প্রসঙ্গ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এবং অ-প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্ব

20

সাবরিনা সুলতানা

 

আমাদের কন্ঠস্বর কেবলই রুদ্ধ করে রাখা হয়। আমাদের চিৎকারে কানে তুলো গুজে রাখে পরিবার তথা সমাজ। অথচ আমাদের বর্জন করা সামগ্রিকভাবেই সমাজের জন্য ক্ষতিকারক। জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ – সিআরপিডি বলছে ‘আমাদের ছাড়া, আমাদের জন্য কোন কিছু নয়’। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা – এসডিজি বলছে, ‘লিভিং নো ওয়ান বিহাইন্ড বা কাউকে বাদ রেখে’ নয়। এদিকে সমাজের ব্যবস্থাপনা এই ধারণার বিপক্ষে কাজ করছে। এই হারে প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি নেতিবাচক আচরণ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে টেকসই সমাজ গড়ার লক্ষ্য পূরণে অসমর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ বাদ দিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত হয় জাতীয় সমন্বয় কমিটি এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটি। প্রতিবন্ধী মানুষের মতামত গ্রহণের তোয়াক্কা না করেই একই আইনের আওতায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগও নিয়ে নেয় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। নীতি নির্ধারনী মহল এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অভিভাবক নামধারী উচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাসীনরা উদাসীন।

 

সুপ্রিয় পাঠক, একটু পেছনে যাই। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নের সময় এদেশের নারীরা কী অভিযোগ করেছিল, যেনতেন প্রক্রিয়ায় গুটি কয়েক সরকারি আমলা এবং নারীদের নিয়ে কর্মরত কোন স্বার্থান্বেষী মহল মিলে নারী নীতিমালা বিষয়ক সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলছে? এমনকি নারী নীতিমালা তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী নারীদের মতামত গ্রহণ করা হয় নি এই অভিযোগও আমরা পাই নি। সবার কাছে অগ্রহণযোগ্য বা স্বল্প কয়েকজনের মতামতের ভিত্তিতে নারী নীতিমালা তৈরি হয়েছে এমনটাও আমাদের জানা নেই।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো নিউরো ডেভেলাপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আগে যে সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল তাও মেনে চলা হচ্ছে না আমাদের মূল আইনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে। ট্রাস্ট আইনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির সময় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন চমৎকার ব্যবস্থাপনায় কর্মশালা আয়োজন করেছিল। নানাজনের সাথে যথেষ্ট পরিমাণ আলোচনা পরামর্শ করেই ট্রাস্ট আইনের কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে বলেই আমরা জানি। এমনকি সারা দেশের বিভিন্ন জেলার অভিভাবকসহ অনেকেই পরামর্শ প্রদানের সুযোগ পেয়েছিল।

 

সরকার প্রধানের কাছে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রশ্ন- বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের মূল আইনের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে কেন এতো তরিঘড়ি? সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, শিক্ষানীতি, শিশুনীতি, নারী নীতিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক দলিলসমূহ- সিআরপিডি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা, ইনচিয়ন কৌশল ইত্যাদি বিবেচনায় না রেখে কেন কর্মপরিল্পনা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো? তাছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন কী শুধুই রাজধানী কেন্দ্রিক মানুষের জন্য? নাকি তৃণমূলের প্রতিবন্ধী মানুষ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের মতামত প্রদানের স্বাধীনতা রয়েছে এখানে তা প্রতিবন্ধী মানুষ জানতে চায়।

উল্লেখিত সকল আন্তর্জাতিক দলিলপত্রে বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় প্রক্রিয়ার সদস্যদের মধ্যে সব ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষসহ প্রতিবন্ধী নারীদেরও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বরোপ করা হয়েছে।

 

আজকের দিনে ‘নারীর প্রতিনিধিত্ব পুরুষ করছে’ সমাজের কাছে এই ভাবনা হাস্যকর। সরকারি-বেসরকারি নারী অধিকারবিষয়ক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কমিটিগুলোতে পুরুষ প্রতিনিধিত্ব করছে এমনটা দেখে আমরা অভ্যস্ত নই। এমনকি কোনো নারীও তা মেনে নেবে না। কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব অ-প্রতিবন্ধী মানুষেরা করছে একে খুব স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া হয়। এমনকি প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যেও বাদ-প্রতিবাদ দেখা যায় না।

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারবিষয়ক কমিটিগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবির প্রশ্নে সরকারি কর্মকর্তারা কেবলই বিস্মিত হতে জানেন। প্রতিবন্ধী মানুষেরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, বিশেষত জাতীয় পর্যায়ের কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব করবে এ যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের বস্তু।

 

২০০১ সালের কল্যাণ আইনের নীতি সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে যখন শ খানেক অ-প্রতিবন্ধী মানুষের ভিড়ে মাত্র দু-তিনজন প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যায়, তখনো আমরা চুপ থাকি। দীর্ঘ পনেরো বছর পর বর্তমানের বাস্তবতায় অধিকার আইনের ছায়াতলে এসে আমরা দেখি, এই আইনের জাতীয় কমিটিও একই পথে হাঁটছে। তখনো আমরা চুপ থাকি।

আইন বাস্তবায়ন কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনোই থাকে না। এবারেও নেই এবং আশ্চর্য রকমের নীরব ভূমিকায় প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কর্মরত নেতৃবৃন্দ। তারা সব সময়ই কি নীরব ছিলেন না?!

 

শেষ কথাঃ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর পশ্চাৎপদতার ইতিহাস অতি প্রাচীন। রাষ্ট্রীয়, সরকারি এমনকি পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে ছিলেন যুগ যুগ ধরে। বাবার ইচ্ছায় এক জীবন শেষ করে স্বামীর দয়ায় আরেক জীবন। শিক্ষার অধিকার, চাকরির অধিকার সবই তাদের সিদ্ধান্ত। আর নারীকে তাদের এই দয়াতেই চলতে হবে। পাছে লোকে বদনাম করে এই ভয়ে মেয়েরা সাহস পেত না নিজের অধিকারের লড়াইয়ে সোচ্চার হতে। ধীরে ধীরে নারীরা একে অন্যের সঙ্গে সুখ-দুঃখ নিজেদের মধ্যে বিনিময় করতে শুরু করল। একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে করতে একসময় নিজেদের সংগঠিত হওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করল তারা। তারা ভাবতে শিখে গেল, দয়া বা করুণার জীবন কোনোভাবেই সম্মানজনক নয়। অধিকার অর্জনে রাস্তায় নামার তাগিদ অনুভব করল নারীরা। এভাবেই একসময় সমাজ তথা পুরুষের অদৃশ্য শৃঙ্খল ভেঙে নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে আসতে শুরু করল। একতাবদ্ধ তাদের শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে সমাজ ভয় পেতে শুরু করল। নারীদের এগিয়ে আসাকে সমাজ সাধুবাদ জানাতে বাধ্য হলো। ক্ষমতা অর্জনের লড়াই এত সহজ নয়, যদিও ক্ষমতা মানুষকে সামাজিক মর্যাদা এনে দেয়। নারীদের ক্ষমতায়িত করার জন্য সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সফলতাও লাভ করল নারীরা। আজ নারীর জন্য রয়েছে সতন্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সতন্ত্র   অধিদপ্তর। নারীর সিদ্ধান্ত আজ নিজেরাই নিচ্ছে তারা।

অনেক তো হলো প্রতিবন্ধী মানুষের পথচলা অন্যের নেতৃত্বে, এবার না হয় নারীর মতোই নিজেরাও চলি নিজেদের সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বে!