সরকারি কর্মকর্তা হয়ে ওঠার সাতকাহন

69

আইন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. স্বপন চৌকিদার। আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে দেশের প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে সহকারী সচিব পদে আসীন এই মানুষটি সাড়ে তিন বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর লড়াইগুলো সময়ে-অসময়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল। তবু শারীরিক সীমাবদ্ধতার সীমিত সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর এগিয়ে চলা অনুপ্রাণিত করে আমাদের। কবি আবু ইসহাকের জন্মস্থান শিরঙ্গল গ্রামে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে কবির প্রতিবেশী ভাবেন তিনি। সময় পেলে গল্প, উপন্যাস, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাংলা কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের বইয়ে ডুবে থাকেন। ইচ্ছেশক্তি আর আত্মবিশ্বাসী স্বপন চৌকিদারের পথচলা তুলে ধরা হলো অপরাজেয় পাঠকদের জন্য

 

শৈশবের নানা রঙের দিনগুলো

১৯৮৪ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার শিরঙ্গল গ্রামে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মো. স্বপন চৌকিদার। পিতা মো. নুরুল ইসলাম চৌকিদার এবং মাতা নূরজাহান বেগমের সংসারে দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে তিনি বড়।

আশির দশকে বাংলাদেশে অসংখ্য শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিল। সে সময়ে ডায়রিয়ার কবলে পড়ে এই তালিকা বর্ধিতদের মাঝে একজন তিনি। শিশু স্বপনকে গ্রামের কবিরাজি চিকিৎসার মাধ্যমেই সারিয়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন দাদি। বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামীণ পরিবারের মতোই সুচিকিৎসার ব্যাপারগুলো অজানা ছিল এই পরিবারেরও। তাঁরা বুঝে উঠতে পারেনি ছেলেকে কোথায়, কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। ডায়রিয়ায় স্বপনের শরীর এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে, অনেকের ধারণা ছিল তিনি হয়তো বাঁচবেন না।

 

এই অবস্থায় তাঁর বড় মামা নানাবাড়িতে নিয়ে যান তাঁকে। ডায়রিয়ায় অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে যাওয়ায় তিনি চোখ মেলতেন না। দু-তিন মাস পর ছোট খালা একদিন উঠোনে কোলে নিয়ে হাঁটার সময় চোখ খুলতেই দেখা গেল, তাঁর চোখ সাদা হয়ে গেছে। তখন দ্রুত ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস ভর্তি থাকার পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। তবে ১৯৮৭ সালে সাড়ে তিন বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। ইসলামিয়া, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ডাক্তাররা জানালেন, দীর্ঘদিন পানিশূন্যতার কারণে রেটিনা-কর্নিয়ার সংযোগকারী স্নায়ু অকেজো হয়ে গেছে তাঁর। রেটিনা-কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় বলে তিনি আর কোনো দিনও ফিরে পাবেন না দৃষ্টিশক্তি। প্রথম সন্তানের এমন সংবাদে ভেঙে পড়ে পরিবারের সবাই। গ্রামে ফিরে নানাবাড়িতে কাটে তাঁর শৈশবকাল। শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে গাছে চড়ে ফল কিংবা ক্ষেতের ধান চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বা মাঝে মাঝে পালানোর সময় মালিকের কাছে ধরা পড়ে গেলেও বন্ধুরা কখনো তাঁকে ছেড়ে যেত না। শহরে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ করার বিষয়টি নিজ পরিবারেই অনেকে অমর্যাদারকর ভাবেন। কিন্তু গ্রাম্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন স্বপন চৌকিদার। তাঁর পিতা-মাতা তাঁকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন, তবে দুর্ভাগ্য বলে মেনেও নিয়েছেন। গ্রামের লোকজন টিটকারিও করেছে। কেউ কেউ নিজের ছেলেকে স¦পনের সঙ্গে রাতদিন ঘুরতে দেখে বলেছেন, ‘এই ছেলের সাথে কেন ঘুরে বেড়াস? তুই একসময়ে চাকরিবাকরি করবি আর এ তো ভিক্ষা করে খাবে। দরকার নেই তাঁর সাথে ঘুরে বেড়ানোর।’ তবে এসব হীনম্মন্য মানুষের কটু কথা-নিন্দার চেয়ে সহযোগিতাই বেশি পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

 

লেখাপড়ায় হাতেখড়ি

নানা আনু মাতবর স্বপনকে নিয়মিত বাজারে ও বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতেন। তখন গ্রামের এক প্রতিবেশী খালেক হালদার তাঁর নানাকে উৎসাহিত করেন পড়ালেখা করানোর জন্য। তিনি স্বপনকে মিরপুর ২, ঢাকার খ্রিস্টান মিশনারিদের অধীনে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির প্রাইমারি স্কুল ‘ডিসারভেশন আর্মি’তে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন। প্রথম প্রথম কান্নাকাটি করতেন। ফলে একটি বছর নষ্ট হয়। কিন্তু সমাজ ও পরিবারের বঞ্চনা-কটু কথায় একসময় নিজের বোধ হয় লেখাপড়া শেখার। সেই তাঁগিদ থেকেই ১৯৮৯ সালের ২২ অক্টোবর ৬ বছর বয়সে বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছরের মাঝেই ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন। তবে এ জায়গায় এসে নিজেকে ‘লেট স্টার্টার’ বলে আখ্যা দেন তিনি। নার্সারিতে পড়াকালীন ব্রেইল পদ্ধতি খুব একটা আয়ত্ত করতে পারেননি। এমনকি প্রথম দিকে বুঝতে সময় লাগার কারণে প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্নটাই তুলে দিয়েছেন শুরুর দিকে। কিছুটা সময় যাওয়ার পর পড়ালেখা নিয়ে আর বেগ পেতে হয়নি। ১ম শ্রেণির ২য় সাময়িক পরীক্ষা থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত মাত্র একবার ব্যতীত প্রতি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ে পড়েছেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ফর ব্লাইন্ড চিলড্রেনের (এবিসি) পরিচালিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি ৭টি হোস্টেলের একটিতে থাকতেন তিনি তখন। এবিসির সহযোগিতায় এই বিদ্যালয়ের সমন্বিত শিক্ষা প্রকল্পের আওতায় মাত্র দশজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষাথী ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণিতে। তাঁর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৩০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনি একমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র ছিলেন। ১৯৯৯ সালে এসএসসিতে তাঁর বিদ্যালয়ে একমাত্র তিনিই স্টার মার্কস পান। এরপর ঢাকার স¦নামধন্য নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। যদিও পরবর্তীকালে আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনার খরচ চালাতে না পারায় কলেজ পরিবর্তন করেন। ২০০১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে একমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করেন, সে বছর কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ছিল মাত্র ১৮ ভাগ।

 

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। পরের বছর পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ২০০২ সালে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ২০০৭ সালে অনার্স এবং ২০০৯ সালে মাস্টার্স শেষ করার পর ঢাকা বোর্ডে অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। ২০১০-১১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিমিনোলজি ক্রিমিনাল জাস্টিসে অতিরিক্ত ডিগ্রি নেন।

 

সরকারি চাকরির দীর্ঘ সংগ্রাম এবং কর্মজীবনে প্রবেশ

২০১০-এর ১ জানুয়ারি স্বপন প্রথমে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে আইন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব হিসেবে যোগ দেন ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর।

চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করে বহুবার ব্যর্থ হয়েছেন স্বপন । ১৯৮২ সালের বিসিএসে নিয়োগ লাভের বিধান অনুযায়ী বিসিএস সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরির পরীক্ষায় বেসামরিক নিয়োগ পেতে দৃষ্টিশক্তির সীমানা ৬/৬ হতে হয়। পুরুষদের উচ্চতা কমপক্ষে ৫ ফুট ২ ইঞ্চি এবং ওজন কমপক্ষে ৫০ কেজি হওয়া জরুরি, তবে নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা কম। দৃষ্টিশক্তি ৬/৬ না হওয়ায় বিসিএস ২৮তম পরীক্ষায় আবেদন করে ব্যর্থ হন তিনি। কার্ড অনুমোদনের পর যখন কর্তৃপক্ষ জানলেন, তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ, তাৎক্ষণিক তাঁর অনুমোদন বাতিল করে দেওয়া হয়। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে জজ হওয়ার জন্য আবেদন করলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতার কথা না জেনেই তাঁর কার্ড বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু যখন পরীক্ষায় শ্রুতিলেখকের জন্য অনুমতি আনতে গেলেন তখন তাঁর কার্ড বাতিল করা হয়। সরকারি ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোটা না থাকায় এ ভোগান্তির শিকার হন তিনি। দমে না গিয়ে এই সব অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠান ২০০৯ সালের ১৮ মার্চ। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষের উপযুক্ত শ্রুতিলেখকসহ পরীক্ষায় বসতে দেওয়ার জন্য হাইকোর্টে মামলা করেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদনে তিনি লিখেছিলেন, সরকারি ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা ব্যবস্থার জন্য, যেন সকল প্রতিবন্ধী মানুষই এই চাকরির সুবিধা পেতে পারেন। ১১ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উত্তর আসে, ‘আপনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরকারি চাকরি, বিসিএসসহ ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বরাদ্দের জন্য সমাজকল্যাণ, জনপ্রশাসন, আইন মন্ত্রণালয়সহ সমস্ত সংস্থা ও মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা প্রদান করেছেন।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বহুবার দৌড়াদৌড়ির পর ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি অবশেষে ১ শতাংশ কোটা বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় উক্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক। তবে ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীকালে জনপ্রশাসন থেকে পিএসসির সদস্যকে ডেকে এনে পুনঃ বিজ্ঞপ্তি দিতে বলা হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথাও জানানো হয়।

২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর বিসিএসের শ্রুতলেখক নিয়ে জটিলতার কারণে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে। জটিলতাটি হলো, তিনি পরীক্ষার দিনের জন্য দুজন শ্রুতলেখকের জন্য আবেদন করেছিলেন। অসুস্থতাজনিত বা ব্যক্তিগত কোনো কাজে আটকে যদি একজন আসতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে অপর শ্রুতলেখক তাঁকে পরীক্ষায় সহযোগিতা করতে পারবেন ভেবে। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একজনের আবেদন মঞ্জুর হয়। আবেদন জমা দিতে গিয়ে উপস্থিত পরিচালককেও তাঁর মনের আশঙ্কা জানিয়েছিলেন, শ্রুতলেখক কোনো কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে! পরিচালক জানিয়েছিলেন, ‘পরীক্ষা কেন্দ্রে আমরা থাকব, শ্রুতলেখক না এলে তখন ব্যবস্থা করা যাবে।’ এদিকে পরীক্ষার সময় তাঁর আশঙ্কাই সত্য হলো, ১ম দিন শ্রুতলেখকের নিজের পরীক্ষা পড়ে যাওয়ায় সে আসতে পারেনি। ২য় দিন বাংলাদেশ বিষয়াবলি পরীক্ষার সময় অন্য এক মেয়ে শ্রুতলেখককে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে ২২, ২৩, ২৪ ডিসেম্বর পরপর তিন দিন প্রথম আলো পত্রিকার ১ম পৃষ্ঠায় ছবিসহ মূল শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর প্রশাসনের টনক নড়ে। মানবাধিকার কমিশন থেকে রুল জারি করা হয় এবং পিএসসি কর্তৃপক্ষ নজিরবিহীনভাবে তাঁর পরবর্তী পরীক্ষাগুলো নিয়েছিলেন।

 

টানা ছয় বছর এই টানাহেঁচড়ায় কাটানোর পর কর্মজীবনেও প্রায় এক বছরের অধিক সময় ভোগান্তিতে কেটেছে তাঁর। সরকারি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলেন। নিয়োগকৃত ছয়জন কর্মচারীর মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাঁদের মাঝে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ভাইভা বোর্ডে সে সময় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষক, আইন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব এবং পিএসসির একজন সদস্য। আইনবিষয়ক সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। সরকারি কর্মকান্ডে দেশের বাইরে পাঠালে কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি প্রসঙ্গে ভাইভা বোর্ড আশঙ্কা প্রকাশ করলে তখন তাঁর স্পষ্ট জবাব ছিল, বহির্বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষেরা আরও বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর দৃঢ় উত্তর ভাইভা বোর্ডের পথটুকু পাড়ি দিতে সহজ হয়েছিল। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার কারণে পরবর্তীকালে সন্দেহের অঙ্গুলি তোলা হলে ভাইভা বোর্ডের এক সদস্য জানিয়েছিলেন, সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া এবং এসএসসি ও এইচএসসি দুই পরীক্ষাতেই ভালো ফলের কারণে তাঁকে চাকরি দেওয়া হয়েছে।

 

পিএসসি কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রথম প্রতিবন্ধী কর্মকর্তা হিসেবে শোরগোল পড়ে গেল সরকারি অফিসে। প্রথম দিকে তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতেন না। এড়িয়ে যেতেন সবাই। অফিসের সকলের দূর্ব্যবহার ও কটু কথা ব্যথিত করতো তাঁকে। কেউ বলেছে, ‘আপনি অধিকার নিয়ে কিছু চাইবেন না। দয়া করে যা দেব তাঁতেই সন্তুষ্ট থাকবেন। আপনাকে সুযোগ-সুবিধা দিতে গিয়ে অন্য একজন ভালো কর্মকর্তাকে সুবিধাবঞ্চিত করতে পারব না।’ পরবর্তীকালে নিজের ব্যবহার, যোগ্যতা আর কর্মদক্ষতার গুণে সবার মন জয় করে নেন তিনি। আগে যারা অসহযোগিতা করতেন, তাঁরাই এখন যাবতীয় সহযোগিতা করে থাকেন।

 

অনুপ্রেরণা

স্বপন চৌকিদার নিজেকে ফ্যাটালিস্ট বা নিয়তিবাদী ভাবেন। তাঁর মতে, কেউ যদি ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করেন, তাঁহলে ভাগ্য তাঁকে বিপথগামী করবে না। তাই নিজেই নিজের অনুপ্রেরণা হয়েছেন। প্রতিনিয়ত আরও একটু বেশি এগিয়ে যাওয়ার বাসনা তাঁকে তাড়িত করেছে অবিরাম। তবে বন্ধুদের সহযোগিতা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও দারুণ সাহায্য পেয়েছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবিধানিক আইন পড়াতে আসা শিক্ষক রেদোয়ান আহমেদ তাঁকে পিএসসির আবেদনের সময়ে সহযোগিতা করেন। জানতে পারেন বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮তম অনুচ্ছেদে সমতা, বৈষম্য না করা, পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিদের জন্য কোটা রাখা, চাকরি ক্ষেত্রে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

মো. স্বপন চৌকিদার বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বিভিন্ন আইন থাকলেও সেই সাথে রয়েছে আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা। রাষ্ট্রের ওপরের স্তর প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিষয়গুলো অনুধাবন করা গুরুত্ব পায় না। তাঁই সঠিক স্থানে চাহিদা তুলে ধরা গেলে তা পূরণ হবে। দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রতিবন্ধকতা, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা, আইনগত প্রতিবন্ধকতা, বাস্তবায়নগত প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি কাটিয়ে উঠতে হবে।’ সরকারের ঊর্ধ্বতনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ যেন ১ম ও ২য় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারে আমাদের দেশে সেই পরিবেশ তৈরি করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অনস্বীকার্য। কর্মস্থলকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করতে হবে। বিশেষ করে কিছু বৈষম্য হয়ে থাকে আমাদের প্রতি, যা সমাজ চোখ বুজে স্বাভাবিকভাবেই করতে থাকে। অদৃশ্যমান সেই সব বৈষম্য রোধ করতে হবে। তাছাড়া কর্মস্থলে বিশেষ কিছু সুবিধা যেমন কম্পিউটার, স্ক্যানার, একজন কর্মচারীকে না দিলে তাঁর কাছ থেকেও আউটপুট পাওয়া সম্ভব হবে না। এ জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একজন ফোকাল কর্মকর্তা থাকেন, তাঁর সহযোগিতায় যেন প্রতিবন্ধী মানুষেরা সহজে নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেন এবং নানান বিষয়ে যোগাযোগ করতে পারেন, সে দিকটা পর্যবেক্ষণ করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

 

তার শেষ কথা, প্রতিবন্ধী মানুষের মাঝে আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, চেষ্টা, উৎসাহ এই চারটা বিষয় অবশ্যই থাকতে হবে। আমরা স্বপ্ন দেখব, স্বপ্ন বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষা রাখব, আত্মোৎসর্গ আর প্রেরণায় আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে নিয়ে যাবে।