ভুগতাম হীনমন্যতায়। ক্লাশে স্যারদের কথা বুঝতামও না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম। স্যারেরা কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতে পারতাম না। অপমান করতেন তারা। কয়েক মাস পর ক্লাশে যাওয়াই বাদ দিলাম। কিন্তু এরই মধ্যে পরিচয় হলো কিছু অসাধারণ বন্ধুদের সাথে। তাদের সাথে যেতাম প্রাইভেটে। যে শিক্ষকদের কাছে পড়তে যেতাম তারা ছিলেন অন্য কলেজের। আমার কানে কম শোনার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তারা আলাদা করে আমার উপর নজর দিতেন। ফলাফল ক্লাশে না গিয়েও প্রথম বর্ষে আমার ঈর্ষণীয় ফলাফল। এবার কলেজের শিক্ষকরা আমাকে খুঁজতেন, কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষেও আমি ক্লাশ করি নি। টেষ্টে রেজাল্টও হলো ভালো। কিন্তু এইচ.এস.সি এর মাস তিনেক আগে হয়ে পড়লাম অসুস্থ এবং পরীক্ষা চলাকালীন অসুস্থ ছিলাম। ফলস্বরূপ রেজাল্ট হলো খারাপ এবং ভেঙ্গে চুরমার হলো বুয়েটের পড়ার স্বপ্ন। তবুও তো জীবন থেমে থাকার নয়।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কঠিন ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। টিকে গেলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুঃসাহসের চূড়ান্ত সীমা দেখিয়ে বিষয় নিলাম পদার্থ বিজ্ঞান! বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রথম কেউ জানতো না আমি কানে কম শুনি। আদিবাসী হওয়ায় তারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকতো যেন আমি কোন এক ভিনগ্রহের প্রাণী! কিন্তু পরবর্তীতে আমি যখন ক্লাসে কারো কথা জবাব দিতে পারতাম না, শিক্ষকদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম তারা ভাবতো আমি আদিবাসী হওয়ায় বাংলা বুঝতে পারি না। পরে যখন বললাম আমি কানে কম শুনি তখন তারা আরো বিস্ময়ে হতবাক। একে তো আদিবাসী আর মফস্বলের ছেলে তার ওপর কানে কম শুনে সে কিনা পদার্থ বিজ্ঞানের মতো বিষয় নিয়ে পড়তে ভর্তি হয়েছে! নতুন হওয়ায় ক্লাশে কারো সাথে ভাব জমে নি, আর সাহায্যও তেমন করতো না। আর ঐদিকে শিক্ষকদের লেকচার কিছুই বুঝতাম না। মৌলিক বিজ্ঞান নিজে নিজে আর কতদূর পড়া যায়! আর মনেও রাখা যায় কীভাবে? ফলস্বরূপ রেজাল্ট করলাম খারাপ! আরো পরে কিছু অসাধারণ ছেলে আর মেয়ের সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হলো। তারা আমাকে বুঝিয়ে দিতো, কিছু নোট দিতো। তবুও পুরোপুরি বুঝতে না পারায় এবং শুধু বেশীরভাগ নিজে নিজে পড়ায় অনার্সে ভালো ফল করতে পারলাম না। মার্স্টাস আরো খারাপ।

 

নির্মম হলেও সত্য, অধিকাংশ শিক্ষকদের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি আমাকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। প্রতি পদে পদে তাদের অপমান আর অনুৎসাহ আমার ছোটবেলার দৃড়তাকে কমিয়ে দিয়েছে। এভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া অসম্ভব। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি এদেশে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষায় এগুতে পারছে না এসব কারণেই। অথচ দেশের নীতি নির্ধারক মহল থেকে কর্তা ব্যক্তিগণ পর্যন্ত একীভুত শিক্ষার রব সবখানে। অভাব যথাযথ পর্যবেক্ষণের।

 

কিন্তু এভাবে আর কতদিন আমরা শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা নিজেদের উচ্চ শিক্ষার বঞ্চনা নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে হাঁটবো?