প্রতিবন্ধী মানবতার বৈষম্যের অবসান

38

 

ইফতু আহমেদ

 

আধুনিক বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কর্মকা- আজ আর কল্যাণের বিষয় নয়। জাতীয় উন্নয়নের সব কর্মকা-ের ধারাতেই অংশগ্রহণ করা হচ্ছে এর মূল দর্শন। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম-অংশগ্রহণ’ এই মানবিকতায় ঘোষিত হয়েছে ‘ফোকাস অন অ্যাবিলিটি, নট অন ডিজঅ্যাবিলিটি’। বাংলা ভাষায় শোভন করে বলা যায়, সামর্থ্যরে ওপর গুরুত্ব, প্রতিবন্ধিতা নয়। তাই তো দেখতে পাওয়া যায়, নাগরিক অধিকারের মতো প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার মহানুভবতার বাণী: “Prohibit discrimination against all individuals, regardless race, sex, color, age, religion, natural origin, marital status or physical or mental disability, or status as a disabled” অর্থাৎ ‘জাতি, লিঙ্গ, বর্ণ, বয়স, প্রাকৃতিক উৎপত্তি, বৈবাহিক অবস্থা বা শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতাÑ অবস্থা যা-ই হোক না কেন, সব মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য নির্মূল করো।’ এই ঘোষণা সৃষ্টিসুখের উল্লাস এবং সব মানবতার শান্তির বিজয় ঘোষণা করে।

 

ইন্দ্রিয় (Perception) হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন। যার পাঁচটি উপাদান হচ্ছে দেখা, শোনা, স¦াদ, ছোঁয়া ও গন্ধ। এগুলোর ঘাটতি হলে মানুষ প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হতে পারেন। অতএব হাঁটা, দেখা, শোনা, নিঃশ্বাস নেওয়া এবং শিক্ষা এই হচ্ছে মানুষের জীবনে স্বাভাবিক কার্যাবলি। অ্যাক্সিডেন্ট, ট্রমা, বংশগতভাবে এবং বিভিন্ন রোগজনিত কারণেও প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি হতে পারে।

ব্যক্তির এক বা একাধিক প্রতিবন্ধিতা থাকতে পারে। যেমন শ্রবণ-বাক ও দৃষ্টিহীনতা। কিছু প্রতিবন্ধিতা দৃশ্যমান। যেমন হুইলচেয়ার, ওয়াকার, ক্রাচ এবং সাদা ছড়ি। অদৃশ্যমান প্রতিবন্ধিতা হচ্ছে হিয়ারিং ইম্পেয়ারমেন্ট, হার্ট বা রেসপিরেটরি অবস্থা, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি।

 

মানুষের একই প্রতিবন্ধিতা সব ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করতে পারে না। যেমন একজন ইতিহাসের অধ্যাপকের কাছে আঙুল হারানো তেমন বাধার সৃষ্টি নয়, যতটা একজন পিয়ানোবাদকের জন্য বড় সমস্যা।

দুর্ভাগ্য যে, অধুনা এ যুগে আমেরিকার মতো জায়গায়ও দেখতে পাচ্ছি ‘ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব বিদ্যালয়’ শব্দচয়নগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। ডাম্ব শব্দটি কথনশক্তির অভাবের স্থলে বোকা শব্দের প্রতিনিধিত্ব করে বেশি, যা শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কাছে অপমানজনক। অতএব শ্রুতিমধুর ও সম্মানজনক শব্দচয়ন আমাদের প্রয়োজন। হতে পারে বাংলায় ‘শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়’ এবং ইংরেজিতে School for the Hearing and Speech Disabilities সত্যিই নামে অনেক কিছু এসে যায়। সুন্দর ও গঠনশীল নাম আমাদের সব সময়ই কাম্য।

 

প্রতিবন্ধিতা দুভাবে দেখা যেতে পারে।

  • ১. প্রতিবন্ধী মানুষেরা কর্মময় জীবন পরিচালনায় অক্ষম এবং তারা তত্ত্বাবধান ছাড়া স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। পক্ষান্তরে
  • ২. প্রতিবন্ধী মানুষেরা কর্মময় জীবন পরিচালনা এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা দুটোই করতে সক্ষম। আমরা কীভাবে দেখতে ইচ্ছুক, তা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে অনেকখানি।

 

বিশেষ শিক্ষা প্রবর্তিত হয়েছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ প্রতিভা গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু একীভূত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একই শ্রেণিকক্ষে অপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদান করতে পারেন একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক।

পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মসংস্থান অর্জনে সাহায্য করে। পেশাভিত্তিক বিশেষজ্ঞ যিনি প্রশিক্ষণ দেন, তিনি ভোকেশনাল কাউন্সিলর নামে অভিহিত। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বড় প্রিন্টারে প্রকাশিত পুস্তিকাসমূহ, সার্বিকভাবে ব্রেইল পদ্ধতির চালুকরণ। স্পেশাল স্পোর্টস ও বিনোদন সৃষ্টি হয়েছে ধরিত্রীর বুকে লাখ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন সার্থকভাবে গড়ে তোলার জন্য।

 

বস্তুত, অধুনা বিশ্বে ইশারা ভাষা হচ্ছে একটি সম্মিলিত যোগাযোগের দৃশ্যমান বৈশ্বিক ভাষা, যার মাধ্যমে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে এবং অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে যারা ইশারা ভাষা জানেন, তারাও যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাই বলে পৃথিবীর সব দেশের ইশারা ভাষা একজাতীয় নয়। বিভিন্ন দেশের ভাষা যেমন বিভিন্ন হয়ে থাকে, তেমনি ইশারা ভাষারও তারতম্য হয়ে থাকে।  উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, আমেরিকান ইশারা ভাষা থেকে ব্রিটিশ ইশারা ভাষা একেবারেই আলাদা ধরনের। আমেরিকা এবং অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশ এক-হস্ত বর্ণমালা (Single-Handed Manual Alphabet) ব্যবহার করে থাকে। পক্ষান্তরে, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিহস্ত বর্ণমালা (Double-Handed Manual Alphabet) ব্যবহার করে থাকে। যদিও হাতের প্রকাশভঙ্গি বিভিন্ন হয়ে থাকে।

 

আমেরিকান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইশারা ভাষা হচ্ছে সাইনিং ইন ইংলিশ, যা পরিপূর্ণ ইংরেজি ব্যাকরণ অনুসরণ করে, পক্ষান্তরে কথোপকথনের ভাষা সাইনিং ইন দ্য আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাটার্ন, যা সংক্ষেপ প্রকাশ এবং একে ASL বা AMESLAN বলে। উভয়ই অনুপম! আমেরিকান ইশারা ভাষা এক-হস্ত বর্ণমালা ইংরেজির ছোট অক্ষরগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, যা সহজভাবে মনে রাখা যায়, আবার বানান করে ইংরেজি বা বাংলাতেও বলা যায়। তবে বানানে পারদর্শিতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া বাংলার সংকেত বর্ণমালার সঙ্গে আমেরিকার ১৩টি ইংরেজি বর্ণমালার সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।

 

সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের বাংলা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সংকেত বা সাংকেতিক ভাষা। বাংলাদেশে যার নাম বাংলা ইশারা ভাষা। শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বধির সম্বোধন করে অনেকেই। অর্থ একই হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকতর শ্র“তিমধুর। বাংলাদেশের বাংলা ইশার ভাষা পরিচিতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য রয়েছে, যা দৃষ্টিনন্দন। সে হিসেবে এই ভাষাকে আমাদের অভিনন্দন জানানো উচিত। বাংলা ইশারা ভাষা হয়ে উঠুক এ দেশের দিশেহারা শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের আশা আর আলোর প্রতীক।

 

লেখক: প্রবাসী বাঙালি

অরোরা, ইলিনয়, ইউএসএ।