জুঁই ও তার হিংস্র চোখ

39

 

 

সৈয়দ কামরুজ্জামান (রিপন)

 

টেলিফোনটা তখন থেকেই টিং টিং করে বেজে যাচ্ছে। যখনই প্রয়োজন হয় তখনই কেউ থাকে না। ইশ্, মা যে কই গেল। অন্তত টেলিফোনের টিং টিং শব্দদূষণ থেকে বাঁচতে হলেও আমাকে যেতে হবে। কোনোমতে বিছানা থেকে হুইলচেয়ারে বসলাম। এরপর তো কাজ সোজা। চাক্কায় দিলাম এক ধাক্কা। সাঁই করে টেলিফোনের কাছে চলে গেলাম। আর তখনই টেলিফোনের টিং টিং বন্ধ। মেজাজ তখন চরম গরমে, যেই মাত্র ফোনটাকেই ঝাড়ি মারব, তখনই টিং টিং শব্দ করে আবারও বেজে উঠল ফোনটা।

 

– হ্যালো

(ওপাশ থেকে)- কে? জুঁই? তোর মা কই? তখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি!

মা কোথায় তা তো জানি না। আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম। মা এলে কিছু বলব?

– না, তোর মাকে কিছু বলতে হবে না। আজকে আসতে রাত হয়ে যাবে। আর শোন, আমার টেবিলের ওপরে যে খাতা আছে, ওখানে কিছু স্লোগান লেখা আছে। তুই তো জানিসই, কীভাবে লিখবি। দুইটার পরে আরিফকে পাঠাব পোস্টারগুলো আনার জন্য।

আর অমনিই ফোনটা কেটে গেল। আমি যে আরও কিছু বলব, সেই সুযোগই পেলাম না।

 

মা বোধ হয় বাজারে গেছে। কী আর করা, বারান্দায় গেলাম। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই মন ও শরীরÑ দুটোই একসঙ্গে সতেজ হয়ে গেল। আমাদের এই বারান্দাটা বেশ লম্বা। আমি প্রায় সময়ই বারান্দায় এসে বসে থাকি আবার কখনো এপাশ থেকে ওপাশ আসা-যাওয়া করি। ছাদে রেলিং নেই বলেছাদে তেমন একটা যাওয়া হয় না। বারান্দাতেই বেশি থাকা হয়। আমাদের বাসাটা নীলক্ষেতের ২৩ নম্বর হলের দোতলায় আর ভবনটা তিনতলায়। আমাদের এখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় রাস্তাটা ভালোমতো দেখা যায়। প্রতিদিনই এই রাস্তায় প্রচুর লোক যাতায়াত করে। প্রায় সময় আমি বসে বসে ভাবি, লোকজন কীচিন্তাভাবনা করছে। যদি আমি ওই লোকটির বদলে হাঁটি, তাহলেকী চিন্তা করব। এ রকম আরও কত যে চিন্তা করি, যা একসময় নিজেই ভুলে যাই। আর এমন সময় দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম। হুইলচেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরে, ঘাড়টা একটু উঁচু করে দেখলাম মাকে দেখা যায় নাকি। বুঝলাম, মা এসে গেছে। আমাদের ছোট্ট সংসারে মা, বাবা আর আমি।

 

মা এসেই, কিরে জুঁই কখন উঠলি। আর উঠেই বারান্দায়। গায়ে তো কিছু চাদর-টাদর দিবি। এই ঠান্ডায় যদি কিছু হয়ে যায়।

– আমি কী করব। বাবা-ই তো জোর করে ওঠাল।

তোর বাবা এসেছে! কই, তাকে দেখলাম না তো।

– নাহ্, বাবা ফোন করেছিল। ওই ফোন ধরার জন্যই তো উঠতে হয়েছে।

এই সময় তো…, তোর বাবা সাধারণত ফোন করে না। কোনো সমস্যা হয়েছে।

– তা তো কিছু বলল না। শুধু বলল, তার আসতে অনেক রাত হবে আর দুপুরে আরিফ ভাই এসে পোস্টারগুলো নিয়ে যাবে।

কেন যে তোর বাবা এসব নিয়ে পড়ে থাকে। শিক্ষকের কাজ কী? শিক্ষা দেওয়া। ওটা করলেই তো চলে। না, কী সব আন্দোলন নিয়ে জড়িয়ে আছে। তাও যদি এগুলো ঘরের বাইরে করত, তোকেও এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছে। একটু পরেই তো যাবি ওই সব লেখালেখি করতে।

আমি একটা হাসি দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম।

মা হাসি দিয়ে বলল, তোদের বাপ-মেয়ের কারণে আমি যে কী সমস্যায় পড়ব, আল্লাহই জানেন। চল, ভেতরে চল, তোর জন্য কালুর দোকানের গরম গরম শিঙাড়া এনেছি।

 

স্যার, ওরা কি আজকে আমাদের মিছিল করতে দেবে। আর কয়েকদিন পরেই তো ২১ ফেব্রুয়ারি। যেভাবে মুসলিম লিগের পোলাপাইন আর পাকিস্তানি চরের আনাগোনা, তাতে তো মনে হচ্ছে, ওরা বড়কিছু গন্ডগোল করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

নুরুল স্যার, কিছুক্ষণ ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বললেন, বাধা তো থাকবেই, এই বাধা পার হওয়াই তো সফলতা। ওদের ভয়ে যদি আমরা চুপচাপ থাকি, তাহলে সারাজীবন ওদের গোলামিই করে যেতে হবে।

 

এমন সময় আরিফ বলে উঠল, স্যার, ওরা যা ইচ্ছা তা-ই করুক। আমরা আমাদের কাজ করেই যাব। এতে যদি আমাদের প্রাণও যায়, তাহলেও আমরা পিছপা হবো না।

সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসের সবাই বলে উঠল, জি স্যার, আমরা কখনো পিছপা হবো না।

– ঠিক আছে, তাই বলে এত শোরগোল করতে হবে না। আজকে ক্লাস নিতে মন চাচ্ছে না। দুপুরে তোমরা কার্জন হলের সামনে এসো। ওইখানে অন্যান্য গ্রুপের ছাত্ররাও আসবে। আর আরিফ মনে করে, দুপুরে আমার বাসা থেকে পোস্টারগুলো নিয়ে আসবে।

 

 

নে, হাঁ কর, এখন যে কাজ আরম্ভ করেছিস, হাজার ডাকলেও তো শুনবি না। তাড়াতাড়ি খেয়ে আমাকে রক্ষা কর।

– হু, মা কেবল তো এক লোকমা দিলে, এখন আবার, আগে গিলতে দাও…

এমন সময় দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো,

মা বলল, কে..

দরজার ওপাশ থেকে, খালাম্মা, আমি আরিফ।

 

মা দরজা খুলেই, কী ব্যাপার আরিফ এই দুপুরে…

আরিফ ভাই কিছু বলার আগেই আমি বললাম, মা, তোমাকে না বললাম বাবা ফোন করেছিল।

– আরিফ ভাই এখানে আসো তো। তোমাদের আন্দোলন কেমন চলছে?

– এবারের আন্দোলনটা আমরা চাচ্ছি আরও জোরালো করতে।

তাই নাকি! আরে, আরিফ ভাইয়ের মুখ দেখি পুরাই শুকিয়ে গেছে। মা আরিফ ভাইকে কিছু দাও।

– আরিফ হেসে বলল, ও কিছু না। দুপুরে হেঁটে হেঁটে এসেছি তো। আগে এক গ্লাস পানি দেন।

মা পানি নিয়ে এসে বলল,

– এই নাও বাবা, তোমরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে কী যে আরম্ভ করছ!

 

আরিফ আবারও হেসে বলল, খালাম্মা, শুধু আপনি না, সব মায়েরই একই কথা। আমরাও তো চাই পড়াশোনা করতে। কিন্তু ওরা তো আমাদের মতো থাকতে দিচ্ছে না। বায়ান্নতে ওরা আমাদের মুখের কথাই কেড়ে নিতে চেয়েছিল। যদি কথাই না থাকে, তাহলে কবিতা-গান লিখব কীভাবে। আমাদের মায়ের কাছে মনের অনুভূতি জানিয়ে চিঠি লিখব, সেই ভাষাই ওরা মুছে দিতে চেয়েছিল। আর এখন অন্যভাবে আমাদের শোষণ করার চিন্তা করছে। আমরা যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারি, এজন্য তারা ভিন্ন পাঁয়তারা করছে। এরপরও যদি চুপ থাকি, তাহলে সারা জীবনই আমরা তাদের গোলাম হয়ে থাকব। কখনো মাথা তুলে নিজের প্রাপ্ত অধিকারও চাইতে পারব না…

 

হয়েছে, আরিফ ভাই, মাকে হাজার বোঝালেও ওই একই কথা বলবে। বাবাই পারল না মাকে বোঝাতে আর তুমি…

– মায়ের মন তো, তোরা বুঝবি না। আরিফ তুমি বসো, আমি চা নিয়ে আসছি।

আরিফ ভাই দেখেন তো লেখাগুলো কেমন হয়েছে?

– হুম্ম্, অনেক সুন্দর হয়েছে। তোর হাতের লেখা এত সুন্দর মনে হয় চেয়েই থাকি।

বাবা বলছিল, আজকে কলেজে একটু ঝামেলা হবে। প্রশাসন কী-না-কী ঝামেলা করছে।

– প্রশাসন আর কী করবে, ওই পুলিশ দিয়ে বাধা দেবে। আমাদের পরিকল্পনা, কালকে থেকে একুশে স্মরণে সপ্তাহব্যাপী ড. জোহা দিবস পালন করব।

খালাম্মা, চা-টা খুব ভালো হয়েছে। সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। আমি গেলাম, ওখানে অনেক কাজ বাকি আছে। জুঁই গেলাম।

 

রাত প্রায় ৯টা বাজে। এখনো বাবা আসছে না। মায়ের মতো আমারও এখন কিছুটা চিন্তা হচ্ছে। বাবাকে আবার পুলিশে… না! না! কী সব আজেবাজে চিন্তা করছি।

এমন সময় দরজায় খটখট আওয়াজ। আমি আর মায়ের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই গেলাম দরজা খুলতে।

 

আরে জুঁই-মা, তুই কেন দরজা খুলতে গেলি, তোর মা কই।

– বাবা, ওই সকালে গিয়েছ আর এখন এলে। সারাদিন তোমাকে দেখিনি। আর তুমি আমার খোঁজ না নিয়ে, মায়ের খবর নিচ্ছ।

আরে বোকা, তুই তো আমার সব। চল ভেতরে ঢুকি।

– আজকে এত দেরি হলো যেবাবা। কোনো ঝামেলা হয়েছিল।

 

না, তেমন কিছু হয়নি। সামনে একুশে ফেব্রুয়ারি আর নির্বাচনের পর তো ওরা বঙ্গবন্ধুকে এখনো ক্ষমতা বুঝিয়ে দেয়নি। তাই এবার আমরা চাচ্ছি আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে। এর জন্যই মিটিং-আলোচনা এসব চলছে।

– তোমাদের বাবা-মেয়ের আলোচনা এখন বাদ দিয়ে খেতে আসো। এই নেও তোমার গামছা। আগে হাত-মুখ ধুয়ে আসো।

আমি আর মা টেবিল সাজাতে লাগলাম।

একটু পরেই বাবা টেবিলে খেতে বসে বলল, জুঁই-মা, দেখি তো বড় করে হাঁ করতে পারে কিনা।

– আমি ইয়া বড় একটা হাঁ করলাম।

 

বাবা সঙ্গে সঙ্গে বড় একটা লোকমা আমরা মুখে ঢুকিয়ে দিল। আমার মুখটা বড় একটা বল হয়ে গেল। কোনোমতে কিছুটা গিলে বাবাকে বললাম, বাবা, এত বড় লোকমা দিলে। তোমার সঙ্গে কথা বলব কীভাবে। তুমি তো খাটে কাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়বে।

বাবা হেসে বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে, বল কী বলবি।

– আচ্ছা বাবা, আমাকে কি তোমাদের মিছিলে নিয়ে যাবে। আমার খুব শখ, কাছ থেকে মিছিল দেখা আর মিছিলে জোরে চিৎকার করে বলব, ‘জয় বাংলা’।

বাবা কিছুটা কৃত্রিম হেসে বলল, ঠিক আছে মা, তোকে একদিন নিয়ে যাব।

 

স্যার, কালকেই তো ২১ ফেব্রুয়ারি, আজকের কর্মসূচি সম্পর্কে কিছু কি জানেন?

-হুম্ম্, শুনেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। তাই এদিক থেকে খেয়াল রাখতে হবে, তার যেন কোনো অসুবিধা না হয় আর শহীদ দিবস উপলক্ষে আমরা আজকে মশাল মিছিল করব। আমি সোহাগকে সব কাজ গুছিয়ে দিয়েছি। ওই তো, সোহাগ এসে গেছে। সোহাগ তুমি ওদের সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ো।

 

– ঠিক আছে, স্যার।

– তাহলে তোমরা যাও আর আরিফ তুমি একটু এদিকে আসো।

– জি, স্যার

– আরিফ, তুমি একটু আমার বাসায় যাও। জুঁইকে একটু সাহায্য করো। আজকে ওকে একটু বেশিই কাজ দিয়ে ফেলেছি।

– স্যার কী যে বলেন, আমি এখনই যাচ্ছি।

 

দরজার ঠকঠক আওয়াজ হচ্ছে। মা দরজার কাছে গিয়ে বলল, কে?

-খালাম্মা, আমি আরিফ।

স্যার পাঠাল জুঁইকে সাহায্য করার জন্য। কিরে জুঁই, তোর কাজের কী অবস্থা!

 

– আরিফ ভাই, ভালো সময়ে এসেছ। এই তো কেবল শুরু করলাম।

হুম্ম্, আজকের এই রোদটা খুব পারফেক্ট। চল সবকিছু নিয়ে ছাদে যাই। কী বলেন খালাম্মা, যাব নাকি।

– আমি আর কী বলব। জুঁই আর আমি একটু পরেই যেতাম। ঠিক আছে তোমরা ছাদে যাও…

 

তাহলে তোমরা দুজন কাজ করো, আমি একটু হাতের কাজটা শেষ করেই আসছি। আর আরিফ একটু খেয়াল রেখো।

– খালাম্মা, আমি থাকতে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।

ঠিক আছে, জুঁই-মা আমি গেলাম।

আমি আর কী বলব, একটা হাসি দিয়ে বললাম, ঠিক আছে মা, তাড়াতাড়ি চা পাঠিয়ে দিয়ো।

 

মা চলে যাবার পর আমি আর আরিফ ভাই কাজে মনোযোগ দিলাম। এর কিছুক্ষণ পর হালকা দমকা বাতাস আমাদের কাগজগুলো উড়িয়ে দিল। আরিফ ভাই সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দিয়ে কাগজগুলো ধরতে লাগল। আমি কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আরিফ ভাইয়ের লাফালাফির কান্ড দেখে। একপর্যায়ে হো হো করে হেসেই দিলাম।

আরিফ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে হাসতে দেখে, রাগ করার ভান করেও পারল না। আমার সঙ্গে সেও হাসতে লাগল।

 

আরিফ ভাই কাগজগুলো সব গুছিয়ে কয়েক টুকরো ভাঙা ইট চাপা দিয়ে রেখে বলল,

– এখন একটু রেস্ট নেই, তারপর আবার কাজ করব।

– ঠিক আছে।

আরিফ ভাই এরপর বলল, চল, ছাদের ওই মাথায় যাই।

এখন থেকে মোটামুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবই দেখা যায়। রাস্তায় এখন মানুষ কিছুটা কম। কালকে দেখবি মানুষের কত ঢল।

আমি কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে বললাম, আরিফ ভাই, আমাকে কি আরেকটু কোনায় নিয়ে যাবে!

ঠিক আছে, চল।

 

– আরিফ ভাই, দেখেছ এখান থেকে নিচের এই মাঠটা কত সুন্দর লাগছে। তুমি কি নতুন পতাকা দেখেছ। ঠিক ওই রকম সবুজ এই মাঠটা আবার আকারটাও পতাকার মতো শুধু লাল বৃত্ত আর হলুদ মানচিত্রটা নেই।

হুম্ম্, তাই তো! তোর তো কল্পনাশক্তি অনেক ভালো।

মাঝে মাঝে আমি স্বপ্ন দেখি, একটা টকটকে হলুদ শাড়ি পরে, লাল বৃত্তের মাঝে আমি শুয়ে আছি। খুব ভালো লাগে যখন এই স্বপ্নটা দেখি।

আরিফ কিছুটা হেসে বলল, তুই তো দেখি সত্যি সত্যিই কল্পনার রাজ্যে চলে গেলি। এবার চল কাজে যাই। আরে, খালাম্মা দেখি চা নিয়ে এসে পড়েছে।

 

মা, বাবা তো আসতে প্রায় দুইটা বেজে যাবে। আমার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে গেলাম। কালকে তো ২১ ফেব্রুয়ারি। বাবা যেন কালকে অবশ্যই অবশ্যই আমাকে ঘুরতে নিয়ে যায়।

– ঠিক আছে মা, বলব। এখন তুই ঘুমা।

 

– মা, বাবা রাত কয়টার দিকে এসেছে?

– কেন? দুইটার দিকে এসেছে। তুই এত সকাল সকাল উঠলি যে। যা হাত-মুখ ধো। আমি পরোটা আর আলু ভাজিটা করেই আসছি।

– তুমি কীভাবে বুঝলে আমার মনের কথা। আমি আজকে এটাই খেতে চেয়েছিলাম।

আমি হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসে মাকে বললাম, বাবাকে কি ডাকব?

– না, থাক আরেকটু ঘুমাক। ঘুম থেকে উঠেই তো দৌড় দেবে যত সব আন্দোলনের দিকে। ছুটির দিনেও যদি বাসায় থাকত। সবকিছু আমার একাই করতে হয়।

আমি পরিস্থিতি গরম হওয়ার আগেই চলে গেলাম। গিয়ে দেখি, বাবা খাটে বসে রেডিও অন করে খবর শুনছে।

– আমাকে দেখে বাবা একটা মুচকি হাসি দিল।

আমি বাবাকে বললাম, ওই সব হাসি দিয়ে কিছু হবে না। আজকে আমাকে বিকেলে নিয়ে যেতেই হবে।

– আরে বোকা, আমি কি কখনো না বলেছি। আজকে আর সকালে কোথাও বের হব না। একবারে বিকেলে তোদের নিয়ে বের হব। এখন গিয়ে তোর মাকে বল, চায়ের কোনো বন্দোবস্ত হলো কিনা।

আমি অনেক কষ্টে খুশিটা আটকিয়ে রেখে গম্ভীর হয়ে বললাম, ঠিক আছে, মাকে বলছি।

 

১০

শহীদ মিনারে এত ফুল। চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। বাবা এই এত ফুল তোমরা কীভাবে আনলে?

বাবা হেসে বলল, আমরা আনিনি। এনেছে বাংলার মানুষ। গতকাল রাত ১২টার পর থেকে এত মানুষ এসেছে। এখনো মানুষ আসছে। ওই দেখ এখনো মানুষ ফুল দিয়ে যাচ্ছে। তুইও তো ফুল নিয়ে এসেছিস। এইভাবে অজস্র মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুল বিশাল আকার ধারণ করছে। এই বিশাল আকারটা ওরা খুব ভয় পায়।

 

– বাবা,ওরা কারা?

– ওরা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। ওরা ভাবছে আমরা নিরীহ, ক্ষুদ্র। কিন্তু এই ক্ষুদ্রই যে বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। ওরা কল্পনাও করতে পারেনি।

হুম্ম্, সত্যিই। ক্ষুদ্র যে বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। এখানে এসে বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যায়। ইশ্, মা যদি আসত, তাহলে মাও কিছুটা বুঝতে পারত।

– চল, ওই সামনে গিয়ে ফুলটা দিয়ে আসি।

আমাকে দেখে আরিফ ভাই সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে এলো। এসেই বলল, আরে, জুঁই দেখি ঠিকই এসে পড়েছে।

আমি কিছুটা হেসে বললাম, জি আরিফ ভাই, এসে পড়েছি। আপনি কিন্তু কথা দিয়েছেন, আমি এলে সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখাবেন!

– অবশ্যই দেখাব। এ জন্যই তো তোকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই এসে পড়লাম।

 

এই বলে আরিফ ভাই বাবাকে একটু পাশে নিয়ে কী সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। তাদের দিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে, নিজেই হুইলচেয়ারটা চালিয়ে শহীদ মিনারের সামনে এগিয়ে গেলাম আর অবাক দৃষ্টিতে অজস্র ফুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কীভাবেই না একটি ফুল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে!

এমন সময় বাবা গম্ভীর মুখে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল।

জুঁই মা, আমাকে তো এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যেতে হবে। তুই মন খারাপ করিস না। কাজটা শেষ করেই আমি এখনই এসে পড়ব। তুই বরং ততক্ষণ আরিফের সঙ্গে একটু ঘোরাঘুরি কর।

 

আমি তেমন আর আপত্তি করলাম না; বরং কিছুটাচুপ থাকলাম।

আরিফ তুমি ওর দিকে খেয়াল রেখো আর সন্ধ্যার মধ্যে যদি না আসি, তাহলে তুমি ওকে বাসায় দিয়ে এসো।

যখনই শুনলাম, সন্ধ্যার মধ্যে যদি না আসি… তখনই বাবাকে কিছু বলতে যাব, দেখি বাবা রাস্তার ওপারে চলে গেছে। আমি হাতটা নামিয়ে নিলাম। দেখলাম, বাবা আস্তে আস্তে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল।

 

চলবে…………।।