সাহসি এক মায়ের অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প

34

আমাদের দেশে ছেলে মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই বাবা মায়েরা উঠে পড়ে লাগেন তাদের বিয়ের জন্যে। অ-প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এই তৎপরতা সমাজের স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে যতটা দেখা যায়, তার ঠিক উল্টোটি ঘটে প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েদের বেলায়। সঙ্গীবিহীন জীবন একাকী তারা কিভাবে কাটায় এই ভাবনা অভিভাবকদের ছুঁয়ে যায় না তেমন। বিশেষত প্রতিবন্ধী নারীদের বিয়ের কথা ভাবতেই শেখে নি সমাজ। তাহলে কী সমাজের ধারণা প্রতিবন্ধী মানুষেরা সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ বা নারীরা সন্তান ধারণে সক্ষম নন? অথচ সমাজের এই ভ্রান্ত ধারণাকে বৃদ্ধাক্সগুলী দেখিয়ে দিব্যি অনেকেই সুখে সংসার করছেন । আজ তেমনই এক অনন্য দম্পত্তির জীবন থেকে নেয়া গল্প অপরাজেয় পাঠকের সামনে তুলে ধরা হল।

সাক্ষাৎকার ও লেখনী রূপ: শারাবান তোহরা সেঁজুতি

ছবি: মুয়ায বিন জাকারিয়া 

 

 

গল্পের মতো শোনালেও সত্য হল, অগাধ বিশ্বাস এবং অসীম ভালোবাসার শক্তিতেই আমাদের ঘর আলো করে এসেছে ফুটফুটে তুবা মামণি। ওর ছোট ছোট আক্সগুলের স্পর্শে আমি মাঝে সাঝে কেঁপে উঠি। যদি এসবই কেবল স্বপ্ন হয়! ঘুম ভেঙ্গে দেখি পূবের আলো ফুটেছে, জন্ম নিয়েছে এক নতুন দিনের… কিন্তু নাহ্ আমার আছে শক্তিশালী স্বপ্ন! যে কিনা আমাকে ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে বলে উঠে, স্বপ্নের তরী বেয়ে তুবার ছোট ছোট আক্সগুলগুলো একদিন অনেক বড় হয়ে আমাদের দুজনের শক্তি হয়ে উঠবে।

কথাগুলো যখন বলছিলেন জেরিন রেহমান তরী, আবেগে তার কন্ঠ কেঁপে উঠছিলো। পাশে তার স্বামী মোঃ রেহমান রাসেল স্বপ্ন বসেছিলেন তাদের একমাত্র কন্যা সাবাহাত সাবিন তুবাকে নিয়ে। এ প্রতিবেদকের সাথে নানা কথায় উঠে আসে তাদের সংসার জীবনের উত্থান পতনের দিনগুলোর কথা।

 

ডাঃ জাহির উদ্দীন আহমেদ এবং রোকেয়া বেগমের তের সন্তানের মধ্যে তরী সর্বকনিষ্ঠ। ময়মনসিংহ জেলার আঠারোবাড়ি গ্রামে তাদের আদিনিবাস। ছোটবেলাতেই তরীর স্পাইনাল কর্ড লিউকেমিয়া ধরা পড়ে। ১৯৯৭ সালে প্রথম এটি অপসারণের জন্যে অপারেশন করা হয়। পরবর্তীতে আবার ২০১০ সালে অপারেশন হয়। কিন্তু দ্বিতীয় এই অপারেশনের পরপরই তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হতে থাকে। পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা যায় অপারেশনের সময় ডাক্তার ভুলবশত তার কিছু নার্ভ কেটে ফেলেছেন। ফলে তার কোমরের নিচ থেকে প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছে। তিনি একসময় হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। যেহেতু একটা সময় তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছেন। পড়াশোনা করেছেন। ব্যস্ত ছিলেন বিভিন্ন কাজ কর্মে। তাই হুইলচেয়ারের নতুন জীবনে স্বাভাবিক হতে পারছিলেন না তিনি। খুব ভেঙ্গে পড়েন। এইসব অস্থিরতা পরিবারের ওপর ঝেড়েছেন। কিন্তু পরিবারের সবাই শক্তি যুগিয়েছেন অনেক। আরেকজন যিনি তরীর এই দুঃসময়েও শক্তহাতে তরীকে সামলে রেখেছিলেন তিনি হলেন স্বপ্ন। সাহস যুগিয়েছেন জীবনকে এগিয়ে নিতে। বিশেষত স্বপ্নের অনুপ্রেরণায় পড়াশোনা শেষ করার অদম্য ইচ্ছেয় ২০১২ তে মাস্টার্স শেষ করেন তরী।

 

স্বপ্নের সাথে তরীর পরিচয় ২০০৭ সালে তার দ্বিতীয় অপারেশনের আগে। পরিচয় থেকে প্রণয়। দুজনেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখছিলেন। যদিও তরীর জীবনের এই দুর্ঘটনা বা চাকরি করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতাতেও তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। ২০১৩ এর শেষের দিকে দুজনে মিলেই সিদ্ধান্ত নেন বিয়ের। কিন্তু সমাজের সেই চিরাচারিত নিয়মে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তরীর পরিবার। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারি একটি মেয়ে সংসার করতে পারে তরীর অভিভাবকের ধারণার বাইরে। বিয়ে পরবর্তী তরীর পারিবারিক জীবন যাপনের অনিশ্চিত এক আশঙ্কা তার বাবা মাকে ভাবিয়ে তুলেছিলো। তাই তারা কিছুতেই সম্মতি দিচ্ছিলেন না। বাবা মাকে বোঝাতে না পেরে তাদের অমতেই শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়। যদিও পরে তরীর সুখের সংসার তার অভিভাবকের ভ্রান্ত ধারণা কেটেছিলো। আর শ্বশুর বাড়ির আন্তরিকতা তরীকে মুগ্ধ করেছিলো।

 

পড়াশোনা শেষে তরী একটি এনজিওতে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু এদেশে হুইলচেয়ার বান্ধব কর্মক্ষেত্র প্রতিবন্ধী মানুষের প্রধান অন্তরায়। তবু বছর দেড়েক প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তরী। অফিসে প্রবেশগম্য টয়লেট না থাকায় তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্যাও ভুগিয়েছে বেশ। এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে স্বপ্নও নানান জায়গায় ছুটোছুটি করেন। কিন্তু এই চাকরি ছাড়তেই হয় তরীকে। তারপর এই চাকরি ছেড়ে একটি অনলাইন রেডিও স্টেশনে চাকরি নেন। সেখানে লিফট থাকলেও দুটো সিঁড়ি পেরোতে অন্যের সাহায্যের আশায় মাঝে মধ্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হত তাকে। মাঝে মধ্যে তার স্বামী অফিসে পৌঁছে দিতেন। কিন্তু ব্যবসায়ী স্বপ্নের পক্ষে সব সময় তা সম্ভব হতো না। স্বপ্ন এসময় আক্ষেপের সাথে বলেন, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারি মানুষের জন্য এদেশের প্রবেশগম্যতার অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে।

তরী এসব কারণেই চাকরি ছেড়ে নিজেই বুটিকের ব্যবসা শুরু করেন। যদিও বুটিকের এই কাজ চাকরি করার আগেও করতেন। এছাড়া টিউশনি নিয়েও ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। আশে পাশের অনেক বাড়ি থেকেই ছাত্র-ছাত্রী পড়তে আসে।

 

এতশত প্রতিকূলতার মাঝেও তরী স্বপ্নের ছোট্ট সংসার আনন্দের বন্যায় ভেসে যাচ্ছিলো যেন যখন তারা বুঝতে পারলেন তাদের ঘরে নতুন অতিথির আগমন ঘটতে যাচ্ছে। টয়লেটের বেগ এলেও তা বুঝতে পারেন না তরী। কোমরের নিচ থেকে একেবারে প্যারাল্যাইজড শরীর। এই অবস্থা নিয়ে সন্তান জন্মদান এই দম্পতির জন্য ভয়াবহ এক চ্যালেঞ্জ ছিলো। সন্তান সম্ভাব্য অবস্থার প্রথম চার মাস তারা সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কাটিয়েছেন প্রতি মূহুর্তে। কারণ তরীর নিজেকে হুইলচেয়ার থেকে কমোডে স্থানান্তরণ করতে হত অনেকটা লাফিয়ে যা গর্ভের সন্তানের জন্যে হুমকির বিষয় ছিলো। পরের কয়েকমাস দৈনন্দিন কাজগুলো করে দিতেন স্বপ্ন। তরী বলেন স্বপ্ন এতোটা ভালোবাসায় আমাকে আগলে রেখেছিলো সে সময় কোন যন্ত্রণাই আমাকে ছুঁয়ে যেতো না। এমনি নানা উৎকণ্ঠা আশঙ্কায় তারা পার করেন এই কয়টা মাস।

 

তারপর এলো বহুল আকাঙ্খিত সেই মূহুর্ত। ৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তরী একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু যুদ্ধের যেন অবসান নেই। যেহেতু তরীর সিজার অপারেশন করতে হবে এবং এই অপারেশন করার মতো অভিজ্ঞতা এদেশের গাইনী ডাক্তারদের মধ্যে তেমন নেই তাই জটিলতা ও বিপদের আশংকায় ঢাকার কোন প্রাইভেট ক্লিনিক তরীকে ভর্তি করতে রাজী হয় নি। অবশেষে পিজি হাসপাতাল খ্যাত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তরী। কেবিন সহজে পাওয়া যায় না তাই বাধ্য হয়ে গাইনী ওয়ার্ডে ভর্তি হন। কিন্তু ভোগান্তি সেখানেই শেষ নয়। যেখানে প্রসূতি ও গর্ভবতী নারীদের জন্যে হাই কমোড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন ডাক্তাররা সেখানে দেশের অন্যতম বড় সরকারি হাসপাতাল পিজিতেই নেই হাই কমোডের ব্যবস্থা। এদিকে তরীর প্যারালাইজড শরীরে সন্তান জন্মদানের একেবারে শেষ মূহুর্তে এসে হাই কমোড ছাড়া সে হয়ে পড়ে অসহায়। তার স্বামী এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ  করলে তাকে জানানো হয় এখানে যে ধরণের রোগীরা আসেন তারা হাই কমোড ব্যবহারের নিয়ম জানেন না। কমোড ভেঙ্গে ফেলতে পারে সেই আশঙ্কায় নিচু কমোডের ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। তরী দুইদিন একেবারে টয়লেট ব্যবহার না করে অতিকষ্টে সময়গুলো পার করে। স্বপ্ন তাকে তৃতীয় দিন বাসায় এনে টয়লেট করিয়ে আবার নিয়ে যান পিজিতে। ইতোমধ্যে পিজিতে কেবিন পাওয়ার জন্য স্বপ্নকে নানা জায়গায় ছুটোছুটি করতে হচ্ছিলো। কারণ লবিং ব্যতীত সাধারণ জনগণের জন্য পিজিতে কেবিন পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। অতঃপর তরী ৪র্থ দিন হাসপাতালের কেবিনে স্থানান্তরিত হতে পারেন।

 

প্রত্যেক হাসপাতালে সমাজসেবার শাখা থাকে যেখান থেকে চিকিৎসার জন্যে আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যায়। কিন্তু কেবিন ভাড়া করায় সমাজসেবা বিভাগ এই সহযোগিতা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে এই রোগী কেবিন ভাড়া করতে বাধ্য হয়েছে হাসপাতালের নিজস্ব সমস্যার কারণেই এই মর্মে ডাক্তার লিখিতভাবে দিলে তখন তারা কিছুটা সাহায্য পান। স্বপ্ন এবং তরীর জন্য প্রথম সন্তানের মুখ দেখার অনুভ’তি অনন্য, অসাধারণ এক মূহুর্ত যা তারা সম্ভবত কখনোই ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন না। স্বপ্ন এ প্রসঙ্গে বলছিলেন প্রথম কন্যার তুলতুলে ছোট্ট শরীরটাকে কোলে নিয়ে আবেগের আতিশায্যে নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। সমাজের সাথে দুজনের এই অসম্ভবকে সম্ভব করে যাওয়ার প্রতি মূহুর্তের যুদ্ধ এবং অক্লান্ত পরিশ্রম, ছুটোছুটির পর সেই সন্তানকে বুকে নেয়া তাদের জন্য অলৌকিক এক মূহুর্ত বটে।