শহরের কারও স্বপ্ন নেই

25

আনোয়ার প্রধান

 

রোজ রোজ, ন্যূনতম ব্যত্যয় না ঘটিয়ে শার্টের কলার দুটো কামানের মতো তাক করে থাকে বুট জোড়ার দিকে। প্রতিদিন অবচেতনে প্রথমেই লক্ষ্য করে এই কলার আর বুট। যখন সে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়, তার আশ্রয় থেকে; হ্যাঁ, তার একটি আশ্রয় আছে, আর তা আশ্রয় বৈ অন্য কোনো অভিধা নিতে অপারগ বা অভিধা দেওয়ার সুযোগ নেই, বা কেউ দিতে চায়ও না। পুরো পৃথিবী তার বিরুদ্ধ পক্ষ নিয়ে ভ্রু কুঁচকানো প্রশ্নবোধক চাউনি দিয়ে স্বাগত জানায়। কী তার প্রয়োজন, কী ভূমিকা এ পৃথিবীকে ঘিরে; কী নিজের বা পৃথিবীর প্রয়োজন উপযোগিতায় বা অংশগ্রহণের প্রয়োজন উপলক্ষে?

 

নিঃসন্দেহে এসব উত্তরহীন প্রশ্ন তার আছে। তবু এটা জেনেও তার হাত দুটো নাইটিঙ্গেলের ডানার রূপ নেয়, আর সে ভাসে মেঘের ভেলায়। যা তার স্বপ্ন দিয়ে তৈরি আর স্বপ্নেরই শব্দচিহ্ন দিয়ে আঁকা রেখাবিহীন সীমান্ত।

‘খুবই সহজ পরিহাস করা, আমার কিন্তু কিছু স্বপ্ন আছে’ এই তার একমাত্র উক্তি দিনমানের, আর একমাত্র অস্ত্র তূণের। সে দেখে, তার কলার কামানের ভূমিকা নিয়েছে কিনা বুটের ওপর। আর তখনই, তার তূণের একমাত্র অস্ত্রটা নিয়ে সে সুখী হয়। প্রয়োগ করে, প্রত্যাঘাতের ন্যূনতম মনোবিকারে আশ্রয় নেয় না। একমাত্র উক্তি আর তূণের অস্ত্রটি সে ছোড়ে শুধু আত্মরক্ষার্থে। আর তার অস্ত্রটা শুধু তার শারীরবৃত্তের ভেতর বাহ্যিক আশ্রয়ে আশ্রিত হৃদয় দুর্গের মাঝে সীমাবদ্ধ। অসহিষ্ণু বিরাট পৃথিবীর প্রশ্নবোধক ভ্রু কুঁচকানো সরব তীরগুলোর বিরুদ্ধে সে প্রতিরোধ দেয়াল তৈরি করে, আত্মরক্ষার্থে। প্রয়োগের সময় তার একমাত্র অস্ত্রটা প্রকাশ্য শাব্দিক তীরের ভূমিকা নেয় না, বিশাল পৃথিবীর ভ্রু কুঁচকানো প্রশ্নবোধক তীরগুলোর ওপর প্রত্যাঘাত মুহূর্তে। নীরব আর মননশক্তির মাঝে যা সীমাবদ্ধ। সীমাবদ্ধ তার হৃদয় দুর্গের মাঝে, যেখানে সে ভ্রু কুঁচকানো তীরগুলোকে প্রবেশ করতে দেয় না। তা সত্ত্বেও সে সফল হয় কদাচিৎ। হৃদয় গভীরে প্রবেশ করে অযাচিত তীব্র আঘাত হানে তীরগুলো; যা তার কাছে বর্ণনাতীত এবং অব্যক্ত। তবু সে শিস দেয়, সুর করে স্বরচিত কলি ভাঁজে, আর একটি শিম্পাঞ্জির মতো নৃত্যের তালে অনুসরণ করে সে ছিন্ন পলিথিন, আবার ফেরার পথে নুড়ি পাথর। প্রায় অধিকাংশ দিন শহরের ধুলোমলিন পথ তার অপেক্ষায় থাকে, এবং নুড়ি পাথর-পলিথিন তার সাথী হয় ফিরতি-চলতি পথে। আর শহরবাসীর কাছে তার স্বপ্নদের শরীরী রূপে পরিচয় করিয়ে দেয়।

 

সে তখন স্পষ্ট দেখে তার স্বপ্নগুলোর শরীরী পূর্ণতা। শহরবাসীকেও দ্বন্দ্বে ফেলে। তাকে কেউ ভাবে পাগল, কেউবা সমর্থন করে। যদিও অধিকাংশই বিশাল পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভ্রু কুঁচকানো প্রশ্নের অভিব্যক্তি ছুড়ে দেয়। তারপরও কিছু শহরবাসী তার কাছে বয়ান করে তাদের স্বপ্ন। তারই মতো শরীরী পূর্ণতায় দেখতে ভালোবাসে তাদের স্বপ্নগুলো। একসময়, শহরবাসীর কারও স্বপ্ন সত্যি শরীরী অবয়বে পূর্ণতা নিয়ে সহচর হয়। স্বপ্নবাজ তরুণের সঙ্গে বিনিময় করতে ভোলে না ওরা। কিন্তু তার স্বপ্নরা একই নিত্যকার ভঙ্গিমায় কল্পরাজ্যে উড়ে বেড়ায়। ব্যর্থ দানের পত্রবিহীন বিশীর্ণ গাছের ডগায় তার স্বপ্ন মেঘেরা আটকে যায়। আর বাস্তব পৃথিবীতে অর্থবহ অংশীদারিত্বে তার স্বপ্নরা ঘুমন্ত শিশু হয়েই থাকে। একসময় শার্টের কলারের নিশান সে ঘুরিয়ে দেয়, ছেঁড়া পলিথিনের স্বপ্নচারী উড্ডীন অনুসরণ করা ত্যাগ করে। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য মাত্র। আবার শুরু করে অবচেতনে, ফিরতি পথে, নুড়ি পাথরের সঙ্গে। সেখান থেকে সচেতনে ফিরে আসে; স্বপ্নগুলোর বাস্তব অর্থবহ পূর্ণতার উপযোগ সাজাতে সরব হয়ে ওঠে আবার। যদিও আবারও একই স্বপ্নভঙ্গ আর হতাশার মঞ্চাভিনয় পুনর্মঞ্চস্থ হয়। তবু তার স্বপ্নগুলো পূর্ণতার পথে আংশিক পথ পরিক্রমণ করে নিতে পারে। তবে বড্ড দেরি হয়ে যায়।

 

সে স্বপ্নবাজ তরুণ, নিজের জীবনের কোনো অর্থ যে খুঁজে পায় না। যখন সে সচেতন; তাঁর সবকিছু অনুপুঙ্খভাবে বিচার করে। আদপে সেখানে কিছুই নেই তেমন, যেমনটা সে ভাবে; হয়তোবা থাকতে পারে, কিন্তু তা সে খুঁজে পায় না। কিন্তু অবচেতনে, তাঁর স্বপ্নরা নাইটিঙ্গেল পাখির মতো গান গায় আর শিম্পাঞ্জির মতো নৃত্যে মেতে থাকে। দৃষ্টিতে-মননে, শয়নে-বিয়নে, চারপাশে সবকিছুতে। আর অবচেতন দিবা স্বপ্নরাজ্যে কাটায় সে দিনমান। কখনো কারণ ছাড়াই আনন্দবোধে মাতোয়ারা নতুবা একরাশ দুঃখের পাহাড়ে। তবে এর উপলক্ষ্য এলেও তার প্রতিক্রিয়া হয় সম্পূর্ণ বিপরীত! স্বপ্নসিঁড়ির ধাপ সে ডিঙায় একটির পর একটি। ভাবে, এক নির্দিষ্ট সময়ে স্বপ্নের পূর্ণতার উষ্ণ মদিরতায় পূর্ণায়ত রূপ নেবে সে। কিন্তু তা জন্ম বা তৈরি হতে সময় নেয় সেকেন্ডেরও একটি ছোট অংশ। এর দমন বা নিয়ন্ত্রণে সে অক্ষম।

 

স্বপ্নই তার বাঁচার প্রেরণা। যা এভাবেই জন্ম নিতে থাকে, নিতেই থাকে; কখনো হতোদ্যম বা আশাহত হয়ে পড়ে স্বপ্নের অপূর্ণতার ভারে। স্বপ্নরা ভাঙে, তবে তা শুধু সময়ের নির্দিষ্টতায় অপূর্ণ হয়ে; পুরোপুরি বিলুপ্তির ভাঙনে স্বপ্নগুলো নিঃশেষ হয় না কখনো। কার্যত তা অসম্ভব, আর তা হলে তার কাছে ভালো হয়েই আসত। শহরের ধুলোমলিন রাস্তায়, ঘূর্ণায়মান ছেঁড়া পলিথিন সে অনুসরণ করে নীরবে, সচেতন স্বপ্নাহত মন আর আধো অবচেতন স্বপ্নে। হাত দুটো থাকে পকেটে। পলিথিনটা লাফায়, ওড়াউড়ির উড়–ক্কু নৃত্য বাতাসের বদান্যতায়। এই নৃত্যমুদ্রা যেন তারই স্বপ্নের মতো অবাধ্য এক প্রতিরূপ। পলিথিন ইট-সুরকির উঁচু-নিচু পাহাড়সদৃশ ভবনগুলো পাড়ি দেয় কোনো রকম উপলব্ধিবোধ ছাড়া। বিচ্ছিন্নতাবোধের যে আবিষ্টতা পলিথিনকে চালিত করে, সেটা তরুণের ভালো লাগে। এই আবিষ্টতার স্বাদ তার সামাজিক আপাতপৃথকতার সঙ্গে মিশে গিয়ে সুখী করে তোলে! অন্য রকম সুখী। যদিও সামাজিকতা তার আছে, বেশ ভালো রকমেরই। যদিও সেটার সপক্ষে সামাজিক সম্পৃক্ততার পূর্ণতা ঘোষণা দেওয়ার মতো জোর পাওয়া যায় না। বিশাল পৃথিবীর প্রশ্নবোধক ভ্রু কুঁচকানো যেখানে নবমাত্রা যোগ করে। যখন স্বপ্নপূরণের নির্দিষ্ট সময় বহু পূর্বেই হারিয়ে যায়, সূর্যঘড়ির সঙ্গে আপাতসন্ধি করে; আর তার সঙ্গে করে প্রতারণা। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তরুণ; নব স্বপ্নের দ্বার উন্মোচিত হতে দেবে না সে; তার অবাধ্য মননচক্ষে। পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করে অপূর্ণ স্বপ্নরা, কিন্তু স্বপ্ন জন্ম নেওয়ার সেকেন্ডগুলো অবিরত গতি নিয়ে ভাবীকালের ধারাস্রোত অব্যাহত রেখে চলে। স্বপ্নপাহাড় আরও বিস্তৃত উঁচু হতেই থাকে। তরুণের অবিন্যস্ত-অসংলগ্ন পা জোড়া ছেঁড়া পলিথিনের টুকরো অনুসরণ করে যায়। নীরব স্বপ্নজড়িমা অনুসরণ করে। একসময়, পলিথিনটা কোনো অস্পর্শ আর অদৃশ্য পাহাড়সদৃশ ভবনের কোলে অনাহূত আশ্রয় খুঁজে নেয়, দৃষ্টি নাগালের বাইরে চলে যায় তা। হারিয়ে যায় পুরোপুরি। ইতিমধ্যে সে বহুদূর চলে এসেছে, শূন্য আর ভূমিতে খেলারত তুরীয় ভাসমান পলিথিনের সঙ্গে। স্বপ্নচারী হয়ে থাকে সে এতক্ষণ। ছেঁড়া পলিথিনের প্রতিটি প্রান্ত-কোণের নৃত্যের মুদ্রাগুলোর সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করে চলে তার একেকটি স্বপ্নের ভিত্তিভূমি। সে আশা করে, পলিথিনটা যেখানে ভূমি স্পর্শ করবে, সেখানেই হবে তার স্বপ্নপূরণের পাদপীঠ, দিক-নির্দেশসংবলিত রূপরেখা; যা অনুসরণে সাফল্যের সোনালি সকাল প্রভাত সূর্যের মদির আলোয় সম্ভাষিত করবে। সে গুছিয়ে আনে, তার স্বপ্নদের পূর্ণতার পথ-নির্দেশ, পলিথিনটার উড়–-ভাসমান সময়টুকুতে।

 

কিন্তু হারিয়ে যাওয়া পলিথিনটার সঙ্গে যেন সবকিছুই হারিয়ে যায়। সবকিছু শূন্য ছায়া আর প্রলম্বিত শুষ্ক তৃষিত শূন্য বাগান। কিন্তু আবার ফিরতি পথে, নুড়ি পাথর আর পায়ের সম্মিলিত নৃত্যে সে খুঁজে পায় স্বপ্ন-নির্দেশের হারানো সূত্র। একসময়, কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়, কিন্তু সেটা নির্দিষ্ট সময়কে ছেড়ে আসে দূর অপসৃয়মাণ দিগন্তে। আবার অগ্রসর হওয়া, শহরবাসীর সঙ্গে স্বপ্নভাগ এবং শহরবাসীর স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করা এবং শহরবাসীর স্বপ্নপূরণ, অধিকাংশ শহরবাসীর প্রশ্নবোধক ভ্রু কুঁচকানো দৃষ্টি, আর নিজের স্বপ্নগুলোর বিলম্বিত মন্থর গতি। তবু স্বপ্নের পথে হাঁটা নিরন্তর। সে লক্ষ করে, চেহারায় বয়সের ছাপ, আর সময়ের অযাচিত মারের অক্ষয় কারুকাজে ভগ্নাহত জীবনের মুদ্রাগুলো ম্রিয়মাণ বিবর্ণ। কখনো ব্যথার দানে চাগিয়ে ওঠে সে। তবু নাইটিঙ্গেল পাখির কণ্ঠ ধারণ করে শিম্পাঞ্জির পা জোড়ায় নৃত্য করে। বিশাল পৃথিবীর ভ্রু কুঁচকানো প্রশ্ন-জালের ভেতরই নিজের জায়গা করে নেওয়ার দুরন্ত-দুর্বার সাহস, অস্থির ভুবন আর প্রেরণাকে গ্রাস করে নিঃশেষ করার অন্তহীন ধারাবাহিক আগ্রাসন সত্ত্বেও তার নিরন্তর ঘোর লাগা অসংলগ্ন পদচারণ। কারণ, স্বপ্ন অমরত্বে বিশ্বাসী!…

 

২.

‘স্বপ্ন অমরত্বে বিশ্বাসী!’ স্বপ্ন অমর! প্রায় চিৎকার করে উঠে আমি বইটির এই বাক্য স্বগতোক্তি করি। এবং বইটি শূন্য সিলিংয়ের দিকে ছুড়ে দিয়ে বিছানা থেকে গড়িয়ে পড়ে যাই মেঝেয়। নিশ্চিত করে জানি, আমার চিৎকার রাত্রির সূচিভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে মহাশূন্যে প্রতিধ্বনির ঢেউ তুলতে পেরেছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়ে দেখি আমার পা জোড়া কাঁপছে; কথা বলতে চাই, কিন্তু অব্যাখ্যাত ব্যাকুল অব্যক্ত স্রোতে গলা আটকে আছে। আমার পা আর কণ্ঠ কি শিম্পাঞ্জি আর স্বপ্নচারী নাইটিঙ্গেলের রূপ নিতে যাচ্ছে বা নিয়ে নিয়েছে?! আপাতঝড়ে চঞ্চল স্নায়ুরা এই প্রশ্ন তৈরি করে আমার কাছে জবাবের অপেক্ষা করে আছে সাহস করে! বলা প্রায় নি®প্রয়োজন যে, সদ্যই অনুবাদ বইটির মূল চরিত্র সেই স্বপ্নবাজ তরুণের সঙ্গে আমার কমবেশি মিল-অমিলের ন্যূনতম প্রশ্ন না এসে শতভাগ মিলের রায় আসবে!

 

শারীরিক প্রতিবন্ধিতার যে সীমাবদ্ধতা বিশাল পৃথিবীর সঙ্গে সন্ধি করে ভ্রু কুঁচকানো প্রশ্ন-তীরে আমাকে ব্যথাকাতরতা উপহার দিয়ে যাচ্ছে অহর্নিশ, তা ব্যাখ্যাতীত। এ সবই বইয়ের স্বপ্নবাজ তরুণটির হুবহু প্রতিরূপ! তরুণটির আশা, আকাংক্ষা, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার প্রেরণা সবকিছুই! নিশ্চিতের ঘোর জাগে, ভিনদেশি লেখক আমাকে ভেবেই বুঝি এই বই লিখে ফেলেছেন কি না?! ‘স্বপ্ন অমরত্বে বিশ্বাসী’ ‘খুবই সহজ পরিহাস করা, আমার কিন্তু কিছু স্বপ্ন আছে’ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বকে নতুন চোখে দেখে স্বগতোক্তি করি আবার।

‘শহরের কারও স্বপ্ন নেই!’ নিশ্চিতভাবে সমস্ত মনোবল আর আশা-স্বপ্নকে হতোদ্যম-পিষ্ট করে দেবার মতো যথেষ্ট একটি ছোট বাক্য। এবং সেটাই ঘটে গেল তখন আমার মাঝে। বইটির শেষের দুই সাদা পৃষ্ঠার প্রথম পাতায় জ্বলজ্বলে বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টি হেনে তাকিয়ে রয়েছে যেন আমার দিকে।

 

শূন্য থেকে পড়ে, অবিন্যস্ত আহত ভঙ্গিমার দৃষ্টি ঝকঝকে সাদা পাতার গুটি গুটি কালো হরফে লেখা ওই দুজোড়া শব্দের দিকে। ইতোমধ্যে যেন একটি প্রচন্ড শক্তিশালী লড়াইয়ে একতরফাভাবে হারিয়ে দিয়েছে আমার সমস্ত মনোবল ও নবপ্রেরণা। যা আমি লাভ করেছি এই বইয়েরই স্বপ্নবাজ প্রতিবন্ধী তরুণের থেকে। নিশ্চল স্থাণুর মতো কিছুক্ষণ মৃতবৎ দাঁড়িয়ে থেকে বইটি হাতে নিই। পরের পাতায় বইয়ের পুরাতন ক্রেতার ঠিকানা লেখা। ঠান্ডা হিমস্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাবার মতো অনুভূতিতে আচ্ছন্ন থেকে আবিষ্কার করি, পাশের গলিতেই এই ঠিকানার উৎস! নিশ্চিত হই যে, ‘শহরের কারও স্বপ্ন নেই’ আর ঠিকানা একই হাতের লেখা। এবং বইটি হয়তো ব্যক্তিটির হাতছাড়া হয়ে থাকবে; কারণ আমি বইটির নব্য ক্রেতা, যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে গতকালই সংগ্রহ করেছি ফুটপাত থেকে।

 

৩.

বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন ভেতর থেকে গম্ভীর গলা ভেসে আসে।

‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ’ দরজায় এটা বিজ্ঞপ্তি আকারে লেখা। তবু আমি দরজায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করে ছিলাম। অগত্যা প্রবেশ করতে হলো। শীর্ণকায় এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে আছেন একটি আরামকেদারায়। তিনিও কিছুটা শারীরিক প্রতিবন্ধিতায় ভুক্তভোগী আমার মতো। বিশেষ করে বললে, বইয়ের তরুণের মতো। অবশ্য এটা তিনি না বললে আমি বুঝতাম না। কারণ, আমার প্রতিবন্ধিতা জেনে তিনি ‘উত্তম বন্ধু’ বলে সম্ভাষণ করলেন। সামগ্রিক বিষয়টায় নির্ঘুম ছটফটানো রাত্রি পার করার পর, সকাল দশটায় নির্দিষ্ট ঠিকানায় কড়া নেড়ে এমনটাই প্রাথমিক অভিজ্ঞতা।

 

মূল বিষয়ান্তরে যাবার আগে দীর্ঘ আলোচনার ভূমিকা নিতে হয়নি। এমনকি বৃদ্ধের সঙ্গে প্রাথমিক দৃষ্টিবিনিময়ে জিজ্ঞাসু চাউনিও দেখা যায়নি। বসতে ইশারা করেই আমার প্রতি তার তীক্ষèভঙ্গির দৃষ্টিতেই জানিয়ে দিলেন, ‘এবার শুরু করা যাক, আমরা তো বহুদিনের পরিচিত!’

 

৪.

–   মনে হচ্ছে অতীতে ফিরে গেছি! আমার ব্যর্থ জীবনের পক্ষে অসংলগ্ন অতলে নিমজ্জমান কালের ঘূর্ণাবর্তে কিছু স্থবির সময়-তরী তৈরি করে দিয়েছিল কেবল সেই অতীত।

কপালে হাত ঘষতে ঘষতে তিনি বললেন। যখন বইটি আমি তার সামনে রেখে জিজ্ঞাসু ও কৌতূহলের যুগপৎ দৃষ্টি রাখি।

 

–   নিজে সুবিধে সাপেক্ষে ব্যয় করার ইচ্ছেতে সময়কে আমরা বেঁধে রাখতে পারি না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নিজেদের যথাসাধ্য সাজিয়ে তুলতে পারি। যেন আমাদের গুরুত্ব দিয়ে অর্থবহ উপলক্ষ এনে দিতে পারে তা; কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলি আমি।

–   সময়ের সে বিপুল ঘূর্ণাবর্তকে আমি বেঁধে রাখতে যাইনি। যা ছিল কিছু তরী বিশেষ, যেখানে আমার স্বপ্নগুলোকে সওয়ার করে সে সময়ের ঘূর্ণাবর্ত সমুদ্র পাড়ি দিতে চেয়েছিলাম। আর এই… (তিনি তার পায়ের দিকে তাকিয়ে) আমার স্বপ্নগুলোর উপযুক্ত সাহচর্য দিতে পেরেছে!

 

এরপর দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা আমাদের আলাপচারিতায় স্পষ্ট হতে থাকে সবকিছু। আমাদের পরস্পরের স্বপ্নগুলোয় ভিন্নতা থাকলেও বাস্তবের প্রায়োগিক সাফল্যের কঠিন বাস্তবতার আঘাতগুলো যেকোনো শক্ত তরীরও ভরাডুবি হতে বাধ্য! তিনি বয়ান করলেন, কেমন করে তার স্বপ্নভরা তরীগুলোর নিষ্করুণ নিমজ্জমানতা করুণাহত ব্যথাভরা চোখে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বেও বহু ব্যক্তির সাফল্যের দৃষ্টান্ত সামনে থাকলেও ব্যর্থতাই সঙ্গী হলো। তারুণ্যেই তিনি এই বইটি পড়েছিলেন এবং আমার মতোই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, পেয়েছিলেন প্রেরণা। আর জীবনের শেষ বিকেলে এসে ‘শহরের কারও স্বপ্ন নেই’ লিখে বইটি ছুড়ে ফেলেছেন। এখন উত্তরাধিকারে পাওয়া সামান্য সম্পদে জীবনসন্ধ্যার আগমনে অপেক্ষমাণ আছেন।

পরিষ্কার উজ্জ্বল দিনটি ভগ্নাহত মনের সঙ্গে বড্ড বেমানান। শীতকালের সূর্য আতপ্ত কিরণ দিচ্ছে। পেছনে ফেলে আসা আধো অন্ধকার ফ্ল্যাটে স্বপ্নাহত বৃদ্ধ, যিনি একদা আমার মতো অথবা ছিলেন বইয়ের স্বপ্নবাজ তরুণের মতোই। বাস্তবের টমাস আলভা অ্যাডিসন বা হেলেন কেলারসহ উজ্জ্বল মুখগুলোর আলোর আভা কোনোটাই ব্যর্থতার আঁধার আর আশাপ্রদ সাফল্যের আলোর যাতনার বিক্ষিপ্ত আঘাতে বিরাম দিচ্ছে না। আকাশের খুব উঁচুতে একটি নিঃসঙ্গ চিল চক্রাকারে ঘুরছে।

 

ভাবছি স্বপ্নবাজ প্রতিবন্ধী তরুণের বইটি পুরো শেষ না করে বুড়োর মতো ছুড়ে ফেলব কি না? তখনই নজরে আসে পাঁচটি বলাকার আকাশ পরিক্রমণ। একটি বলাকা অন্যগুলোর থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। ধৈর্য, শক্তি আর সাহসের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি পিছিয়ে পড়া বলাকার মুখে সপ্রতিভ স্পষ্ট। ক্রমশ পিছিয়ে পড়া বলাকার সঙ্গে সামনের বলাকাদের দূরত্ব কমে আসছে। স্পষ্টতই পিছিয়ে পড়া নিঃসঙ্গ বলাকাটি গতির প্রশ্নে অন্যদের থেকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করছে। সেই সঙ্গে, অগ্রসরমাণ বলাকাদের সঙ্গে নিজ গন্তব্যে পৌঁছাবার মতো যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয়ে রাখা আর ভারসাম্য রক্ষা করে যাবার অনমনীয় দৃঢ়তা স্পষ্ট। প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে আগুয়ান বলাকাদের। তখনই কর্ণভেদী চিৎকার করে ওঠে বলাকাটি। ‘শহরের কারও স্বপ্ন আছে’ আমার কর্ণকুহরে এসে প্রচন্ড শক্তি নিয়ে ঝাপটা মারে চিৎকারটি। ততক্ষণে আমি লক্ষ করি, অবচেতনে আমার পা দুটো একটি নুড়ি পাথরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিয়েছে।