দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন’- ২০১৪

28

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোর (ডিপিও) দাবিসমূহ বিবেচনার আহবান।

 

১.  প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন :

ক. সম্প্রতি প্রণীত “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” এবং “নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩” এর কার্যকর বাস্তবায়নে দ্রুত আইন দুটির বিধি প্রণয়ন, অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

খ. ‘লুনাসী অ্যাক্ট ১৯১২’ বাতিল করে মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষায় নতুন মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করতে হবে।

গ. আইন কমিশনের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার অর্জনে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদের আলোকে সকল আইনের সাংঘর্ষিক সুনির্দিষ্ট ধারাগুলো চিহ্নিত করে তার সংশোধন এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে তাদের বিশেষ চাহিদার প্রেক্ষিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

২. প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষা :     

ক. নতুন আইনে প্রতিবন্ধী শিশুর সাধারণ বিদ্যালয় কর্তৃক ভর্তি প্রত্যাখ্যান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিশেষ শিক্ষাসহ সকল রির্সোস বিদ্যালয় হস্তান্তরিত করাসহ তাদের শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে সকল দায়-দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।

খ. একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।

গ. প্রতিবন্ধী শিশুর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণ, উপবৃত্তি বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক, খেলাধুলা ও বিনোদন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

ঘ. বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপনসহ এই ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান ও প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

৩. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন :

ক. রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: অ. প্রতিবন্ধী নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে এবং রাজনৈতিক দলের কমিটিতে এক শতাংশ পদ সংরক্ষণ ও ভোটদানে উৎসাহ দানে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

খ. সামাজিক ক্ষমতায়ন: অ. প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংক্রান্ত আইনের সকল কমিটিতে বেসরকারি সদস্য প্রতিনিধিত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিয়োগ দান করতে হবে।

আ. সকল বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা শিশুর অভিভাবদের জন্য পদ সংরক্ষণ করতে হবে।

ই. স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাজার কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষণের সুযোগ রাখতে হবে।

গ. সংগঠিতকরণ : অ.প্রতিবন্ধী মানুষকে সংগঠিতকরণে উৎসাহ দান, সংগঠন সৃষ্টিতে স্থানীয় সরকারের সহায়তা ও সংগঠনের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ আর্থিক অনুদান প্রদান।

আ. প্রতিবন্ধী জনগণের জন্য উন্নয়নে এবং প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের সংগঠনকে অগ্রাধিকার প্রদান।

 

৪. প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন :

ক. জেন্ডার ও শিশু সংবেদনশীল বাজেট কাঠামোর মত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংবেদনশীল বাজেট কাঠামো প্রণয়ণ করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে উপকারভোগীর ছকে দ্রুত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা নির্ধারণ করা।

খ. প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, মহিলা ও শিশু, পরিকল্পনা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, যুব ও ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক, শ্রম ও কর্মসংস্থান, যোগাযোগ এবং তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কার্য বন্টন বিধির্ (Allocation of Business)  দ্রুত সংশোধন করে প্রতিবন্ধী জনগণের উন্নয়নে দায়িত্ব প্রদান করে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা।

গ. বিবিএস’র মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিষয়ে প্রতি তিন বছর পর একটি জরিপ পরিচালনা করতে হবে।

ঘ. সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সকল দরিদ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভূক্তিকরণ ও তাদের উপযোগী বিভিন্ন র্কমসূচি প্রণয়ন।

   

৫. স্বাস্থ্য :

ক. প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত বিশেষায়িত সেবাসমূহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সকল স্তরে রেফারেল পদ্ধতি প্রর্বতণ করতে হবে।

খ. সকল প্রতিবন্ধী শিশুকে প্রতি বছরে প্রতিবন্ধিতার ধরণ ও মাত্রা মূল্যায়নে ডাক্তারের দ্বারা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

গ. প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন ও অভিভাবকদের লালন প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

ঘ. প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য বিনামূল্যে সহায়ক উপকরণ বিতরণ এবং এর উৎপাদনে সরকারি শিল্প স্থাপন করতে হবে।

 

৬. কর্মসংস্থান :

ক. বিসিএস চাকুরিতে এক শতাংশ সরাসরি কোটা প্রবর্তণসহ সরকারি বিভিন্ন শ্রেণীর পদে কোটা বাস্তবায়ন করতে হবে।

খ. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্নকর্মসংস্থানে ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারে সার্বজর্নীন নক্সা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

 

৭. প্রতিবন্ধী নারী ও শিশু: মহিলা অধিদফতরে প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি সাধারণ নারী উন্নয়নের চলমান কার্যক্রমের সুযোগ-সুবিধা ও প্রকল্পে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। প্রতিবন্ধী নারীর আত্নকর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে উৎসাহিত করতে হবে। নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের চলমান সকল কার্যক্রমসহ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্যাতিত প্রতিবন্ধী নারী ও শিশু বান্ধব করতে হবে।

 

৮. বিবিধ :

ক. প্রস্তাবিত জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালাসহ গণস্থাপনা ও গণপরিবহনে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

খ. ভূমিহীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের সংগঠনের জন্য খাস জমি বরাদ্দ এবং সামাজিক বনায়নে অংশগ্রহণে বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

 

আমরা আশা করি, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে আমাদের অধিকার, মর্যাদা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উপস্থাপিত দাবিগুলো বিশেষ গুরুত্বের সাথে প্রতিফলিত হবে। প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠনগুলোর (ডিপিও) পক্ষে-

সোসাইটি অব দি ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল), বাংলাদেশী সিস্টেমস চেঞ্জ এ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক (বি-স্ক্যান), বাংলাদেশ ভিজুয়্যালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস), কল্পনা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা, ফাউন্ডেশেন অব দ্যা ডিফরেন্টলি অ্যাবেল্ড (এফডিএ), সিলেট বধির সংঘ, বানারিপাড়া প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদ, জলঢাকা প্রতিবন্ধী সমাজ, স্যোশাল একশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি (এসএডি)।