এসডিজি অর্জনে চাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক টেকসই কর্মপরিকল্পনা

84

অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম সিদ্দিকী

 

তিন লক্ষাধিক কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য। এই অর্থের মধ্যেই মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশব্যাপী কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দসহ দেশের সব প্রান্তিক মানুষের দেখভাল করা এবং অন্যান্য নিয়মিত কার্যক্রম চলে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩-এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নেই এই বাজেটে।

 

অর্থাৎ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাপেক্ষে এসডিজি অর্জন করতে হলে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা বরাদ্দ নেই এই মন্ত্রণালয়ে। শুধু একটি মন্ত্রণালয় নয়, সব মন্ত্রণালয়ের জন্য এই দুটো আইনের বাস্তবায়ন বাবদ পৃথক বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। কিন্তু তথাকথিত রুলস অব বিজনেসের দোহাই দিয়ে অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদাপত্রে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও অধিকার বাস্তবায়ন বাবদ খাত চিহ্নিত করে বরাদ্দ না চাওয়ায় আমাদের জাতীয় বাজেট প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংবেদনশীল হচ্ছে না। ফলে ঢিলেঢালাভাবে চলছে এই আইন দুটোর বাস্তবায়নমূলক কার্যক্রম। কেবল একটি বা দুটি আইনের বাস্তবায়নে এসডিজি অর্জিত হয়ে যাবেÑ এমনটি বলছি না। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক আইনসহ অন্যান্য আইনকে ভিত্তি ধরে যদি প্রস্তাবিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক কর্মপরিকল্পনাটি প্রণীত ও বাস্তবায়িত হয়, তাহলে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাপেক্ষে এসডিজি অর্জন অসম্ভব হবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জাতীয় কর্মসূচি, নীতিমালা বা আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাসমূহ ও উন্নয়নবহির্ভূত থাকেন। এসব দূরীকরণ ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সর্ববৃহৎ এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্তকরণের জন্য অধিকার ও সুরক্ষা আইনের পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এ প্রবন্ধটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনদ্বয়ের সুষ্ঠু বাস্তবায়নসহ এসডিজি অর্জনের ভূমিকা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য খাতভিত্তিক সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

 

সকল প্রকার দারিদ্র্য দূরীকরণ (লক্ষ্যমাত্রা-১)

বাংলাদেশে প্রতিদিন ১.২৫ ডলারের কম আয় করেন এমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা কত তা আমরা জানি না। তবে দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা, তাদের আর্থসামাজিক অবস্থাসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যান শুধু এক নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নয়, বরং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাপেক্ষে প্রতিটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ (পরবর্তীকালে শুধু অধিকার আইন হিসেবে চিহ্নিত)-এর ৩১ ধারা এবং এই আইনের তফসিলের ১ নম্বর দফার আলোকে শনাক্তকরণ তথা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিসংখ্যান ও উপাত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়া অতিসত্বর সুসম্পন্ন করা প্রয়োজন। দৈনিক ১.২৫ ডলারের কম আয়ের ব্যক্তিগণ অতিদরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত। এসডিজির ১.১ নম্বর লক্ষ্যে অতিদারিদ্র্য নির্মূলের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে সম্পদ, কর্মসংস্থানসহ জীবিকা অর্জনের মাধ্যমগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান অংশগ্রহণ নেই। এই সমতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ২০১৩ সালের এই আইনের তফসিলের ১১ নম্বর দফার অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় অতিদরিদ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৪০০০ টাকা করা উচিত এবং অবিলম্বে বিশেষ বীমা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে তফসিলের ৯, ১০ এবং ১৬ নম্বর দফার পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও সংগঠনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে অতিদারিদ্র্য বিলুপ্ত হবে বলে আমরা মনে করি। ভূমির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য সম্পদের হিস্যা নিশ্চিত করতে এই আইনের ১৬ (গ), ৩৭ (২) এবং ৩৭ (৩) নম্বর ধারার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য আইন ও নীতিমালা যেমন: নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং খাসজমি ও জলাশয় বণ্টনসহ দারিদ্র্য বিমোচনের সকল নীতি ও কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে অবশ্যই বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাপেক্ষে এসডিজির ১ নম্বর লক্ষ্যমাত্রার বাকি চারটি লক্ষ্যও অর্জিত হবে বলে আমরা ধারণা করছি।

 

ক্ষুধা দূরীকরণ, খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন, পুষ্টি ও কৃষির উন্নয়ন (লক্ষ্যমাত্রা-২)

এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সঙ্গে ২০১৩ সালের আইনের তফসিলের ৩ (ক) দফা সরাসরি সম্পর্কিত। এখানে প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকল্পে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এটি অর্জনের জন্য রাষ্ট্রকে একদিকে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে, অন্যদিকে উৎপন্ন পণ্যের সহজপ্রাপ্যতা এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যেন এগুলো নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে। সব দুস্থ ও দরিদ্র প্রতিবন্ধী নাগরিককে প্রয়োজনে বিনা মূল্যে বা হ্রাসকৃত মূল্যে রেশন দিতে হবে। ১ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে যে আইনি বিধানাবলি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যমোচনের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা-২-এর অনেকটাই অর্জিত হবে। সবচেয়ে আশার কথা, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে খাদ্যে স¦য়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, যার সুফল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীও পাচ্ছে। বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার আইন, ২০০৯; নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩; ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫; আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন; সার নিয়ন্ত্রণ আইন; কীটনাশক আইন; মাতৃদুগ্ধ বিকল্প পণ্য আইন; পশুজবাই ও মাংস নিয়ন্ত্রণ আইন; মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ আইনসহ অর্ধশতাধিক আইন রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী নয়, আপামর জনগণ বিশুদ্ধ, মানসম্পন্ন, বিষমুক্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা লাভ করবে; কৃষির উন্নয়নও হবে।

 

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনমান নিশ্চিতকরণ এবং সকল বয়সী সকল মানুষের সমৃদ্ধি ও কল্যাণ (লক্ষ্যমাত্রা-৩)

মাতৃত্বজনিত মৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসের কর্মসূচিগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। দেশে ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মাসহ বেশ কয়েকটি সংক্রমন ব্যাধি সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। এইডস এখনো বাংলাদেশে মহামারি আকার ধারণ না করলেও এইডস প্রতিরোধে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত রেখে কর্মসূচি আরও জোরদার করা দরকার। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের সংখ্যা হ্রাস করার ক্ষেত্রে অধিকতর জোরদার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রস্তাবিত মোটরযান ও চলাচল আইন (বিল) টি অতি দ্রুত সংসদে পাস করে বাস্তবায়ন করা হলে দুর্ঘটনা ও তদজনিত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পেতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা প্রদান করতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো অনীহা প্রকাশ করে। কোর্ট-কাচারির ঝামেলা এড়াতে ও দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি তাৎক্ষণিক খরচ প্রদানে সমর্থ নাও হতে পারেনÑ এই আশঙ্কায় এমনটি করা হয় বলে আমরা জেনেছি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স¦াস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে টাকার কারণে বা ভর্তি জটিলতাজনিত কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বিলম্ব না করা এবং জরুরি চিকিৎসা প্রদানে অস¦ীকৃতি না জানাতে এবং এরূপ অস¦ীকৃতি বা বিলম্বের কারণে দন্ডবিধি অনুযায়ী আইননানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে মর্মে নির্দেশনা প্রদান করা হলেও তা মানছে না চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যাও। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকদ্রব্য ও পরিবেশসংক্রান্ত আইনগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করা দরকার। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাপেক্ষে লক্ষ্যমাত্রা-৩ অর্জনের যথেষ্ট ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা থাকলেও অধিকার আইনের ১৬ (ক), ১৬ (ট), ১৬ (ঠ) এবং তফসিলের ৩ নম্বর দফার যথাযথ বাস্তবায়ন করা হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাপেক্ষে এ লক্ষ্যটি অর্জন কঠিন হবে না।

 

সকলের জন্য ন্যায্যতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ (লক্ষ্যমাত্রা-৪) 

বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের চাহিদার ভিন্নতা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষার হার কম। ফলে তাদের কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎসে সমান অংশগ্রহণ নেই এবং অন্যান্য অধিকারসহ শিক্ষার অধিকার খর্বিত হচ্ছে, সীমিত হয়ে যাচ্ছে Ñ এমন একটি দুষ্ট চক্রের আবর্তে প্রতিবন্ধী নাগরিকের অধিকার পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হচ্ছে। চলমান পরিস্থিতি ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ফেরাতে লক্ষ্যমাত্রা-৪-এর বাস্তবায়ন ও এতদলক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অতি জরুরি। যদিও তা কেবল ৪.৫ নম্বর লক্ষ্যে সকল স্তরের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, তথাপি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই এসডিজির সামগ্রিক বাস্তবায়ন ও সমতাভিত্তিক অর্জনের স¦ার্থে সাতটি লক্ষ্যেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা উচিত। অধিকার আইনের ১৬ (জ), ১৬ (ড), ৩৩ ও ৩৬ ধারা এবং তফসিলের ৫ (খ) (অ), ৫ (খ) (ঙ) এবং সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে ৯ নম্বর দফা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা হলে মানসম্মত শিক্ষা অনেকটাই অর্জিত হবে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়াটি বেসরকারি সংস্থাসমূহের সুপারিশ গ্রহণপূর্বক অবিলম্বে আইনে পরিণত করা ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে আমরা বিশ^াস করি।

 

সকল নারী ও মেয়ে শিশুর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা অর্জন (লক্ষ্যমাত্রা-৫)

খুবই হতাশাজনক যে নারী ও শিশুর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা অর্জনের জন্য বা নারীর অধিকার বিষয়ে ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন নীরব। তবে এই আইনের ১৬ (২) ও ৩৬ নম্বর ধারা এবং তফসিলের ১২ ও ১৬ নম্বর দফা এসডিজির ৫ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ধারা ও দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আইনের দৃষ্টিতে সাম্য, বিচারগম্যতা ও ডিপিও গঠনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠিত করা এবং তাদের নেতৃত্বের বিকাশ সম্ভব হবে। আশার কথা হলো, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য ও সহিংসতা বিলোপ, বাল্যবিবাহ ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ প্রতিরোধের জন্য বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করেছে। মানব পাচার আইন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক নির্যাতন সুরক্ষা ও প্রতিরোধ আইন, শিশু আইনসহ বেশ কিছু আইন প্রণয়ন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের কোটা দেওয়া হচ্ছে। জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট তৈরি হচ্ছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা-৫ অর্জনের জন্য গৃহীত কর্মসূচিসমূহে প্রতিবন্ধী নারীদের সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন জরুরি প্রচেষ্টা হওয়া উচিত।

 

অন্যান্য

স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ এবং পূর্ণকালীন ও উৎপাদনমূলক কর্মসংস্থান ও সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক কর্ম শিরোনামীয় লক্ষ্যমাত্রার ৮.৫ নম্বর লক্ষ্যে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সবার বৈষম্যহীন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পূর্ণকালীন ও সম্মানজনক কর্ম নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে শ্রম অধিকার রক্ষা, শিশুশ্রম নির্মূল, শিক্ষা, কর্ম বা প্রশিক্ষণে যুবকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। শ্রম আইন, ২০০৬-এ শ্রমিকের নিরাপত্তা, কর্মস্থলে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা প্রদান এবং তাকে কর্মচ্যুত না করে একই চাকরিতে উপযুক্ত অন্য কোনো কার্যে নিয়োজিত রাখাসহ ভালো কিছু বিধান যুক্ত থাকলেও কর্মস্থলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অত্যন্ত কম। অধিকার আইনের ১৬ (১) (ড), ১৬ (১) (ঢ), ১৬ (২), ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ধারা এবং তফসিলের ১০ নম্বর ধারার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ অধিক পরিমাণে কর্মে সম্পৃক্ত হতে পারবে। তবে আমরা দেখছি, প্রথম শ্রেণির কর্মে ১% এবং অন্যান্য পদে ১০% কোটা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত রাখার সরকারি প্রজ্ঞাপন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না। সদ্য প্রকাশিত ৩৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, দুই সহস্রাধিক প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদানের জন্য সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র তিনজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেককে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়েছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে বিচারিক কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো কোটাই নেই। আবার কোটায় বা মেধায় নিয়োগ পেলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ কর্মস্থলে প্রবেশগম্যতা এবং সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত না থাকায় স¦াচ্ছন্দ্যে চাকরি করতে পারছেন না। এমতাবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাপেক্ষে বলা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৮ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছি।

 

বৈষম্য বিলোপ ও একীভূত মানব বসতি-সম্পর্কিত মোট ১৪টি লক্ষ্যে তিনটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশেষভাবে বলা হলেও বাকি লক্ষ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিকার আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এতদ্সংক্রান্ত জাতীয় উদ্যোগসমূহে বৈষম্যহীন অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকারি আইন সহায়তা বা আইন অনুযায়ী আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, যেকোনো প্রতিবন্ধী নারী, পুরুষ ও শিশু বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা পাবেন। নারী ও শিশু সুরক্ষা-সম্পর্কিত আইন এবং লক্ষ্যমাত্রা-৫-এর জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো লক্ষ্যমাত্রা-১৬ অর্জনে সহায়ক হবে।

 

তবে অধিকার আইনের প্রবেশগম্যতা, সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত, চলন, ভাষাও যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় ও সচেতনতাবিষয়ক তফসিলে উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত না হলে প্রাগুক্ত লক্ষ্যমাত্রাগুলোর কোনোটিই ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাপেক্ষে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনাটি অতিদ্রুত চূড়ান্ত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। কর্মপরিকল্পনাটির কার্যাবলি অধিকার আইন ও এসডিজির ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট করতে হবে; বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ, কার্য সম্পাদনের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস এবং প্রাক্কলিত ব্যয়ের পরিমাণ নির্দিষ্ট করতে হবে; কত সময় পরপর কিসের ভিত্তিতে লক্ষ্য অর্জনের মাত্রা পরিমাপ করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ীই প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়কে বাজেট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে।

অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রার বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও পররাষ্ট্রনীতি-সম্পর্কিত। এগুলো যেমন বৈশি^ক বিষয়, তেমনি অর্জনেও সামষ্টিক প্রচেষ্টা দরকার।

 

লেখক: সিনিয়র গবেষক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)