সিজোফ্রেনিয়াকে জয় করা বিখ্যাত মানুষেরা

30

অপরাজেয় ডেস্ক

 

প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা এ পৃথিবীতে কম নয়। জীবনে চলার প্রয়োজনে থেমে থাকা যায় না বলে মানুষকে বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। তবে সেই এগিয়ে যাওয়া যদি হয় খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানো, তবে তা মানুষের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করেই। বিস্ময়ভরা দৃষ্টি দিয়ে মানুষ সেই সফল মানুষটিকে দেখে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নানা বাধা অতিক্রম করে এগিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তা-ও খুব সাধারণ মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ও সবচেয়ে জটিল জীবনযাত্রার যেটি, তার নাম সিজোফ্রেনিয়া।

 

মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিকের মধ্যে অসামঞ্জস্যর জন্য সৃষ্টি হয় এ রোগ। তীব্র জটিল মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপে বিঘ্ন ঘটায়। ফলে এর সম্মুখীন ব্যক্তিরা নিজস্ব মনোজগৎ বা কল্পনার ভুবন তৈরি করে নেন। যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো যোগাযোগ থাকে না। তাঁরা বাস্তব ও কাল্পনিক ঘটনার মধ্যে ফারাক করতে পারেন না। বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বিভিন্ন আওয়াজ শোনেন এবং চারপাশে কিছু মানুষ দেখেন, যা বাস্তবে নেই। তাঁরা মনে করেন, মানুষ তাঁদের মনের কথা বুঝতে পারে এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক সময় স্বজন বা শুভাকাক্সক্ষীদের বিশ্বাস করতে পারেন না তাঁরা। কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে মূর্তির মতো নীরব বসে থাকেন, তাঁরা কোনো প্রকার নড়াচড়াহীন। সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা ও ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন তাঁরা।

এভাবেই কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি ভয়াবহ এই প্রতিবন্ধিতাকে জয় করেছেন। একে সঙ্গী করেই সফল হয়েছেন এই মানুষেরা। মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা জীবনে চলার পথে বাধা হতে পারে না, তাঁরা তা প্রমাণ করেছেন। সিজোফ্রেনিয়ার সম্মুখীন তেমনই কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিকে নিয়ে এবারের আয়োজন।

 

 

ভিনসেন্ট ভ্যান  (১৮৫৩-১৮৯০)

বিশ্বের অন্যতম প্রধান একজন ডাচ চিত্রশিল্পী তিনি, যাঁর চিত্রকর্ম এই একবিংশ শতাব্দীতেও অত্যন্ত প্রভাব রাখে। বলা হয়ে থাকে, তাঁর বেশির ভাগ বিখ্যাত চিত্রকর্ম তিনি এঁকেছেন তাঁর জীবনের শেষ দুই বছরে। এই অল্প সময়ে তিনি ২১০০ চিত্রকর্ম তৈরি করেন, যার মধ্যে ৮৬০টি তৈলচিত্র এবং ১৩০০টির বেশি ছিল জলরঙ, স্কেচ ইত্যাদি কাজ।

যদিও সারাটা জীবনই এক জটিল মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর আচরণের বিভিন্ন গল্প শুনে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের ধারণা হয়, তিনি সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছিলেন। একবার সহচিত্রশিল্পী পল গুগেইয়ের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হওয়ার একপর্যায়ে ভ্যান গঘ বিভিন্ন আওয়াজ ও কথা শুনতে পান। কেউ যেন তাঁকে বলছে হত্যা করতে। তবে সহকর্মীকে হত্যা করার পরিবর্তে তিনি নিজের কান কেটে ফেলেন। অনেক মনোবিদ মনে করেন, বিষণœতা ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারেও ভুগছিলেন ভ্যান গঘ। তবে কখনো ছবি আঁকা বন্ধ করেননি এই শিল্পী। এখন লাখ লাখ ডলারে বিক্রি হয় ভ্যান গঘের ছবি। ১৮৫৩ সালে নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই বিখ্যাত শিল্পী ১৮৯০ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন ফ্রান্সে।

 

 

ভেরোনিকা লেক (১৯২২-১৯৭৩)

১৯৪০-এর দশকে লাখ লাখ ভক্তের মন জয় করেছিলেন লাস্যময়ী এই নায়িকা। তাঁর আলোচিত চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল, সুলিভানস ট্রাভেলস, দিস গান ফর হায়ার। ছোটবেলা থেকেই সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর আত্মজীবনীতে এ তথ্য দেওয়া আছে। ভেরোনিকার বাবা-মা ভেবেছিলেন, অভিনয় তাঁকে সিজোফ্রেনিয়া থেকে সেরে উঠতে সাহায্য করবে। তবে হলিউডে ছবির সেটে তাঁর ভিন্নধর্মী এই আচরণের বিষয়টি বেশ আলোচিত ছিল। ১৯৪৪ সালে একটি ম্যাগাজিন তাঁর স¤পর্কে লিখেছিল, কোনো বিশেষ মুহূর্তে তাঁর মন কি টাইম বোমার মতো বিস্ফোরণ ঘটাবে? তবে সেটিকে তাচ্ছিল্য করে ভেরোনিকা বলেছিলেন, কল্পনাশক্তিহীন পুরুষদের নিয়ে নারীরা সব সময়ই সমস্যায় থাকেন। মার্কিন এই তারকা ১৯৭৩ সালে ৫১ বছর বয়সে মারা যান।

 

 

জন ন্যাশ (১৯২৮-২০১৫)

৩০ বছর বয়সেই বিশ্বের অন্যতম গণিতবিদে পরিণত হয়েছিলেন ন্যাশ। যার জীবদ্দবশাতেই সিজোফ্রেনিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন এবং মেধাবী গণিতবিশারদ হয়ে ওঠবার সময়কার দিনযাপন নিয়ে নির্মিত হয়েছিলো চলচ্চিত্র। হলিউডে তৈরি সেই বিখ্যাত ছবির নাম আ বিউটিফুল মাইন্ড। আটটি অস্কারের মনোনয়ন পাওয়া পেয়েছিল এই ছবি। ১৯৯৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান ন্যাশ। রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে ক¤িপউটিং, গণিত, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার বিজ্ঞান, গেমসের দক্ষতা, আর্মির কৌশল ইত্যাদিতে জগৎখ্যাত এই গণিতবিদের তত্ত্ব ব্যবহৃত হয়।

হাভার্ডে টিকলেও পিএইচডি করেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা শুরু করেন। ন্যাশের বিবাহিত জীবনের শুরুতেই সিজোফ্রেনিয়ার আঘাত। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের কিছুদিন আগে ১৯৫৯ সালে আমেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির আমন্ত্রণে কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখতে যান। কিন্তু সেখানে খুব অদ্ভূত পোশাক পরিহিত জন ন্যাশের অসংলগ্ন বক্তব্যের কারণে তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে পারেন তার মনো-সামাজিক এই প্রতিবন্ধিতার বিষয়ে। ইতোমধ্যে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন দূতাবাসে লিখে পাঠিয়েছিলেন লাল টাই পরিহিত কিছু মানুষ ষড়যন্ত্রমূলক নতুন সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে যারা পুরো পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তিনি তাদের দলে যোগ না দিলে তাকে হত্যা করা হবে।

তার চিকিৎসা শুরু হলে প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ায় ধরে পরে মার্কিন এই গণিতবিদের। লম্বা সময় ধরে চিকিৎসার পর তাঁর মনোসামাজিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। সিজোফ্রেনিয়ার শুরু থেকেই সার্বক্ষণিক তাঁর সঙ্গী ছিল কিছু মানুষ ও তাদের কথা, যা বাস্তবে কেউ দেখতে পেতো না। প্রথম দিকে একেই বাস্তব মনে করলেও ধীরে ধীরে তিনি এই অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ১৯৭০ সালের পর তিনি চিকিৎসা নেওয়া বন্ধ করে দেন।

২০১৫ সালে ৮৬ বছর বয়সে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রীসহ তিনি মারা যান।

 

 

লিওনেল অলড্রিজ (১৯৪১-১৯৯৮)

১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে রাগবি জগতের অন্যতম তারকা খেলোয়াড় ছিলেন লিওনেল অলড্রিজ। ক্রীড়া বিশ্লেষক হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বয়স যখন ত্রিশের কোঠায়, তখনই হ্যালুসিনেশনে ভুগতেন তিনি। চিকিৎসক পরীক্ষার পর জানিয়েছিলেন, সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে তাঁর। সেই সময় কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছাড়াও হতে হয়েছিল লিওনেলকে। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর জীবন। উপযুক্ত চিকিৎসার পর আবার স্বাভাবিক জীবনে তিনি ফিরে এসেছিলেন। ১৯৯৮ সালে ৫৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনোসামাজিক চিকিৎসার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন লিওনেল অলড্রিজ। তিনি বলেছিলেন, চেষ্টা করলেই মনোসামাজিক অবস্থার মধ্য থেকেও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

 

পিটার গ্রিন ১৯৪৬

যুক্তরাজ্যের রক গিটারিস্ট হিসেবে খ্যাতি আছে পিটারের। সিজোফ্রেনিয়ার সম্মুখীন হওয়ার পর থেকেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয় তাঁর। এতে উন্নতিও হয়েছে বেশ। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন তিনি। ৭০ বছর বয়সী এই গিটারিস্টের সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে ভাষ্য হলো, ‘আমার উদ্বিগ্ন হওয়ার অভ্যাস ছিল এবং সহজেই সব বিষয় জটিল করে দেখতাম। এখন আমি এগুলো স্বাভাবিকভাবেই নিই।’