প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট

80

এই অঞ্চলে আঠারো শতকের একেবারে শেষ ভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর আজকের দিন পর্যন্ত প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস, তাদের অধিকার অর্জনে কর্মরত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন, এনজিও/আইএনজিও তথা দাতা সংস্থা ও সরকারের কার্যক্রমসমূহ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধটি লিখেছেন রফিক জামান 

 

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আন্দোলনের নানা প্রচেষ্টা আর আন্তর্জাতিক মতৈক্যের মধ্য দিয়ে তারা আজ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। যদিও প্রতিবন্ধী মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট বর্গ বা গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশের। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতার বৈচিত্র্য নিয়ে শিশু জন্ম নেয় সাধারণ পরিবারগুলোতে। আবার নানা দুর্ঘটনায় আর রোগব্যাধিতে বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষেরা প্রতিবন্ধিতা বরণ করে। সাধারণ পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরিতে তেমন কোনো যোগসূত্র নেই। অন্যদিকে সব সমাজই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধিতাকে অক্ষমতা বা বাবা-মায়ের পাপের ফলসহ নানা নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে আসছে। তাই পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র সকল ক্ষেত্রে তাদের দৃশ্যমানতা বা অংশগ্রহণে বাধা দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে শত শত বছর ধরে। ফলে একই বা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বা যৌথতা অন্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতো সমাজভিত্তিক ধারায় গড়ে ওঠে না। অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর থেকে তাদের সমাজ বিকাশের প্রক্রিয়া বা সংকট ভিন্ন।

 

ফিরে দেখা ভারত ভাগের পূর্বে

সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুটি হতাশা ও অসহায়ত্বে জর্জরিত। সে দেখতে পায় পরিবারে ও তার পারিপার্শ্বিক পরিমন্ডলে সে একমাত্র কথা বলতে পারে না। তার ধারণা, সারা বিশ্বে একমাত্র সেই কথা বলতে পারে না। এই অবস্থার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুকে মুক্ত করে কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়। ১৮৯৩ সালে স্থাপিত এ বিদ্যালয় এই অঞ্চলের প্রথম বিশেষ শিক্ষা বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে এসে একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু দেখতে পায় তারই মতো আরেকজনকে। আস্থাশীল হয় নিজের ও জগতের প্রতি। স্বপ্ন দেখে জীবনযাপনের সংগ্রামে। এ জগতে নিজেকে যেমন প্রকাশ করা যায়, তেমনি বোঝা যায় অন্যের অনুভূতিকেও। যদিও তার জন্য গড়ে তুলতে হয় নিজস্ব ভাষা আর সংস্কৃতি। নতুন এক বোধ প্রাপ্তি, বর্গের অনুভূতি। এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বাবু যামিনী নাথের সন্তান এইচ সি ব্যানার্জির ১৯২৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, কলকাতা, ঢাকা ও বরিশাল মূক ও বধির বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইশারা ভাষা ব্যবহার করছে। যদিও তিন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইশারার পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ শিক্ষা বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্য দিয়ে বর্গ বা গোষ্ঠীবোধ জাগ্রত হয়। কলকাতা বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা যোগাযোগের বাধার কারণে নিজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আবেগ-অনুভূতি বা তার ব্যক্তিগত সংকট প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। অথচ ইশারা ভাষায় সতীর্থদের মধ্যে তা সহজে প্রকাশ করতে পারে। ফলে নিজেদের চাহিদায় ১৯৩৫ সালে বঙ্গীয় বধির সংস্থা গঠন করা হয়। এ সংগঠনই এই অঞ্চলের প্রথম প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন।

 

শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের অভিজ্ঞতার মতোই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস

রেভারেন্ট লাল বিহারী শাহ ১৮৯৪ সালে কলকাতায় অন্ধ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শ্রী নগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ১৯১৯ সালে প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি সম্মান ডিগ্রি লাভ করে ভারতে প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অধ্যাপক হন। সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ১৯৪৬ সালের ৫ ডিসেম্বর গঠিত বঙ্গীয় অন্ধ সংস্থার প্রথম সভাপতি ছিলেন তিনি। লাল বিহারী শাহ দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বরণ করার পর শিক্ষকতা ছেড়ে শুধু ব্রেইল নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি বাংলা ব্রেইল প্রবর্তন করেন। কলকাতাকেন্দ্রিক এ দুই সংগঠনের নেতৃত্বে সারা বাংলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়।

 

দেশে বিশেষ শিক্ষা বিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়া

ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে দুই একটি শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয়ের কার্যক্রম দেখা যায়। যদিও এসব বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও সুসংগঠিত ছিল না। ১৯৩১ সালে রাজশাহীতে, ১৯৩৯ সালে বগুড়ায় এবং ১৯৪২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মূক ও বধির বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। তিনটি বিদ্যালয়ই বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপন করা হয়। কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জনাব মঞ্জুর আহমেদ কলকাতা থেকে দেশে এসে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী মূক ও বধির বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি বঙ্গীয় বধির সংস্থার নেতা হিসেবে পূর্ববঙ্গের দায়িত্ব পালন করেন পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত। মঞ্জুর আহমেদ, হারুন উর রশিদ খানসহ কলকাতা ফেরত সাবেক শিক্ষার্থীরা এবং ঢাকার বিজয় কুমার সাহাসহ পুরান ঢাকার শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ১৯৬৩ সালে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান মূক ও বধির সংস্থা গঠিত হয়। এই সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জনাব মঞ্জুর আহমেদ দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন।

রোটারি ক্লাবের উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ঢাকায়। কলকাতা অন্ধ বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী এবং আব্দুল মালেক শিক্ষক হিসেবে এখানে যোগ দেন।

 

পূর্ব পাকিস্তানে ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত সরকারি কোনো বিশেষ শিক্ষা বিদ্যালয় ছিল না। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে হেলেন কেলার পাকিস্তান সফরে এসে পাকিস্তান সরকারকে বিশেষ শিক্ষা বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রভাবিত করেন। ষাটের দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা বিভাগ বগুড়া মূক ও বধির বিদ্যালয়ের জন্য নতুন জমি ক্রয় ও অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ করে। মূলত পঞ্চাশের দশকের শেষে পাকিস্তান সরকার সমাজকল্যাণ কার্যক্রমকে জোরদার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর আওতায় প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন কার্যক্রমকে সমাজকল্যাণকেন্দ্রিক করা হয়। ১৯৬২ সালে চারটি বিভাগে পিএইচটিসির আওতায় সমাজসেবা পরিদপ্তর একই সঙ্গে দৃষ্টি এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আটটি বিদ্যালয় স্থাপন করে। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে ১৯৬৫ সালে চাঁদপুর ও ফরিদপুরে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশুদের এবং বরিশালে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বিশেষ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সব সময় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বোধসহ নেতিবাচক কিছু প্রভাব দেখা যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে উন্নত দেশগুলোতে সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। আন্তর্জাতিক ধারাবাহিকতায় সরকার ১৯৭৪ সালে ৪৭টি সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। পরবর্তী সময়ে তা বেসরকারি পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়।

 

আশির দশকের শুরুতে শিক্ষায় বড় আকারে বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হলে বৈদেশিক অর্থায়নে এনজিওর মাধ্যমে বিশেষ বিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ ঘটে। প্রায় ৯০ বছরের শ্রবণ ও বাক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ শিক্ষা বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বুদ্ধি ও বহুমুখী প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ বিদ্যালয়ের কার্যক্রমের নতুন মাত্রা ঘটে। নরওয়ে সরকারের অর্থায়নে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবকদের নেতৃত্বে সুইড বাংলাদেশ এবং সুলতানা সারোয়াত জামানসহ বিশেষায়িত পেশাজীবীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন দেশের বিভিন্ন জেলায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয় স্থাপন করে। ২০০১ সাল থেকে এসব বিদ্যালয় সরকারের সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে এই দুই প্রতিষ্ঠানের স্থাপিত ৫০টি বিদ্যালয় সরকার এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার মতো নতুন ব্যবস্থাপনার কাঠামোর আওতায় শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন দিয়ে পরিচালনা করছে। সুইড স্থাপিত বেশ কিছু শিক্ষার্থীবিহীন বিশেষ বিদ্যালয়ের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই বরাদ্দ বন্ধ করার ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া এক দশকে ধরে অটিস্টিক শিশুদের জন্য বেশ কিছু বিদ্যালয় ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা বা বিদ্যালয় স্থাপনে শিক্ষক নিয়োগ-বাণিজ্যের মতো ২০১২ সালে থেকে বিশেষ বিদ্যালয়ের নামে শিক্ষক নিয়োগ-বাণিজ্য মহামারী রূপ ধারণ করে। ফলে সারা দেশে গত চার বছরে নামসর্বস্ব বিশেষ বিদ্যালয়ের সংখ্যা চার গুণের বেশি বেড়েছে।

 

১৯৯৪ সালের সালমানকা ঘোষণার মাধ্যমে বিশেষ শিক্ষার বিপরীতে একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে বিশেষ বিদ্যালয়সংক্রান্ত সব বৈদেশিক অর্থায়ন তুলে নেওয়া হয়। দেশে এই নীতির আলোকে সুইড ও বিপিএফের বিদ্যালয়সমূহের নরওয়ে সরকারের অর্থায়ন ১৯৯৯ সালে বন্ধ করা হয়। প্রথম থেকে সাধারণ বিদ্যালয়ের ভেতরে বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সুইডের ওপর নরওয়ের নির্দেশনা ছিল। ২০০০ সালে এই অর্থায়ন তুলে নিলে বেশির ভাগ বিশেষ বিদ্যালয়ই বন্ধের হুমকির মধ্যে পড়ে। নিজেদের বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বিপিএফ তার সকল বিদ্যালয়ে এবং সুইড চট্টগ্রাম ও লালমনিরহাটে সাধারণ শিশুদেরসহ একীভূত কার্যক্রম চালু করে। পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-২) আওতায় সারা দেশে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিশুসহ একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি) বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী বা পৃথক্করণী বিশেষ শিক্ষার পরিবর্তে একীভূত শিক্ষার কার্যকর সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। শিক্ষা সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে বর্গ বা গোষ্ঠী প্রবণতা গড়ে ওঠে। যদিও এখনো সিআরপিডি বাস্তবায়ন থাকার পরেও সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা পৃথক্করণী বিশেষ শিক্ষা হ্রাসের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

 

১৯৬৪ সালে জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থা গঠিত হয়। স্বাধীনতার পূর্বে জাতীয় বধির সংস্থার সহায়তায় জেলা পর্যায়ে প্রথম নারায়ণগঞ্জ মূক ও বধির সংস্থা গঠিত হয়। ষাটের দশকে এই দ্ইু সংস্থার মাধ্যমে দেশের দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত হওয়া মৌলিক ভিত্তি পায়। সত্তর দশক পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অনুদানে দুই সংগঠনই নিজেদের কার্যালয় ও কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধী মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে এই দুই সংগঠনই জেলা পর্যায়ে তাদের সংগঠন সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা নেয়। জেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন হলে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের হিসেবে এই সংস্থাসমূহ ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে আশির দশকের শেষে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে জাতীয় বধির সংস্থা ও জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থার সদস্যরা নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহে জড়িয়ে পড়ে। ফলে স্বাধীন ও স্থানীয় এই দুই প্রতিষ্ঠান বিগত তিন দশকে যথাযথ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে এই দুই প্রতিষ্ঠানকেও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা তাদের সুনির্দিষ্ট চরিত্রগত কারণে কখনোই আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে এগিয়ে আসেনি।

 

স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিবন্ধী মানুষের যোগসূত্র

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ যুদ্ধে এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা প্রদানে ঢাকায় গড়ে ওঠে পঙ্গু হাসপাতাল। ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল, বিএনএসবিসহ বাংলাদেশে বেশ কিছু চক্ষু হাসপাতাল স্থাপিত হলেও স্বল্প বা সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন বা কাউন্সেলিং কার্যক্রম গড়ে ওঠে নব্বই দশকের শেষ দিকে। এই দশকে সাহিক বা হাইকেয়ার বিদ্যালয়ের অডিও সেন্টারের মাধ্যমে স্বল্প শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশুদের সাবলীল জীবনে খাপ খাওয়ানোর কার্যক্রম হাতে নেয়। বিশেষায়িত এসব হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের সাবলীল জীবনে খাপ খাওয়ানো, পুনর্বাসন বা কাউন্সেলিং কার্যক্রমের পাশাপাশি সমাজে সফল বা প্রতিষ্ঠিত একই ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ বা তাদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে এসে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষেরা একে অন্যের সঙ্গে বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিভিন্ন প্রচেষ্টা বা তাদের সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। শিক্ষা বা চিকিৎসা সেবা গ্রহণের ধারাবাহিকতায় তারা তাদের অধিকার ও কর্মসংস্থানসহ নানা ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবগত হয়।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন ও স্বসংগঠন

বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত স্লোগান ‘আমাদের ছাড়া আমাদের বিষয়ে কিছু নয়’। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন প্রতিষ্ঠার মুখ্য উদ্দেশ্য এই স্লোগানের চেতনায় গড়া। এটা আজ সর্বজনস্বীকৃত, প্রতিবন্ধী জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই মুখ্য নিয়ন্ত্রক অর্থাৎ প্রতিবন্ধী মানুষের দ্বারা বা মালিকানায় পরিচালিত সংগঠন। প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এই সংগঠনের কোনো বিকল্প নেই।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের কোনো সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত সুস্পষ্ট হয়নি। তবে অনস্বীকার্য যে, শতভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত সংগঠনই সর্বোত্তম। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালা, ২০১৫ প্রণয়নে প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এর প্রস্তাব ছিল, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন অর্থ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ স্বয়ং বা যেসকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেদের অধিকার, মতামত ও সিদ্ধান্ত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না, যেমন অটিজম প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ডাউন সিনড্রোম প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বহুমুখী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর মাত্রার যাহারা, তাহাদের পক্ষে মাতা-পিতা বা বৈধ বা আইনানুগ অভিভাবক কর্তৃক তাহাদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য গঠিত ও পরিচালিত কোন সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান।’ এরূপ সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ এই তিন পদের কমপক্ষে দুটি পদে এবং সাধারণ পরিষদে ও নির্বাহী পরিষদে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ পদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বা উল্লেখিত অভিভাবকের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

 

গত শতাব্দীতে বিভিন্ন দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সাধারণত বড় বড় শহরে এসব সংগঠন গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে এ দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে জেলা ও উপজেলায় বেশ কিছু স্বাধীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় পর্যায়ে কিছুসংখ্যক মানুষ যখন নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থে বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য দল তৈরি করে, তা স্বসংগঠন হিসেবে পরিচিতি পায়। এই সংগঠন অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে কাজ করে এবং নিবন্ধিত হয় না। কখনো কখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য উভয় সংগঠনের সদস্য হতে দেখা যায়। যেমন একটি পরিবার যেখানে প্রতিবন্ধী ও সাধারণ উভয় ব্যক্তির উপস্থিতি থাকে। আমাদের দেশে দাতা সংস্থার অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এনজিওরা এই ধরনের স্বসংগঠনের গঠনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে এই সংগঠনগুলো বন্ধ হয়ে যায়। অনিবন্ধিত এইসব সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ বলেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত এনজিও নেতারা ডিপিও-এর বিরোধিতা করলেও স্বসংগঠনের পক্ষে কথা বলে। ভারতে স্বসংগঠনের আন্দোলন অনেক বেশি জোরদার। কখনো কখনো স্বসংগঠনসমূহ একত্র হয়ে প্রতিটি সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন গঠন করে।

 

এখানে উল্লেখ্য, সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনই আইনগতভাবে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান (এনজিও)। কিন্তু সকল বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানই (এনজিও) প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন নয়। অর্থাৎ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রকৃতি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। ইংরেজিতে এই সংগঠনকে বলা হয় ডিজঅ্যাবল্ড পিপলস অর্গানাইজেশন (ডিপিও)। এই সংগঠন প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে, সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি এবং সকল স্তরে সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে।

বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী সমাজসেবা অধিদফতর মূলত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর নিবন্ধন করে। যদিও গত দুই দশকে মহিলা অধিদফতরের আওতায় প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠনগুলো এবং যুব উন্নয়ন অধিদফতরের আওতায় প্রতিবন্ধী যুব সংগঠনগুলো নিবন্ধিত হচ্ছে। এ ছাড়া সমবায় অধিদফতর ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানির আওতায় অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন নিবন্ধিত হচ্ছে। আগামীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের আওতায় এই সংগঠনগুলো নিবন্ধিত হবে।

 

দাতা সংস্থার অর্থায়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন ও সংকটময় পরিস্থিতি

সারা বিশ্বে সত্তর দশক পর্যন্ত সব দেশে শুধু একধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে একত্র হয়ে সংগঠন গঠনের প্রবণতা দেখা যায়। যেমন শ্রবণ প্রতিবন্ধী বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন। কিন্তু ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশেষত উন্নত দেশে সিভিল রাইটস এবং সামাজিক মডেলে প্রতিবন্ধী মানুষের বিভিন্ন অধিকার আন্দোলন দেখা যায়। এই আন্দোলন করতে গিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের সমন্বয়ে আন্দোলন এবং এই ধরনের সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমন্বয়ে সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালে ডিজঅ্যাবল্ড পিপলস ইন্টারন্যাশনালের (ডিপিআই) আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে। ডিপিআই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমন্বিত আন্দোলনের (Cross Person with Disability Movement)যাত্রা শুরু করে। ফলে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ফলে বিশ্বে এই সকল সংগঠন সামাজিক মডেলভিত্তিক আন্দোলন আরও জোরদার করে। মেডিকেল মডেলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কার্যক্রম নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়।

 

দেশে আশি থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়নের নামে শুধু বৈদেশিক অর্থায়নে বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক এনজিওসমূহ (আইএনজিও) দেশে নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নের নতুন নতুন এনজিও সৃষ্টি করে এবং তার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থায়ন করে। দেশে দাতা সংস্থার অর্থায়নে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমন্বিত আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। দু-একটি এনজিও দেড় দশক ধরে দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমম্বয়ে সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। মূলত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ বা উদ্দেশ্য সামনে রেখে এ প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। কমিউনিটি বেইজড রিহ্যাবিলিটেশন (সিবিআর) কার্যক্রমের নামে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক স্বাস্থ্যসেবাকে পৌঁছে দিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূলত স্বল্প খরচে এই স্বাথ্যসেবার মার্কেটিং টুলস হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলোকে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়। এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রধান পুনর্বাসন হাসপাতালভিত্তিক এনজিও ২০০১ সাল থেকে সিবিআর কার্যক্রমের আওতায় বিগত দেড় দশকে ৯০টির বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন তৈরি করলেও আজ ১০টি সংগঠনও স্বীয় সামর্থ্যে চলতে পারছে না। কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে মূল সংস্থার বিরোধপূর্ণ অবস্থা লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে আইএনজিওদের অর্থায়নে তৃণমূলের প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কয়েকটি এনজিও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন গঠনের উদ্যোগ নেয়।

 

বিগত তিন দশকের দাতা সংস্থার কার্যক্রমকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সামগ্রিক অর্থায়নের বেশির ভাগ সুবিধা ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে অর্থ এনে সাধারণ মানুষের প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ কার্যক্রমে বড় আকারে অর্থ নিয়োগ করা হয়। গত এক দশকে তৃণমূলের প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত করতে গিয়ে এনজিও এবং আইএনজিওগুলো যথেচ্ছভাবে অর্থ খরচ করে। বিশেষ করে গত এক দশকে বৈদেশিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, আইএনজিও বা দু-একটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলো জেলা ও উপজেলা স্তরে দায়সারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন বা জন-ওকালতি দল বা স্বসহায়ক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু এই সংগঠনগুলোর স্থায়িত্বকরণের জন্য দিকনির্দেশনা, এমনকি স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সহায়তা বা অনুদান গ্রহণবিষয়ক কোনো নির্দেশনাও ছিল না। স্বাধীনভাবে এই সংগঠনগুলো যাতে অন্য দাতা সংস্থার কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করতে না পারে, সে জন্য এনজিও ব্যুরো নিবন্ধনের চেষ্টা করা হয়নি। এমনকি কোনো কোনো সংগঠন নিবন্ধন করার দেড় দশক পরেও একই অবস্থা বিরাজমান। ফলে দেখা যায়, দেশের প্রায় সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহের এনজিও ব্যুরোর নিবন্ধন নেই। দাতা সংস্থার প্রকল্প শেষ হওয়ার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। আবার দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কর্মরত এনজিওগুলো চায় না, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলো যথেষ্ট সক্ষমতা লাভ করুক। কারণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলোর এই সক্ষমতা অর্জন এনজিওগুলোকে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করে তুলবে।

 

একই ধারাবাহিকতায় গত এক দশকে দেশে একাধিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। এই সকল প্রচেষ্টায় মূলতই শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই সংগঠিত হয়ে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে সমর্থ হয়েছে। তবে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও এই কার্যক্রমের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে।

গত এক দশকে বিপিকেএস, এডিডি, সিআরপিসহ বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে গঠিত নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর এই অবস্থা বিরাজমান। এনজিওর অর্থায়ন ২০১১ সালের পর হ্রাস পেলে পাঁচ বছর ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তবে এই কথা স্বীকার করা প্রয়োজন, দাতা সংস্থার এই কার্যক্রমে তৃণমূল প্রতিবন্ধী মানুষের ঘর থেকে বের হয়ে নানা ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গতিশীলতা পেয়েছে (মোবিলাইজেশন) এবং তারা সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টা নিয়েছে।

 

বৈদেশিক দাতা সংস্থা আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে এনজিও সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন কার্যক্রমে যাত্রা করে। মূলত গত দেড় দশকে বিশেষ শিক্ষা পরিবর্তে নানা ধরনের উন্নয়ন ও অধিকারভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থায়ন করে তারা। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেডিকেল মডেলের পাশাপাশি সার্ভিস ডেলিভারি মডেলে পরিবর্তে অধিকারভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। মূলত সিআরপিডি বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে গত ছয়-সাত বছরে এ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। যদিও একই সময়ে এনজিও মডেলের উন্নয়নের যৌক্তিকতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন পরিচালনাকারী মহলে। এনজিও মডেল উন্নয়নের অর্থায়ন থমকে দাঁড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত না হলেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে নেদারল্যান্ডস তার বৈদেশিক অনুদানের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় করে এসেছে এনজিওগুলোর জন্য, যা আগামী বছর থেকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্বান্ত নিয়েছে কয়েক বছর আগে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হতে যাচ্ছে। ফলে আগামীতে এনজিও অর্থায়নে অগ্রাধিকারে বাংলাদেশ নেই। দাতা সংস্থার প্রকল্প অর্থায়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত নেতৃত্বস্থানীয় এনজিওগুলো বড় ধরনের অর্থ সংকটে পড়তে যাচ্ছে। ফলে গত দুই দশকের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে এনজিও সেক্টরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন বা তাদের নেটওয়ার্ক নিজেদের যথাযথ কৌশল নির্ধারণ করে বৈদেশিক দাতানির্ভরতা বাদ দিয়ে অধিকার আন্দোলনকে বেগবান করতে পারবে কি না, তা-ই আগামীর প্রশ্ন।

 

স্থানীয় অনুদান সংগ্রহে সংকট

সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের অনুদান, স্থানীয় সম্পদ, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা বা যুব উন্নয়ন বা মহিলা অধিদফতর বা জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অনুদানসহ বিভিন্ন সহায়তা নিয়ে এই সংগঠনগুলো পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের এই স্বাধীন সংগঠনগুলোর খোঁজখবর কেউ রাখে না। বর্তমানে তারা স্থানীয় অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে সংগঠনগুলোকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

 

দেশে মহিলা অধিদফতরের আওতায় নিবন্ধিত নারী সংগঠনগুলোর আর্থিক সহায়তা প্রদান করে মহিলা অধিদফতর। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলোর আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ সরকারি সংস্থা কোনটি, তা আজ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কর্মরত এনজিওগুলোও কোনো ভূমিকা রাখেনি। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এক যুগ ধরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কর্মরত এনজিওগুলোকে অনুদান করলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলোর অনুদান প্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে আজ পর্যন্ত কোনো ভূমিকা রাখেনি। যদিও এই ফাউন্ডেশন গঠিত হয় প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের সংগঠন সহায়তার জন্য। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত এনজিও নেতারাই ফাউন্ডেশন ব্যবস্থাপনা বোর্ডের বেসরকারি সদস্য। তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলো অনুদান প্রাপ্তি। ২০১৫ সালে ফাউন্ডেশন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কর্মরত এনজিওগুলোকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেছে। অথচ বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের নিয়মানুযায়ী সব কাগজপত্রসহ প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকার পরেও তারা এই উন্নয়ন অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফাউন্ডেশন ৪৮০টি বেসরকারি সংস্থার মধ্যে ২০টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনকে অনুদান প্রদান করে। অথচ এটা খুবই যৌক্তিক দাবি ছিল, এই ফাউন্ডেশনের অনুদান প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও গ্রহণ করতে পারবে না। এমনকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ফাউন্ডেশন আজ পর্যন্ত সারা দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন সংগঠনের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এবং সিআরপিডি নির্দেশনা অনুযায়ী ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতি অগ্রাধিকার নেই।

 

সংগঠনকেন্দ্রিক প্রবণতা

আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, বৈষম্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে সমাজে সকল স্তরে তাদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করার জন্য তাদের সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তবে বৈষম্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিবন্ধী জনগণকে সংগঠিত করা সবচেয়ে কঠিন। কারণ তারা যেমন কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় থাকে না, বরং সাধারণ পরিবারগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বড় হয়। একজন অন্যজনকে চেনে না। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে ধরনের ভিন্নতা থাকায় তাদের বিশেষ চাহিদাও হয় ভিন্ন। ফলে গোষ্ঠী প্রবণতার পরিবর্তে বর্গ প্রবণতা গড়ে তুলতে সামাজিকসহ নানা প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে হয়।

 

সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত দেশব্যাপী প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময়ে বেসরকারি সে¦চ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তা নিতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে এসব সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণও লক্ষ করা যায়। কারণ, এই সংগঠনগুলো স্থানীয় এবং সমাজভিত্তিক সংগঠন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিবন্ধী মানুষের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে। প্রতিবন্ধী জনগণকে নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজসেবা কর্মকর্তাদের মধ্যে এসব সংগঠনের ব্যাপারে একধরনের স্বীকৃতি ঘটছে। যদিও সমাজসেবা অধিদফতরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বা সরকারের কাছে এ ধরনের সংগঠনের উল্লেখযোগ্য কোনো স¦ীকৃতি নেই। নিবন্ধিত এসব সংগঠনের ব্যাপারে এখনো সমাজসেবা অধিদফতর নেতিবাচক মানসিকতা ও উদাসীনতা পোষণ করে। কারণ এসব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কম শিক্ষিত ও সমাজে উচ্চবিত্ত শ্রেণির নয়।

 

শুধু প্রতিবন্ধী জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনই নয়, বৈষম্যপীড়িত জনগোষ্ঠী যেমন আদিবাসী, দলিত, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, জেলে, চা-শ্রমিক বা প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ নারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা সরকারি স্বীকৃতির অভাব রয়েছে। যদিও বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে নারী সংগঠনগুলোকে উৎসাহিত বা স্বীকৃতি প্রদান করতে মহিলা অধিদফতর বা জাতীয় মহিলা সংস্থা বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এসব সংগঠনের বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা নেই।

একই ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধারণত একমুখী থাকে। সমাজে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা কম। আবার একই ধরনের প্রতিবন্ধিতার মধ্যে মাত্রাগত ভিন্নতা থাকায় বিশেষ চাহিদাও ভিন্ন হয়। যেমন সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক বা সম্পূর্ণ শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বাংলা ইশারা ভাষার প্রসার মুখ্য দাবি। কিন্তু স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ বা স্বল্প শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একই দাবি তাদের কাছে কোনো আবেদন রাখে না। ফলে সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

 

এসব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একই ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠনগুলোর অনেকেই তাদের পুরোনো অবস্থান পরিবর্তন করছে। ভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষদের নতুন সদস্য করছে বা সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনসমূহ অধিক সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ চাহিদার স্বীকৃতি রাষ্ট্রে অন্য ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ চাহিদার স্বীকৃতি পেতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

আবার কিছু প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নেতৃত্বদানকারী দু-একজন ব্যক্তি অত্যধিক দায়িত্ব নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করে এবং তাদের সদস্যদের তুলনায় অভিজ্ঞতা অনেক বেশি হয়ে থাকে। এই সংগঠনগুলো পরিচালনায় গণতান্ত্রিক উপায়ে বা সবার মতামতকে বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। এসব সংগঠনের সাধারণত বেতনভোগী কর্মকর্তা থাকেন না। উদ্যোগী ব্যক্তিরা দীর্ঘকাল ধরে নেতা থাকেন। তারা সংগঠনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন। তা ছাড়া মূলত সংগঠনের সুফল কিছুসংখ্যক ব্যক্তি ভোগ করেন। এসব কারণে অনেক সংগঠনই সফলতা অর্জন করতে পারে না। আবার এসব সংগঠনের নারী সদস্যের সংখ্যা সবচেয়ে কম, দু-একজন নারী সদস্য দেখা যায়। সাধারণত নারী সদস্যগণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংগঠনে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চর্চা নেই। তাদের কথা তেমন গুরুত্ব পায় না এবং তারা যেসব বিষয় আলোচনার জন্য স্থির করেন, তা আলোচিত হয় না। সদস্যদের মধ্যে সহজে পরস্পরের প্রতি সংহতি বা অংশীদারি মনোভাব গড়ে ওঠে না। বিভিন্ন সমস্যার কারণে দলের সভা নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তবে অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এনজিওর তুলনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের সব সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে সদস্যদের তুলনামূলক বেশি অংশগ্রহণ থাকে। এমনকি সংগঠনের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে স¦ত্বাধিকার বোধ অনেক সুস্পষ্ট থাকে।

 

তবে সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোতে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। সাধারণত এসব সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকার পাশাপাশি সক্ষমতার তারতম্য থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বাধার সম্মুখীন হন, সদস্য হিসেবে তার অগ্রাধিকার প্রদানে তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে অসমতার উদ্ভব প্রতিরোধে পিছিয়ে পড়া সদস্যদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সংগঠনের সব সদস্যকে সক্রিয় ও ক্ষমতায়িত হতে হবে। সংগঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এলাকার প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা। এলাকার প্রতিবন্ধী মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যা ও তার সমাধানের বিষয় সংগঠনের সভার আলোচনায় উত্থাপন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের সব সদস্যের সক্রিয় ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করতে সংগঠন পরিচালনায় দক্ষ ও যৌথ নেতৃত্বের প্রতি উৎসাহ দান, সংগঠনের প্রতি স¦ত্বাধিকার বোধ ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য সবার মধ্যে কাজ বণ্টন ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। সংগঠনের সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিশেষত গুরুতর প্রতিবন্ধী মানুষ এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থার প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সামাজিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন বাধার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সবার মতো সামাজিক প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে অন্যরা তার ওপর নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সংগঠনগুলো কার্যকরভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ে সরকারি নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাবিতকরণ এবং সম্পদের সমবণ্টনে জন-ওকালতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সংগঠনগুলোর অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।

আমরা দেখতে চাই, প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হোক।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আন্দোলন ও পিছু হটা

স্বাধীনতার পর থেকে নারী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সরকার ও নীতিনির্ধারক মহলে নারী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে আশির দশকে দেশে বৈদেশিক অর্থায়নে এনজিও কার্যক্রম চালু হওয়ার পরেও নারী সংগঠনগুলোর নারীবিষয়ক সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারছে তাদের জোরালো ও সোচ্চার অবস্থানের কারণে। কিন্তু ষাটের দশকে গঠিত রাষ্ট্রীয় অনুদানে পরিচালিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলো পরবর্তী তিন দশকে সরকারের কাছ থেকে নিজেদের জন্য সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। যদিও তারা প্রতিবন্ধী জনগনের উন্নয়নে যথাযথ দাবি উত্থাপন ও আদায় করতে পারেনি।

 

আশির দশক শেষে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সরকারি চাকরি কোটা সংরক্ষণের দাবিতে অধিকারভিত্তিক আন্দোলন শুরু করে। এই সফল আন্দোলনে কোনো সংগঠন বা এনজিওর কোনো ভূমিকা ছিল না। এই আন্দোলনের মুখ্য নেতৃত্ব দান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। তারা এই আন্দোলনের জন্য ‘দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী অধিকার আদায় পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। মূলত এই আন্দোলনের কারণে ১৯৮৯ সালে সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও এতিমদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা আরোপ করার পরিপত্র জারি করা হয়। তবে এই আন্দোলন সফল হলে এই সংগঠনের নেতাদের আর্থিক সুবিধা ও সরকারি চাকরি প্রদান করে, নেতাদের কেনাবেচা করা হয়। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক আন্দোলন। এই সময়ে বেশ কয়েকজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে মূলধারার ছাত্ররাজনীতিতে সম্মানজনক ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। তবে এরপর থেকে প্রতিবন্ধী জনগণকে আজ পর্যন্ত অধিকার আদায়ে তেমন কোনো সক্রিয় আন্দোলন করতে দেখা যায়নি। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যন্ত মেয়ে শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পায়, অথচ সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এখনো তা ভোগ করতে পারে না। এই দাবি আদায়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতে আগ্রহী নয় বরং দয়া-দাক্ষিণ্যের অনুদান পেতে আগ্রহী।

 

প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়ন আটকে গেছে চোরাবালিতে

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতি এনজিওদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্বারা কাজ করার চেয়ে তাদের জন্য কাজ করা নানা দিক থেকে সুবিধাজনক। ফলে এনজিও কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সমাজে বা রাষ্ট্রে অবদানকারী হিসেবে আবির্ভূত না হয়ে, শুধু সেবাগ্রহীতা হয়ে থেকে যায়। আবার এনজিও কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে না। এনজিওগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়নে আকাক্সক্ষী নয়। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষমতায়নের বিষয় তাদের কোনো কার্যক্রমে পরিলক্ষিত হয় না। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত এনজিওগুলোর কার্যক্রমের সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ সুবিধাভোগী সাধারণ ব্যক্তিরা। সিআরপিডি কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে তাদের দ্বারা গঠিত সংগঠনগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝে ওই সব এনজিও প্রকল্প প্রাপ্তির জন্য দাতা সংস্থায় দেওয়া প্রস্তাবগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে উল্লেখ করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়নকারী সহযোগী হিসেবে তাদেরকে শরিক করে না। দাতাদের বাধ্যবাধকতা ছাড়া তারা এদিকে যেমন স¦ীকৃতি দেয় না, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যও কোনো উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করে না। এমনকি অনানুষ্ঠানিক ও অনিবন্ধিত স¦সহায়ক সংগঠনকে তারা মৌখিকভাবে উৎসাহিত করলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের অগ্রযাত্রায় নির্লিপ্ত থাকে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নেটওয়ার্ক গঠনে তারা তীব্র বিরোধিতা করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের কিছু সচেতন নেতার অনেকেই বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝলেও ব্যক্তিগত বা সংগঠনের সাময়িক লাভের আশায় নীরব থেকে যান। এনজিও প্রতিনিধিরা কোনোভাবে প্রতিবন্ধী জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নয়। ফলে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে স¦ীকৃতি অগ্রাধিকার রয়েছে।

 

১৯৯৭ সালে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত এনজিওগুলোর নেটওয়ার্ক জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম সরকারের কাছে প্রতিবন্ধী জনগণের উন্নয়নে কিছু প্রস্তাব উত্থাপন এবং তা জন-ওকালতির মাধ্যমে আদায় করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ২০০৫ সালে গঠিত বিপিকেএসের ওপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহের নেটওয়ার্ক ন্যাডপো এবং এডিডির ওপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহের নেটওয়ার্ক এনজিডিও যথাযথ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব এবং ক্ষমতায়নের বিষয়ে এই দুই নেটওয়ার্ক কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি। যেমন গত এক দশকে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন, ২০০১-এর অধীনে ৬৪ জেলা প্রতিবন্ধী কল্যাণ কমিটিতে নামমাত্র দু-একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বেসরকারি প্রতিনিধি হতে পেরেছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম কখনো তার সদস্যদের বাইরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধি ও ক্ষমতায়ন নিয়ে দাবি উত্থাপনে রাজি নয়। আবার স¦াধীন ও লোকজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন নিয়ে ২০১৪ সালের গড়ে ওঠা নবীন নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এখনো সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয়।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২ এপ্রিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়ন অধিদফতর উদ্বোধন করলেও আজ পর্যন্ত তা চালু হয়নি। এ ব্যাপারে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের বোর্ডের বেসরকারি সদস্য জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত নেতৃত্বদানকারী এনজিওগুলো স্বার্থগত কারণে বিরোধিতা করে আসছে। অথচ এই অধিদফতর চালুর ব্যাপারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তাদের সংগঠনের জোরদার ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

বিশ্বে সব দেশে সিআরপিডি পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের সহায়তায় বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেই। অথচ ব্র্যাক নারী উন্নয়নে হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ প্রণয়নে ভূমিকা থাকে নারী সংগঠনগুলোর। সিআরপিডি পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রণয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

 

শেষ কথা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস দিকে তাকালে সহজে বোঝা যায়, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রমের তারতম্য রয়েছে। দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১১ ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। এদের মধ্যে যৌথবদ্ধতা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। স্বার্থগত দ্বন্দ্বে তারা বহুধাবিভক্ত। প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষেরা। অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষ বা সমাজে এখনো তাদের প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি নেই।

সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়ে তাদের নিয়ে কোনো কার্যক্রম নেই। সর্ম্প্রতি নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী মানুষদের উন্নয়নে নতুন কিছু উদ্যোগ বা কার্যক্রম চোখে পড়লেও বহুমুখী এবং শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কোনো কার্যক্রম নেই। সরকার, এনজিও ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহ হতে এসব প্রান্তিক প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে খুব একটা আলোচনা দেখা যায় না। দেরিতে হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষেরা এগিয়ে আসছে। তবে গুরুতর মাত্রার তুলনায় মৃদু বা মাঝারি মাত্রার সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষেরাই বেশির ভাগ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। অন্যদিকে বেশি বয়সে প্রতিবন্ধিতা বরণকারী মানুষের অন্যদের তুলনায় অধিকতর সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে।

 

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে গত দেড় দশকে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এনজিওরা বা এর নেটওয়ার্ক যেভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহ বা তাদের বিদ্যমান নেটওয়ার্ক সেই ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি ২০১০ সাল থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের এই নেটওয়ার্কের গ্রহণযোগ্যতা নানা কারণেই প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। তাই এটা নিঃশঙ্কচিত্তে বলা যায়, বাংলাদেশে নারী আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীরা যে সংকটে পড়েনি, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এখনো ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারেনি। তাই প্রতিবন্ধী মানুষেরা স¦াধীন ও স্থানীয় উদ্যোগের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন এবং তাদের নতুন নেটওয়ার্ক কার্যকর ভূমিকা রাখার মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ পেতে পারে। তবে এটা মনে রাখা প্রয়োজন, এই উত্তরণের জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন বা নেটওয়ার্ককে একদিকে যেমন যথেষ্ট পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী জনগণের সঙ্গে অধিকতর সম্পৃক্ততা গড়ে তুলতে হবে। এটাই খুব স্বাভাবিক যে, এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে বর্তমান এনজিও নেতৃত্ব বিরোধিতা করবে। অন্যদিকে সিআরপিডি কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও সরকার এই ধরনের উদ্যোগগুলোকে প্রতিনিয়তই উৎসাহিত করবে।

 

রফিক জামান,

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার আন্দোলনের কর্মী ও গবেষক