পাত্রী পরীক্ষিত

47

জাভেদ সৈয়দ আলী

 

বিগত তিন মাসে কুড়িজনের ওপরে পাত্রী দেখার রেকর্ডধারী সামির সালেহিনের দেখা পাত্রীরা পরীক্ষায় ফেল। আজ এক বন্ধুর পরামর্শে মেট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাছাই করা একুশতম পাত্রী দেখতে এসে সামির নিজেই পরীক্ষার সম্মুখীন!

 

পাত্রী শ্রেষ্ঠা আহসান। ছিমছাম গড়নের শ্যামবরণ হলেও বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি নিয়ে ছবির ভেতর দিয়েই যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে সামিরকে। ছবি দেখে সামিরের আগ্রহ জাগে মেয়েটির প্রতি। এবার যদি কিছু হয় এই আশায় বন্ধু দেখা করার দিনক্ষণ ঠিক করে দেয়। রোদেলা বিকেল। হোটেল সি ওয়ার্ল্ডে বসেছে তারা। মিনিট পাঁচেকের দেখা। এরই মধ্যে সামির মুগ্ধ শ্রেষ্ঠার বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায়। শ্রেষ্ঠা সামিরের অনুমতিতেই অর্ডার করেছে শ্যাম্পেইন । উদ্দেশ্য  কৌশলে সামিরের মদ্যপানের অভ্যাস আছে কি না, তা খুঁজে বের করা। এদিকে সামির বেশ মজা পেয়েছে কিন্তু মোটেও তা প্রকাশ না করে দিব্যি স¦াভাবিকভাবেই নিজের জন্য অর্ডার করলো কোল্ড ড্রিঙ্কস। একটু থমকে শ্রেষ্ঠা ভাবছে, ভালোই বিপাকে পড়া গেল।

–   এই রে, এইবার শ্যাম্পেইন ক্যামনে খাই!

 

পেছনের কথা

বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে শ্রেষ্ঠা। মধ্যবিত্ত পরিবারের শৈশব-কৈশোর থেকেই দাপটের সঙ্গে বেড়ে ওঠা তার। বরাবরই সে ভেবেছে নিয়মের পাত্রী পরীক্ষায় কখনোই বসবে না সে। সমাজের নিয়ম ভাঙবে। পাত্রকেই পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। সেই ভাবনা মনে গেঁথেই আজ সে এসেছে সামিরের সঙ্গে দেখা করতে।

 

ওয়েটার শ্যাম্পেইন নিয়ে আসার পর মুখে দেওয়ার ভান করে গ্লাস উঠিয়ে ধাম করে আবার নামিয়ে রাখলো। ভাবখানা এমন, সে এমনই। ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত পাল্টায়। অস্থির ভঙ্গিতে জানালো,

–   শ্যাম্পেইন ভাল্লাগছে না। জুস খাবে।

 

অর্ডার দেওয়া হলো জুসের। সামির যতটা না মজা পাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি তীব্র এক আকর্ষণবোধ করছে শ্রেষ্ঠার প্রতি। নানা কথাবার্তায় সামিরের স্বপ্নকন্যার সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পায় শ্রেষ্ঠা। তবু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামিরকে আরও ভালো করে খুঁটিয়ে বুঝতে চায় শ্রেষ্ঠা। পরের দিন তার এক বন্ধুর জন্মদিনের গল্প ফেঁদে বসে শ্রেষ্ঠা। কথায় কথায় জানা গেল, কিছুতেই উপহার পছন্দ করতে পারছে না। উপহার পছন্দ করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল সামির। শ্রেষ্ঠার উদ্দেশ্য, সামির কেমন ব্যবসায়ী, তা পরখ করা। এ ছাড়া বউয়ের আবদার সে কীভাবে রক্ষা করে, তা-ও তো বুঝতে হবে। পরদিন কেনাকাটার পরীক্ষায় সামির সময়মতো হাজির এবং ভালোভাবেই এই পরীক্ষায়ও উতরে যায় সামির। এবার সাহসের পরীক্ষা। বাসায় নামিয়ে দিতে এসে রাস্তা থেকেই বিদায় নিতে চায় সামির। এদিকে শ্রেষ্ঠার সঙ্গে আগে থেকেই ঠিক করে রাখা পাড়ার বড় ভাইয়েরা তৈরি ছিল। শ্রেষ্ঠাকে উদ্দেশ্য করে আজেবাজে মন্তব্য ছুড়তে থাকে তারা। সামির বাধা দিতে গেলে মারামারি লেগে যায়। ফলাফল ডাক্তারের পরামর্শে এক সপ্তাহের জন্য বিছানায় বন্দী সামির।

 

ফেসবুক আর মোবাইলে ধুমিয়ে আড্ডা চলেছে এই কয়দিন। সকাল, দুপুর গড়িয়ে রাত। দুজনের কথার ফুলঝুরি উড়ছেই। অষ্টম দিন বিকেলে এতিমখানায় বাচ্চাদের জন্য উপহার কেনার অজুহাতে সামিরের সাহিত্য ও সংগীত রুচি পরীক্ষা করে শ্রেষ্ঠা। জানতে পারে সামির সফট রোম্যান্টিক আর রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করে, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা আর শ্রেষ্ঠার প্রিয় সংগীতশিল্পী শানের গান সামিরেরও প্রিয়। তবে সামিরের প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আর শ্রেষ্ঠার পছন্দ শেক্সপিয়ার আর চেতান ভাগাত। সেদিন সারা দিন এতিমখানার বাচ্চাদের জন্য উপহার কেনা ও পরদিন অফিসে না গিয়ে এতিমখানার বাচ্চাদের সঙ্গে সারা দিন আনন্দময় সময় কাটানোর মাধ্যমে প্রকাশ পায় সামিরের শিশুদের প্রতি ভালোবাসা। এতিমখানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে সামিরের গাড়ি খারাপ হলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা খোঁজার সময় এক বৃদ্ধ মহিলাকে রাস্তা পারাপারে সাহায্য করে সামির একই সঙ্গে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা ও মানবিকতার পরিচয় দেয়।

 

অতঃপর, বিয়ে ঠিক হয়। আংটি বদলের দিন সামির মজা করে শ্রেষ্ঠার এক বান্ধবী মিলার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে। অভিমান করে বসে শ্রেষ্ঠা। বিয়ে ভেঙে যাবে প্রায় এমন অবস্থায় মিলা শ্রেষ্ঠার অভিমান ভাঙাতে সমর্থ হয়। অবশেষে আংটি বদল হয়। কিন্তু বিয়ের দিন শ্রেষ্ঠার জন্য নীল অর্কিড আর শীর্ষেন্দুর বই আনতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় সামির। বিয়ে পিছিয়ে যায় ওদের।

 

ছয় মাস পর এক রাতে। সামির-শ্রেষ্ঠার বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ-সংযোগ চলে যায়। সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা শ্রেষ্ঠার নাকে কে যেন রুমাল ধরতেই অজ্ঞান হয়ে যায় সে। জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পায় মনভোলানো এক ফুলশয্যায় সে একাকী। আচমকা উঠে বসে সে। অজানা আশঙ্কায় শরীর কাঁপছে। চিৎকার করতে চায় প্রাণপণে। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না কোনোমতে। ভাবতেই পারছে না সামির নেই তার পাশে। কোথায় সামির…

 

খানিক পর দেখা গেল, নীল অর্কিড আর শীর্ষেন্দুর সেই বই হাতে বিছানার দিকে এগিয়ে আসছে সামির। অবাক শ্রেষ্ঠাকে আরও অবাক করে দিয়ে সামির বলে ওঠে

–   এটা তোমার নেওয়া বর পরীক্ষার শাস্তি। আংটি বদলের দিন শোধ নিতে চেয়েছিলাম। পারিনি। তাই আজ…

 

শ্রেষ্ঠা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সামির বলে যায়, আংটি বদলের দিন মিলা কথাচ্ছলে বলে ফেলেছিল ধাপে ধাপে সামিরকে পরীক্ষা করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি। প্রথমে রাগ হলেও পরক্ষণেই সামির বুঝতে পারে সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভাঙতে শ্রেষ্ঠার পণের ইচ্ছে।

 

বিস্মিত শ্রেষ্ঠা বলে ওঠে, ‘এদ্দিন পর!’ বর পরীক্ষার জন্য ক্ষমা চেয়ে শ্রেষ্ঠা সামিরের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,

–   সো, দেয়ারস নো নিড টু সে সরি ফর বোথ অব আস! রাইট?

–   অ্যাবসলিউটলি রাইট, মাই বিউটিফুল প্রিন্সেস! মৃদু হাসিতে এ কথা বলেই শ্রেষ্ঠাকে নিজের কাছে টেনে নেয় সামির।