সরকারিভাবে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস উদ্যাপনের আশ্বাস

23

অপরাজেয় প্রতিবেদক

শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সঠিক পদ্ধতিতে না হওয়ার ফলে বেশির ভাগ মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান এবং সারা দেশে জন্মগত প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে এদের সংখ্যা ৬০ শতাংশ এমনটি দাবি করেন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষেরা। বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস ২০১৬ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে এই দাবি করেন তাঁরা।

অপরদিকে সরকারিভাবে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস উদ্যাপনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন এই দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানের বক্তারা।

 

মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশ, আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি এবং অধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নতুন কার্যক্রমের সূচনা করার অঙ্গীকার নিয়ে গত ৫ অক্টোবর ২০১৬ রাজধানীর জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর মিলনায়তনে বেলুন উড়িয়ে দিবসটি উদ্যাপনের সূচনা করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল হক।

দিবসটি উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার প্রধান অতিথি মোহাম্মদ ফজলুল হক তাঁর বক্তব্যে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষকে সঠিক পদ্ধতিতে শনাক্তকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানস্থলে অসংখ্য মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে তাঁদের মূল স্রোতোধারায় আনতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুশান্ত কুমার প্রামাণিক বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আগামী বছর সরকারিভাবে দিবসটি উদ্যাপনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার আশ্বাস দেন। এ ছাড়া সরকারের চলমান প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কার্যক্রমের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৫ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষ শনাক্ত হয়েছে ৬৫ হাজার। তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরির জন্য আমরা কাজ করব।’

সভার বিশেষ অতিথি ছিলেন সিডিডির নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম নোমান খান, ডিআরআরএর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন এবং ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা লিমিয়া দেওয়ান। সভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আবু মোহাম্মাদ ইউসুফ।

 

 

‘আমিও আছি, লড়ছি আমার জীবনের জন্য’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় ডিপিও নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদের (পিএনএসপি) উদ্যোগ ও সমন্বয়ে পালিত এই অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যাসোসিয়েশন অব পারসনস উইথ সেরিব্রাল পলসির (এপিসিপি) আহ্বায়ক শর্মী রায়। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন এপিসিপির সদস্য এ. জে. সুমাইয়া।

উল্লেখ্য, সভায় পঠিত মূল প্রবন্ধে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের নিজস্ব স্বাধীন মতপ্রকাশসহ আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি নেই উল্লেখ করে বলা হয়, তাদের সঠিক পদ্ধতিতে শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি নেই। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। প্রবন্ধে বলা হয়, মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঠিক প্রক্রিয়ায় শনাক্তকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেখা যাবে, সারা দেশে জন্মগত প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে তাঁদের সংখ্যা ৬০ শতাংশ। অথচ বিপুলসংখ্যক এ জনগোষ্ঠীর জন্য যথাযথ থেরাপি সেবারও অভাব রয়েছে দেশে; যা সুনিশ্চিত করার জন্য দেশের জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ শনাক্তকরণের জন্য বিনা মূল্যে ইইজি এবং অন্যান্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয় প্রবন্ধে।

এ ছাড়া মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি এবং এনডিডি বোর্ডসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষেরা।

 

দিবস উদ্যাপনে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ, ব্র্যাক, বি-স্ক্যান, সিবিএম, সিডিডি, ডিআরআরএ, এসডিএসএল, তরী ফাউন্ডেশন এবং টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন। আলোচনা সভা শেষে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং দশজন মাধ্যমিক উত্তীর্ণ মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে অক্টোবর মাসের প্রথম বুধবার ‘বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস’ উদ্যাপনের মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষেরা তাঁদের স¦াধীন মতপ্রকাশ ও অধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নতুন কার্যক্রমের সূচনা করেন। শুরু থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এ দেশে দিবসটি পালিত হয়ে এলেও ২০১৫ সালে পিএনএসপির উদ্যোগ ও সমন্বয়ে দিবসটি প্রথমবার বড় পরিসরে পালিত হয় সমাজসেবা মিলনায়তনে। সে বছর এডিডি, বিপিএফ, ব্র্যাক, বি-স্ক্যান, সিডিডি, সিএসআইডি, সিআরপি, এনএফওডব্লিউডি, সিড ট্রাস্ট, তরী ফাউন্ডেশন ও টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন সম্মিলিতভাবে উদ্যাপন করেছিল দিবসটি।