অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট নয়

36

বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা ২০১৬ (খসড়া) শীর্ষক মতবিনিময় সভা

 

অপরাজেয় প্রতিবেদক  

কল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধিতা-সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা ২০১৬ (খসড়া), মতব্যক্ত করেন,  বিশেষায়িত শিক্ষা বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও সংশিষ্ট ব্যক্তিরা।

জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী বক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি)-এর আদর্শ অনুসরণ করে এ নীতিমালায় অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রদানের প্রতি জোরালো গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।

 

প্রতিবন্ধিতা-সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৬ (খসড়া)-শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় আলোচকেরা একমত হন এই নীতিমালায় সিআরপিডির আলোকে অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন সুস্পষ্ট হয়নি, তেমনি এতে শিশু সুরক্ষা বিষয়েও সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষা উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বিশেষ বিদ্যালয়ের সঙ্গে আশপাশের সাধারণ বিদ্যালয়ের সংযোগ স্থাপন করার তাগিদ দিয়ে আলোচকেরা বলেন, বিশেষ বিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সংখ্যক শিশুকে মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি করানোর জন্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ঘোষণা বা নির্দেশনা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার পরিপত্র জারির মাধ্যমে প্রতিবন্ধিতা সনদসহকারে সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তির ঘোষণা দিতে পারে এবং পরবর্তীকালে সাধারণ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বিদ্যালয়কে আলাদাভাবে সরকার সম্মাননা জানাতে পারে। তবে সনদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নমনীয় থাকার সুপারিশ জানিয়ে বক্তারা বলেন, ভর্তির এক বছরের মধ্যে সনদ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করতে পারে।

 

প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদের (পিএনএসপি) আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. সাইফুল মালেকের সঞ্চালনায় এ সভায় উপস্থিত ছিলেন ফেরদৌসী মৌলা, পরিচালক, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন; মো. নূরুল ইসলাম, পরিচালক, সুইড বাংলাদেশ; রমিজ উদ্দিন, কর্মকর্তা, সুইড বাংলাদেশ; মো. মহসিন আলী, সেক্টর স্পেশালিস্ট, ব্র্যাক; রায়না মাকসুদ, নির্বাহী পরিচালক, ধূপ ফাউন্ডেশন; জাহিদ কবির, অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর (শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি একিভুতকরণ), ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ; হেমায়েতুন্নেসা পাপড়ি, অতিথি প্রভাষক, কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; হাসিব হাসান জয়া, হ্যাবিলিটেশন স্পীচ ল্যাক্সগুয়েজ প্যাথলিজি বিশেষজ্ঞ ও নির্বাহী সদস্য, সোসাইটি অব দ্য ডেফ এন্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল); আসমা আহমেদ, বিশেষ শিক্ষক, লালবাগ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের অটিজম কর্নার; পুস্পিতা গায়ের, বিশেষ শিক্ষক, সিড ট্রাস্ট; রফিক জামান, পরিচালক, পিএনএসপি; সালমা মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক, পিএনএসপি; সাবরিনা সুলতানা, সভাপতি, বি-স্ক্যান; রায়হানা রহমান, সমন্বয়ক, এসডিএসএল।

 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা’র খসড়া চূড়ান্ত করার আগে জনসাধারণের মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দিলে গত ১০ অক্টোবর ২০১৬ পিএনএসপি সম্মেলনকক্ষে প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষ শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন উপস্থিত প্রতিনিধিগণ।

‘প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা’র পরিবর্তে ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মঞ্জুরি নীতিমালা, ২০১৬’ নামকরণ করা দরকার বলে মনে করেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, এটি বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা নাকি অনুদান নীতিমালা, তা স্বচ্ছভাবে আসেনি। জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০-এর উদ্দেশ্যর সঙ্গে এই নীতিমালার মিল থাকা দরকার উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত সাধারণ বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিসমূহ প্রযোজ্য, তা বিশেষ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নেই। জেলা পরিষদের বিদ্যমান বিশেষ বিদ্যালয়গুলো তাদের থেকে শিক্ষা অনুদান পায়। কিন্তু এদের কোনো নিবন্ধন কাঠামো নেই। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই বিদ্যালয়গুলোকে নিবন্ধন করে না। এ কারণে এই বিদ্যালয়গুলোর একটি নিবন্ধন কাঠামো বা নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। নিবন্ধনের ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোর বয়স নির্ধারিত হবে এবং ধাপে ধাপে এই বিদ্যালয়গুলোকে অনুদান দেওয়া দরকার।

 

বিশেষ বিদ্যালয়গুলোর ব্যবস্থাপনা কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয় সভায়। বক্তারা একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করেন, যা সারা দেশের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যবেক্ষণ করবে। তবে প্রতিটি জেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক কর্মকর্তাগণ নিজ এলাকার বিদ্যালয় সম্পর্কে প্রতিবেদন পাঠাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান তদারক ও সহযোগিতা করতে পারে। এ সময় বলা হয়, সরকার কোনো বিদ্যালয়কে অনুমোদন ও অনুদান দিলে সেটি আপনাআপনি এমপিওভুক্তির সুযোগ-সুবিধা পাবে। এ ছাড়া জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্র আবার চালু করার তাগিদ দেওয়া হয় আলোচনায়।

এই নীতিমালায় শিশু সুরক্ষার বিষয়টি লিখিতভাবে রাখাসহ প্রত্যেক শিশুর চাহিদার ভিন্নতা অনুযায়ী বিশেষত মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী শিশু, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু এবং গুরুতর অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরি, প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা, সরকারি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিগুলোকে মূলধারার বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতিমূলক শ্রেণি হিসেবে তৈরি করা, শিক্ষক-ছাত্র আনুপাতিক হারে রাখা, শিক্ষকদের বদলির ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি সুপারিশ দেওয়া হয়।

 

উল্লেখ্য, নভেম্বর ১৬ তে এ প্রতিবেদন লেখার সময় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের আইনের অধীনে এই নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। তার আগে এ নীতিমালার ওপর মাউশির মতামত নিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এতে স্কুল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, পাঠদান ও পাঠ্যসূচিসহ অন্যান্য বিষয় তদারকির দিকনির্দেশনা আছে।