আইন বাস্তবায়নে উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন এবং ৫০% প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের দাবী

11

প্রধান প্রতিবেদন

 

প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমনটি মনে করছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দগণ। একে সরাসরি আইনের লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করছেন তারা।

তাদের বেশির ভাগের মতে এই দুই কমিটি গঠন প্রক্রিয়া সঠিক নয় এবং এর পরিবর্তন করে বেসরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন থেকে প্রতিনিধিত্ব রাখা অপরিহার্য।

 

জানা যায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় গঠিত এই আইনের জাতীয় নির্বাহী ও সমন্বয় দুই কমিটির এগারো সদস্যের বেসরকারি প্রতিনিধির মধ্যে মাত্র একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। অপরদিকে আইন অনুযায়ী বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি মনোনয়নের উল্লেখ থাকলেও দুই কমিটিতেই সরাসরি সরকারের বেতনভোগী কর্মকর্তা রয়েছেন তিনজন। এছাড়া জাতীয় নির্বাহী কমিটির বেসরকারি প্রতিনিধি মনোয়নের ক্ষেত্রে দুইজন পুরুষ ও দুইজন নারীর উল্লেখ থাকলেও পুরুষ সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনজনকে।

এ বিষয়ে কথা হয় এই আইনের ১৭ ধারা (ন) অনুযায়ী জাতীয় সমন্বয় কমিটির একমাত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত বেসরকারি প্রতিনিধি ব্লাইন্ড এডুকেশন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (বার্ডো)-এর নির্বাহী পরিচালক সাইদুল হক চুন্নুর সাথে। তিনি অপরাজেয়কে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষায় গঠিত এই আইনের কমিটিতে বেসরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি মনে করি, অন্তত ৫১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

 

জাতীয় ডিপিও নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এর পরিচালক রফিক জামান বলেন, জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ সিআরপিডি প্রণয়নের প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধী মানুষের খাতে তাদের সংশ্লিষ্ট পেশাজীবিদের দাপটকে উপেক্ষা করে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। অথচ এই সনদ বাস্তবায়নে প্রণীত আইনের কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পেশাজীবিদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন বিষয়টি এখনও আমলারা বুঝতে শেখে নি। এই আইনের জাতীয় দুই কমিটির নির্বাচিত বেসরকারি প্রতিনিধিদের তালিকাটি আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী ও সরাসরি আইনের ধারা ভঙ্গ করেছে।

 

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সাবেক সভাপতি খন্দকার জহরুল আলম অবিলম্বে এই কমিটি পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বলেন, বেসরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন থেকে হলেই গ্রহণযোগ্য। এই দুই কমিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার কন্যাকে খুশি করতে আমলাদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের তৎকালীন নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফসল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে তার কাছে জানা যায় এবার কমিটির তালিকা তৈরি করেছে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। এ প্রসঙ্গে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের বর্তমান সভাপতি রজব আলী খান জানান, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাস্ট এই কমিটির তালিকা তৈরির সঙ্গে স¤পৃক্ত থাকতে পারে। এই দুই কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আইনের প্রতিফলন হয়নি এবং এর দায়ভার মন্ত্রণালয়ের এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষায় গঠিত আইনের এই জাতীয় দুই কমিটির বেসরকারি প্রতিনিধিদের দেখলে আমাদের তাই মনে হয়। তিনি দাবি জানান, প্রকৃত অর্থে আইনের সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সব শ্রেণির প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই দুই কমিটি গঠনপ্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, মূল আইনটি তৈরি করা হয়েছিলো এগারো ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য অথচ এই আইনের জাতীয় দুই কমিটির নির্বাচিত বেসরকারি প্রতিনিধিদের দেখে একে নিউরো- ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাস্ট আইনের কমিটি বলেই নিঃসঙ্কোচিত্তে চালিয়ে দেওয়া যাবে। আমাদের অধিকার ভিত্তিক আইনের কমিটিগুলোতে বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের চাহিদার বিষয়গুলো যারা তুলে ধরবেন তাদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার মূল কারণ সরকারি আমলাদের স্বেচ্ছাচারিতা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)-এর নির্বাহী পরিচালক সাত্তার দুলাল এই দুই কমিটি গঠনপ্রক্রিয়াকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় মন্তব্য করে বলেন, যারা কমিটি গঠন করেছে, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। এই দুই কমিটিকে অবৈধ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদের মূলমন্ত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন (ডিপিও) এবং কোনো একক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রতিনিধিত্ব পেতে পারে না, বরং ডিপিও থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের অন্তত ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যা করতে না পারা আমাদের জন্য লজ্জার।

সোশ্যাল অ্যাসিসটেন্স এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফর দ্যা ফিজিক্যালি ভালনারেবল (এসএআরপিভি) এর প্রধান নির্বাহী শহীদুল হক মনে করেন প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য যারা কর্মরত তারা প্রতিবন্ধী মানুষদের পণ্য মনে করে জীবিকার তাগিদে কাজ করছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অজ্ঞতাও রয়েছে। কিন্তু আমরা যারা কাজ করি আমরাও তাদের সেভাবে সচেতন করি নি। আজকের অবস্থার জন্য এসবই দায়ী।

 

উল্লেখ্য, গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক শাখার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং জাতীয় সমন্বয় কমিটির বেসরকারি প্রতিনিধিদের নাম প্রকাশ করা হয়। প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর নেতৃবৃন্দও বাদ পড়েছেন এই তালিকা থেকে। এ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে সরকারি আমলাদের একমুখী নীতি এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারভিত্তিক আইনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের অনুপুস্থিতি নিয়ে।

 

অথচ এ প্রসঙ্গে মুখ খুলতে নারাজ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. চৌধুরী মো. বাবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারী সচিবের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে এ বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব খন্দকার আতিয়ার রহমানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন এ প্রতিবেদককে। খন্দকার আতিয়ার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে তার আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। তবে এই আইনের কমিটিবিষয়ক মন্তব্য করতে অপারগতা জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কিন্তু নাসরীন আরা সুরাত আমিন অতিরিক্ত ব্যস্ততার কথা জানিয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে নব নিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায় নি।

 

অন্যদিকে জাতীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সূচনা ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ড. মাজহারুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হন নি।

উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ১৭ নম্বর ধারা (ন) অনুযায়ী প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষায় কর্মরত বেসরকারি সংস্থা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন বা স¦-সহায়ক সংগঠন থেকে সরকার মনোনীত ৪ জন নারী ও ৩ জন পুরুষ প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। এ ছাড়া ধারা ১৯ (ণ) অনুযায়ী একইভাবে ২ জন নারী ও ২ জন পুরুষ প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। এর মধ্যে ৭ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় সমন্বয় কমিটিতে রয়েছেন যথাক্রমে ফরিদা ইয়াসমিন, নির্বাহী পরিচালক, ডিজঅ্যাবল্ড রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড রিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিআরআরএ); ড. শারমীন হক, অধ্যাপক, বিশেষ শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ডা. রওনক হাফিজ, চেয়ারম্যান, অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন; ড. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী, সহসভাপতি, ফাউন্ডেশন ফর অটিজম রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (এফএআরই); মো. সাইদুল হক, নির্বাহী পরিচালক, ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (বার্ডো); ডা. মাজহারুল মান্নান, মহাসচিব, সূচনা ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম কমপ্লেক্স এবং জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন, নির্বাহী প্রধান, সুইড বাংলাদেশ।

 

অপরদিকে জাতীয় নির্বাহী কমিটির ৪ জন সদস্য হলেন অধ্যাপক শাহীন আক্তার, প্রকল্প পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; ডা. শামীম ফেরদৌস, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, ৬ বড়বাগ, সেকশন-২, মিরপুর, ঢাকা; ডা. শামীম মতিন চৌধুরী, সভাপতি, বিউটিফুল মাইন্ড, প্লট নং ১১৪৫, রোড-৬/১, সেক্টর-৫, উত্তরা, ঢাকা; আশফাক-উল-কবির, সভাপতি, তরী ফাউন্ডেশন, ৬/৯, ব্লক-ই, লালমাটিয়া, ঢাকা।