নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বে আধিক্য

4

 

প্রসঙ্গ : জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (খসড়া)

 

সাবরিনা সুলতানা

 

সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (খসড়া) প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারকে এজন্য সাধুবাদ জানাই।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন প্রেরিত এক পত্রে জানা যায়, কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে মতামত গ্রহণের জন্য বেশ কিছু সংগঠনকে খসড়া কর্মপরিকল্পনা প্রেরণ করা হয়েছে এবং মার্চের শেষ তারিখ পর্যন্ত এই সংগঠনগুলো মতামত পাঠাতে পারবে। তবে বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলাম, তালিকাভুক্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে সরাসরি শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ, মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষসহ প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো সংগঠনের নাম নেই।

 

ফাউন্ডেশন কর্তৃক ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ প্রেরিত এই পত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের প্রতিনিধিত্বের আধিক্য দেখা গেছে। এই তালিকায় স্থান পায়নি শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষ, মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো সংগঠন। অপরদিকে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ব্যক্তিপর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হলেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক কোনো সংগঠনের নাম ছিল না এখানে।

মতামত গ্রহণের জন্য মোট ১২টি সংগঠনের কাছে এ কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রেরণ করে ফাউন্ডেশন। তালিকাভুক্ত সংগঠনগুলো হলো, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম, ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিসঅ্যাবল্ড পিপলস অর্গানাইজেশন (নেডপো), বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস), সুইড বাংলাদেশ, অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন মজুমদার, প্রয়াস, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন (বিপিএফ), প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি), অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, বার্ডো এবং তরী ফাউন্ডেশন। যদিও অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠন ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ড পিপলস সোসাইটির (ভিপস) নামে চিঠি পাঠায় ফাউন্ডেশন।

 

এদের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের নেটওয়ার্ক পিএনএসপি এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহের (এনজিও) নেটওয়ার্ক ফোরাম সবার মতামত গ্রহণের জন্য কর্মশালার আয়োজন করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পিএনএসপি বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন, অভিভাবক সংগঠন এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কর্মদল গঠন করে খসড়া কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করে। এই কর্মদলের ধারাবাহিক কাজের পাশাপাশি খসড়া পরিকল্পনাটি নিয়ে জাতীয় ও তৃণমূলের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অভিভাবক সংগঠন এবং বিশেষায়িত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণের জন্য পিএনএসপি ১৭ ও ২৫ মার্চ, ২০১৭ দুটি দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করে। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন জেলার প্রতিবন্ধী জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন, অভিভাবক সংগঠন এবং সেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থাসমূহ এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে। দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় সবার মতামতের ভিত্তিতে পিএনএসপি কর্মপরিকল্পনার একটি খসড়া প্রণয়ন করে এবং পরবর্তীকালে ফাউন্ডেশনে প্রেরণ করে। অন্যান্য সংগঠনও মতামত পাঠিয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে সকল মতামত বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তীতে সকল মন্ত্রণালয়ের ফোকাল কর্মকর্তাসহ বিশেষজ্ঞ পেশাদার ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে গঠনমূলক একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন তরান্বিত করতে উদ্যোগী হবেন সরকার।

 

তবে আমার প্রশ্নটি ভিন্ন জায়গায়, কোনো নেটওয়ার্ক নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিবন্ধী মানুষের মতামত গ্রহণ বা কর্মশালা আয়োজন করতে পারে। কিন্তু সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের কোনো কার্যক্রম বিশেষত আইন বা তার আওতাধীন নীতিমালা প্রণয়নবিষয়ক কার্যে সংযুক্ত হওয়ার সময় প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোকে কেন বিবেচনায় আনবে না?

 

আমরা যদি জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ সিআরপিডি স্বীকার করি, তাহলে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণমূলক যেকোনো কর্মকান্ডে সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ ও মতামত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে সর্ব ক্ষেত্রেই। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অ-প্রতিবন্ধী মানুষের আধিক্য বেশি থাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী মানুষের অভিভাবকেরা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষেরা। কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষেরা এবং প্রতিবন্ধী নারী সংগঠন, যদিও সব ক্ষেত্রে তা নয়। কিন্তু সবখানেই বঞ্চিত হতে হয় শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনকে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, একেবারেই স্বীকৃতি পায় না মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। এ ছাড়া বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা যেমন শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ বা যারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, আমাদের রাষ্ট্র-সমাজের কোনো মাথাব্যথা নেই তাদের জন্য। নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকের পরিবর্তে তাদের নিজস্ব মতামত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ চর্চার বিষয়টি এ দেশ তথা রাষ্ট্রকাঠামো এখনো ভাবতে শেখেনি। সত্যিই দুঃখজনক, রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করে, নীতিমালা তৈরি করে আবার নিজেই তা ভঙ্গের পথে পা বাড়ায়।

 

উল্লেখ্য, গত আগস্ট, ২০১৬ তে এই কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন চূড়ান্তকরণের উদ্যোগ নেয় জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন। সে সময় ফাউন্ডেশনের এক বৈঠকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের মতামতের তোয়াক্কা না করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের এই উদ্যোগের সমালোচনা করে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। বিশেষত তৃণমূলের প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনসমূহের মতামত গ্রহণের কোনো রকম উদ্যোগ না নিয়ে যেনতেন তড়িঘড়িভাবে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া ফাউন্ডেশন গৃহীত কর্মপরিকল্পনায় সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, শিক্ষা নীতি, শিশু নীতি, নারী নীতিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক দলিলসমূহ সিআরপিডি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, ইনচিয়ন কৌশল ইত্যাদি বিবেচনায় রাখা হয়নি এমন অভিযোগও ওঠে।

 

তবে, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩-এর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে সরকার বেশ কিছু কর্মশালা আয়োজন করে জাতীয় পর্যায়ে এবং বিভিন্ন জেলায় অভিভাবক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণের উদ্দেশ্যে। এতেই বোঝা যায়, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী মানুষদের বিষয়ে সরকার কতটা সচেতন এবং আন্তরিক!