টঙ্গী সমাজসেবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তিক্ত অভিজ্ঞতা

16

মিনহাজ উদ্দীন তালুকদার

নানা দস্যিপনায় পাড়া মাতিয়ে ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানায় বেড়ে ওঠা আমার। পাশাপাশি সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্নে পড়ালেখাও চলছিল।

বিপত্তি বাধল ২০০৪ সালে চোখে স্বল্পমাত্রার দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা ধরা পড়ায়। যা বৃদ্ধি পেতে পেতে অতি দ্রুত আমি হয়ে পড়ি একজন প্রায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষে। ভোলার গন্ডগ্রামে ব্রেইল শিক্ষার বিষয়ে পরিবারের কেউ তখন কিছু জানতে পারেনি। ফলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। তারপর বেকার জীবন কাটিয়েছি প্রায় ছয় বছর।

 

২০১১ সালে বাবা আমাকে টঙ্গী সমাজসেবা কার্যালয়ের ইআরসিপিএইচ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করালেন। সেখানকার কর্মকর্তাদের কাছে দীর্ঘ ছয় মাসের একটি প্রশিক্ষণ পেলাম বাঁশ-বেতের কাজের ওপর। আমরা পাঁচজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ সেখানে একত্রে ছিলাম তখন। আরও অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষও ছিলেন। প্রথম দিন আমাদের আবাসিক কক্ষে বসে গল্প করছিলাম। হোস্টেল সুপার এসে জানিয়ে দিলেন, যার যার মালামাল নিজের হেফাজতে রাখতে হবে। চুরি হলে তাদের কোনো দায় নেই। এ কথা শুনে আমরা সবাই বেশ সচেতন হয়ে পড়েছি।

যা হোক, পরদিন সকালে আমরা পাঁচজন নতুন কিছু শেখার আকাংক্ষায় প্রথম দিনের প্রশিক্ষণের জন্য দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম। কিন্তু একি! বাঁশ-বেতের কাজ শেখানোর জায়গায় গিয়ে দেখি, সেখানে কোনো প্রশিক্ষক নেই। আমরা সবাই মিলে এ কথা হোস্টেল সুপারকে জানালে তিনি বললেন, প্রশিক্ষক এখন নেই। ওখানে যেসব চেয়ার-টেবিল বানানো আছে, সেগুলো খুলে আবার লাগাতে থাকো। কয়েক দিনের মধ্যেই তোমাদের প্রশিক্ষক চলে আসবেন। এভাবেই কেটে গেল এক মাস। কিন্তু আমরা কোনো প্রশিক্ষকের দেখা পাই না।

 

টঙ্গী সমাজসেবা কার্যালয়ে বাঁশ-বেতের প্রশিক্ষণে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রশিক্ষক অপরিপক্ব পাঁচ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ। নিজে নিজে বহু কষ্ট করে চেষ্টা করেও কেষ্ট জুটল না কপালে! কিছুই শিখতে পারছিলাম না। পরবর্তীকালে আমাদের পাঁচজনের দুজন সিদ্ধান্ত নিলাম, একই কার্যালয়ের মুরগির খামারে কাজ শিখতে চলে যাব। বাকি তিনজন সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছেলে হওয়ার দরুন আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারল না।

আমরা দুজনেই মুরগি পালনের সেই শাখায় গিয়ে দেখলাম, সেখানে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেরা আছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণার্থীরা জানালেন, এখানে অনেক বড় বড় বেজি আছে, যা মুরগি খেয়ে ফেলে। তাই আমাদের মুরগি পাহারা দিয়ে রাখতে হবে। প্রতিদিন সকালে খামার পরিষ্কারের দায়িত্ব পড়ল আমাদের দুজনের ওপর। আমরা তাই-ই করতাম। কিছুদিন আমরা ভালোই কাজ করলাম। কিন্তু বেজিগুলো দমন করা যাচ্ছিল না। প্রতিদিন দু-একটা মুরগি নিয়ে যায়, আবার টঙ্গী সমাজসেবা কার্যালয়ের সরকারি কর্মকর্তারা মুরগি দিয়ে যায় আর এভাবেই চলে আমাদের দিনকাল।

 

কয়েক দিন পর অপর এক শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণার্থী ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানকার শিক্ষক কোথায়? তারা বললেন, এখানে শিক্ষক আছেন, তবে তিনি কার্যালয়ে আসেন কদাচিৎ, আবার কাজ সেরে চলে যান। কী কাজ তিনি করেন বুঝলাম না। একদিন এসেছিলেন, সবার সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষে চলে গেলেন।

তাহলে কি প্রশিক্ষক স্যার আমাদের হাতেকলমে কাজ শেখাবেন সেই সুযোগ আমরা এই সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এসেও পাব না! সবাই আলোচনা করে ঠিক করলাম, জেনারেল ম্যানেজার স্যারের সঙ্গে কথা বলব। সবাই গেলাম স্যারের কক্ষে। স্যার বললেন, কাজের খুব চাপ যাচ্ছে, কাল থেকে যাবে তোমাদের প্রশিক্ষক। কিন্তু সেই ছয় মাসের প্রশিক্ষণের ভেতরে প্রশিক্ষক স্যার আমাদের ক্লাস করিয়েছিলেন তিন-চার দিন।

 

সত্যি কথা হলো, এই ছয় মাসে আমরা বসে বসে দিন কাটালাম। আর ওই বাঁশ-বেতের শাখার তিনজনও শুয়ে-বসে দিন কাটিয়েছিল। স্বীকার করছি, ছয় মাস পর একটি সনদ এবং চার হাজার টাকা পাব এই ভেবে দিন কাটিয়েছিলাম আমরা। কারণ, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই সনদ সমাজসেবায় দেখালে বিনা সুদে ৫০ হাজার টাকা ঋণ পাওয়া যাবে, যা দিয়ে আমরা কোনো একটা কাজ শুরু করতে পারব।

কিন্তু আমাদের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর বাঁশ-বেতের সনদ ও টাকা পেয়েছি। অবশ্য এর আগে আমরা প্রতিবাদ করে সনদ চাইলেই আমাদের জানানো হতো, তোমাদের খামার শাখার কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না, তাই দেরি হবে সনদ পেতে। সেই বাঁশ-বেতের সনদ নিয়ে আমাদের উপজেলা সমাজসেবা অফিসে গিয়েছিলাম। তাঁরা বললেন, ফান্ডে ঋণের অর্থ আসেনি। তারপর প্রতিবছর আমি সমাজসেবা কার্যালয়ের ঋণের জন্য ঘুরেছি, কিন্তু তাঁরা প্রতিবারই একই কথা বলেছেন। কিছুদিন পর তাঁরা আবার ভিন্ন কথা বললেন। জানলাম, এই সনদের কোনো মূল্য নেই। তাঁরা তখন বলেছিলেন, যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে ঋণ দেওয়া হয়, সেখানে গেলে পাওয়া যেতে পারে। আমি সেখানে গেলাম। সেখানে আমাকে লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে, প্রশিক্ষণ নিতে হবে তাই আর সম্ভব হলো না আমার পক্ষে।

 

দুঃখজনক হলো, সরকার প্রতিবন্ধী মানুষকে ভাতা দেয়, সেই সরকারি ভাতা নিয়েও সরকারি কর্মকর্তারা অর্থ আয়ের পথ খুঁজে বের করেন। আমাদের উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়গুলোর সরকারি কর্মকর্তারা প্রতিবন্ধী মানুষের ভাতা বইয়ের খরচ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নাম করে আমাদের ভাতা কার্ড থেকে বইপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পরিমাণ অর্থ নিয়ে নেয়। তার চেয়েও দুঃখজনক হলো, এই বিষয়গুলো আমাদের মেনে নিতে হয়। আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা এই বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানাতে ভয় পাই। হয়তো তাই দিনের পর দিন আমাদের সঙ্গে এই বৈষম্যগুলো করা হয়ে থাকে।