আজ নতুনদের দিন

15

নতুন বছর। নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার চেষ্টায় ‘ত্রৈমাসিক অপরাজেয়’ এবার পঞ্চম বর্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে অপরাজেয় পরিবারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। কৃতজ্ঞতা তাঁদের প্রতি, যাঁদের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব হতো এই পথচলা।

তবে নিঃসন্দেহে এই স্বল্প সময়ের পথচলা শিখিয়েছে অনেক কিছুই। অপরাজেয় তার সীমিত সাধ্যের মধ্যে থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছার চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভবিষ্যতেও অব্যাহত চেষ্টা থাকবে পত্রিকাটি যেন সত্যিকার অর্থেই প্রতিবন্ধী মানুষ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের অধিকার অর্জনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

 

কল্যাণ থেকে অধিকারের পথে

মূল স্রোতোধারায় অসংখ্য সাধারণ মানুষের ভিড়ে অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষও চলেছে সমান তালে, সমাজ এমনটা ভাবতে শেখেনি। খোদ প্রতিবন্ধী মানুষেরাই এই ভাবনা ভাবতে পারেন না! বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মুষ্টিমেয় যাঁরা দিন-রাত এক করে দিচ্ছেন, তাঁদের জন্য বেঁচে থাকাটাই নির্মম এক বাস্তবতা! কল্যাণের জায়গা থেকে বেরিয়ে অধিকারের পথে হাঁটছি ঠিকই, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের ইচ্ছা, স্বাধীনচেতনা ও আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে। ক্রীতদাসের মতো মেনে নিয়ে এবং মানিয়ে চলাতেই আমরা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছি। সম্ভবত অনেকটা নিজের অজান্তেই অদৃশ্য শিকলে বাঁধা পড়ে আছে আমাদের ইচ্ছেপাখিরা। নতুবা শিকল ভেঙে নতুনকে স্বাগত জানাতে কেন ভয় পাই আমরা! সমাজের চোখে ‘অযোগ্য-অথর্ব’ প্রতিবন্ধী মানুষেরা আমরা এহেন স্বাভাবিক ভাবনার মূলে আঘাত করার কথাও কেন ভাবতে পারি না এখনো!

 

যদিও যুগে যুগে পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্বে তাঁদের অধিকার অর্জনের আন্দোলনে সফলতা এসেছে। উন্নত দেশগুলোর রাষ্ট্রযন্ত্র বাধ্য হয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে মাথা নোয়াতে। নিশ্চিত হয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, চাকরি, যাতায়াত তথা সর্বত্র প্রবেশের অধিকার। কারণ, দয়াদাক্ষিণ্য, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত হবার ভয়ে অথবা ক্ষমতাসীনদের সামনে তাঁদের প্রতিবাদী কণ্ঠ চুপসে যায়নি। সমাজে সমমর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে ক্ষমতাসীনদের পরোয়া না করে রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন তাঁরা। এমনকি পাশের দেশ ভারত পর্যন্ত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদফতর বাস্তবায়ন করেছে তারা আরো আগেই। অথচ আমরা এখনো ভাবতেই পারি না প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্ব, প্রতিনিধিত্ব তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে ক্ষমতায়ন। তাই আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর বাস্তবায়নে সরকারপ্রধানের অঙ্গীকার ধুলোয় গড়ায় বছরের পর বছর ধরে। বাস্তবায়িত হয় না জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি)সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সনদ, ঘোষণা ও দেশীয় নীতিমালা।

 

প্রাপ্য অধিকারের প্রশ্নে আমরা মুখ বুজে থাকি। দাবি আদায়ে সোচ্চার হতে আমরা মাঠে নামি না। কিন্তু কোনো আন্দোলন, কোনো দাবি ঘরে বসে অর্জিত হয় না। কোনো আন্দোলন সফল হয় না সম্মিলিত শক্তি ছাড়া। প্রতিবন্ধী মানুষ তার প্রবেশগম্যতার অধিকার চায়। তারা চায় সব জায়গা, সব তথ্য হোক উন্মুক্ত, যেন তারা ভুলেই যায় তাদের কোনো প্রতিবন্ধিতা আছে।

আজ নতুনদের দিন। মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি নিয়ে বজ্রকণ্ঠে দিনবদলের হাঁক দিতে পারে আগামীর তরুণ নেতৃত্বধারীরা। তারাই হয়তো আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখাবে শিকল ভাঙার। দয়াদাক্ষিণ্য বা কল্যাণের কথা ভুলে ধৈর্য-সহ্য নিয়ে সত্যিকার অর্থেই মাথা তুলে নিজের অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় হবার দুঃসাহস দেখাতে পারে তারাই, যারা ক্ষমতায়নের স¦প্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে পারে, হয়তোবা তারা প্রস্তুত হচ্ছে মনে-মননে।

প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্ব বা টগবগে তরুণ সমাজের হাত ধরে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার ভিন্ন ধাঁচের এই স্বপ্নগুলো জন্ম নিচ্ছে সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠনগুলোর ছায়াতলে। যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষেরাই নেতৃত্ব দেন, প্রতিবন্ধী মানুষেরাই সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রতিবন্ধী মানুষেরাই তা বাস্তবায়ন করেন।

 

বিশেষ নয়, চাই চাহিদার ভিত্তিতে একীভূত শিক্ষার অধিকার

‘বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পাস করতে পারবে না। তাদের সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা নেই।’ শিক্ষক যদি এমন ধারণা পোষণ করেন, তাহলে একে কী বলা যায়। বিশেষ বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে সমাজের দায়িত্বশীলদের নেতিবাচক আচরণের হেতু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

 

এ দেশের অটিস্টিক শিশুর উচ্চশিক্ষা সমাজ ভাবতে পারে না। কিন্তু এমনটা ঘটেছে এবং পেয়েছে সমাজের স্বীকৃতিও। রাজধানীবাসী একজন অটিস্টিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ২০১৬ সালের এ লেভেল পরীক্ষা দেওয়ার খবর দেশের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছেন সকলে। যদিও তাঁর পথটা নিঃসন্দেহে কণ্টকময় ছিল! অভিনন্দন তাঁর জন্য।

কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, বছর সাত-আট আগে চট্টগ্রামের এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছাত্রী বিশেষ বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শেষে সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল বলে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেকেরই কটূক্তির মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে এবং তার অভিভাবককে। অসম্ভবের যুদ্ধে সে হার মানেনি। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে সে দেখিয়ে দিয়েছিল, ইচ্ছা ও একাগ্রতা থাকলে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। যদিও অজপাড়াগাঁয়ের সেই ছাত্রীকে কেউ অভিবাদন জানায়নি সেদিন।

 

সরকারি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, সারা দেশে যা আছে তা একেবারেই হাতে গোনা এবং সব কটিরই অবস্থা বেহাল। অরক্ষিত, অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই কোনোমতে পড়ালেখা করছে এখানকার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। আবাসিকে প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের নিরাপত্তাজনিত সংকট সত্ত্বেও অভিভাবকদের মুখে থাকে কুলুপ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দিন-রাতে মিলিয়ে আর যা যা ঘটে, তা যেমন সব জানেন অভিভাবকেরা, তেমনি জানেন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও। এক-আধটু আলোচনা, সমালোচনা তা নিজেদের মধ্যেই। তারপর শেষ। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থার নিবন্ধনে কোনো কোনো বিশেষায়িত বিদ্যালয় পরিচালিত হয় নিবন্ধনবিহীন, অথচ তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নেই। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা-পরবর্তী সাধারণ বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য তৈরি করতে বিশেষ বিদ্যালয়গুলোতে যথাযথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে কি? অথবা সাধারণ বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী কতসংখ্যক তার কোনো পরিসংখ্যান কি রয়েছে? দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ বিদ্যালয়ে সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলেও শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে কেন বঞ্চিত, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভাবনা কি? এমন নানা প্রশ্নই ঘুরেফিরে বারেবারে মনে দোলা দিয়ে যায়, আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা কল্যাণের ছায়া থেকে বেরিয়ে আদৌ কি অধিকারের পথে হাঁটতে পারছি?

 

আমরা যদি একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের কথা বলি এবং জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি) এবং সম্প্রতি ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) দিকনির্দেশনা ধরে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হই, তাহলে নতুন করে অনেক কিছুই ভাববার রয়েছে বৈকি!