মেহেরপুর জেলা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের যাত্রা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইতিকথা

6

 

আকলিমা খাতুন

 

বছর কয়েক আগের একটি দুর্ঘটনা। থমকে পড়েছিল জীবন। ভেঙে পড়েছিল স্বপ্নগুলো। কখনো ভাবিনি, চাকায় গড়িয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব দীর্ঘ জীবনের এই কঠিন সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। কখনো ভাবতেই পারিনি এই আমি শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি টেনে কোমলমতি শিশুদের পাঠদানের সুযোগ পাব।

 

মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নারী হয়েও সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্তির দিনটি আমার স্বপ্নের পথচলার আবার শুরু হওয়া বৈকি। এরপর জীবন নানা দিকে বাঁক নিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পড়েছে। প্রতিবন্ধী নারী হিসেবে বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত হয়েছি। স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিজস অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিডাব)-এর নারী স¤পাদিকার দায়িত্বপ্রাপ্তও হয়েছি। সিডাব থেকে নেতৃত্বের দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পেরে মনে মনে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছি।

আচমকা আমার জীবনের নতুন বাঁক নেয় চলতি বছরের শুরুর দিকে। তরুণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নেতৃত্বে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর একটা প্রশিক্ষণ নিতে এসে দারুণ ধাক্কা খেলাম। আমি যা ভাবতাম, বলতাম, করতাম; তার একেবারেই ভিন্ন এক রূপ দেখলাম এই প্রশিক্ষণে। কিন্তু প্রবলভাবে উপলব্ধি করলাম, প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনে এর বিকল্প একেবারেই নেই।

প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) চত্বরের হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিবান্ধব এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সেই দিনগুলোতে আমি জেনেছি প্রতিবন্ধী মানুষ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত স¦ সংগঠনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা।

 

অনেক দিন থেকেই প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত করার চিন্তা মাথায় ঘুরছিল। এর আগে অনেকেই আমাকে সংগঠন করার কথা বলেছে। কিন্তু সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এ বছর পিএনএসপিতে প্রশিক্ষণের সময় এর পরিচালক রফিক জামান ভাইয়ের কাছে আমি প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং তাদের সংগঠনের ভূমিকা এবং আরও বিস্তারিত জানতে পারি। সত্যি আজ বুঝতে পারছি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার অর্জনের জন্য সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কাজ একমাত্র প্রতিবন্ধী মানুষেরাই করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলতে চাই, আমরা যদি প্রবেশগম্যতার কথা বলি, তাহলে প্রতিবন্ধী মানুষেরাই ভালো বোঝে তাদের চলার পথের বাধাগুলো এবং তাদের চাহিদা সম্পর্কে। মেহেরপুরে প্রতিবন্ধী মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের সংগঠিত করে এলাকার প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে জোরেশোরে কাজ করার স্বপ্ন আমাকে দেখালেন রফিক জামান ভাই। অনেক দিন থেকে ভাবছিলাম, এর বাস্তবায়নে কী করা যেতে পারে বা কীভাবে শুরু করা যায়। কিন্তু কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তারপরও প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে গেছি। দিনের পর দিন প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করেছি। তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখের কথা, না পাওয়ার বেদনা, তাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব ইত্যাদি জানার চেষ্টা করেছি। ধীরে ধীরে প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের গন্ডিটা বাড়তে লাগল। স¦প্ন বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে মেহেরপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রথম সভা করলাম চলতি বছরের ৪ জুন। প্রতিবন্ধী মানুষেরা সংগঠিত হয়ে সম্মিলিতভাবে কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে আমার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করলেন। কিন্তু এতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিল। অর্থনৈতিক সমস্যার চেয়ে প্রকট হয়ে দাঁড়াল সমাজের মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। মনে হচ্ছিল, স্বপ্নটা হয়তো আর সফল হবে না। আবার নিরাশ হয়ে পড়ছিলাম।

 

এরই মধ্যে সামনে চলে এলো ৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মেরুরজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত দিবস। একে ঘিরে মেহেরপুরে একটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করলাম। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি এ বিষয়ে কথা বললাম আমার শ্রদ্ধাভাজন বড় আপা সমতুল্য এবং গাড়াডোব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারিফা নাজমিনা আপার সঙ্গে। তিনি আমার সঙ্গে আলোচনায় বসলেন এবং আমি তার কাছে আমার ইচ্ছের কথা তুলে ধরলাম। দিবসটি আমি গাংনী উপজেলায় প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে বড় পরিসরে একটি মিলনমেলায় আয়োজন করতে চাই। এটা যে অনেক কঠিন কাজ, তিনি তা বুঝেছিলেন। তারপরেও আমাকে নিরাশ না করে উৎসাহ ও আশ্বাস দিলেন। বললেন, এই আয়োজনে যদি কেউ এক টাকাও না দেয়, তাহলেও আমি তোমার পাশে আছি। প্রয়োজনে আমি সহযোগিতা করব। এরপর গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজের দর্শনের প্রভাষক মাহবুব রহমান মিন্টু স্যারকে জানাতে তিনিও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। ২৮ আগস্ট ২০১৬ এলাকার প্রতিবন্ধী মানুষদের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো বসা হলো।

 

শুরু হয়ে গেল প্রতিবন্ধী মানুষদের মিলনমেলা আয়োজনের কাজ। প্রথমে আমাদের গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফ উজ জামান স্যারকে বিষয়টি বললাম। তিনিও সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এরপর উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, শিক্ষা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, মহিলা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, থানা ইনচার্জ, সুশীল সমাজের সুধীজন, সমাজসেবক এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মী সবার সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছি আমাদের এই আয়োজনকে সফল করতে। সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ৬ সেপ্টেম্বর আয়োজনের দিন ধার্য করা হয়।

 

গাংনীর নানা দিক থেকে আসা দেড় শ জন বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষসহ এখানে দুই শ জন অংশ নেয়। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবন্ধী মানুষের উপস্থিতি ছিল এখানে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ওমর ফারুক ভাই, যিনি সমাজসেবার কম্পিউটার অপারেটর। মূল প্রবন্ধ পাঠসহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করি, আমি মোছা. আকলিমা খাতুন (রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক)। এই সভায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দয়া বা করুণা নয়, তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুসারে কাজ দিলে তারাও দেশের জন্য অবদান রাখতে পারে। এই মিলনমেলায় আমরা প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য একটি সংগঠন শুরু করি। যে সংগঠন প্রতিবন্ধী মানুষদের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে। সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় ‘মেহেরপুর এ্যাসেম্বলি অব ডিজেবলস পিপলস’ (এমএডিপি)।

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন ডিপিওর বিকল্প নেই। কেননা একা কোনো কাজই করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠিত করতে হবে এবং নিজেদের মধ্যেই শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যেন আমরা একে অপরের সমস্যাগুলো তুলে ধরে তার সমাধান করতে পারি। অর্থাৎ সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হওয়াটা জরুরি।

 

আমার মতে, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় প্রতিবন্ধী নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাদের সংগঠিত করা খুবই জরুরি। এতে প্রতিবন্ধী মানুষ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীরা তাদের অধিকার স¤পর্কে সচেতন হবে এবং অধিকার অর্জনে কাজ করতে পারবে। তাই প্রতিটি জেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠিত এবং নিজ অধিকার স¤পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। তবেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব ও অবহেলা দূর হবে।