প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর অবিলম্বে বাস্তবায়ন চাই

10

 

বাংলাদেশ সংবিধান সকল নাগরিকের সম-অধিকার, অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা দিয়েছে। সর্বস্তরে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এখনো রাষ্ট্র উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর গঠনের বিকল্প নেই। জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি) এই নির্দেশনা দিয়েছে। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর অনুমোদন পায়। ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ অধিদফতর উদ্বোধন করেন।

 

তবে এই উদ্যোগের শুরু থেকে কয়েকজন আমলা এবং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা– বোর্ডের বেসরকারি সদস্য ও এনজিও নেতৃবৃন্দ এবং তাদের নেটওয়ার্ক জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম স্বীয় স্বার্থে এর বিরোধিতা করে আসছে। ফলে গত তিন বছরেও আলোর মুখ দেখেনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনকৃত অধিদফতর। অথচ প্রতিবন্ধী জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনসমূহের প্রাণের দাবি অধিদফতরের বাস্তবায়ন। এ লক্ষ্য পূরণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের জাতীয় নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) অবিলম্বে এর বাস্তবায়নের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের উদ্যোগ নিয়েছে।

 

বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন দর্শন ও বাস্তবায়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে সিআরপিডি। বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে এই সনদে অনুসমর্থন করে। জাতীয় বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের (ধারা-৩৩) আলোকে মে মাসে সরকার ৪৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ করে। যদিও সনদ অনুযায়ী তৎকালীন সরকার আমাদের উন্নয়নে তদারকি ও আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি। শেখ হাসিনার সরকার সিআরপিডির আলোকে আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেই অনুসারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ পাস হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১০ সালের এপ্রিলে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে এই অধিদফতরে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। একই বছরের আগস্ট মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অধিদফতরের সাংগঠনিক কাঠামোর অনুমোদন দেয়। সরকার জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে অধিদফতরের জন্য নয় তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে। এ বছরের মধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ স¤পন্ন হবে। নানা জটিলতা কাটিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এর অনুমোদন দেয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নসহ নানা জটিলতায় আবারও থমকে যায় এই প্রক্রিয়া। উল্লেখ্য, ডেপুটি ¯িপকার ফজলে রাব্বি মিয়া পিএনএসপি আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস ২০১৬ উদ্যাপনে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নে চাই প্রতিনিধিত্ব শীর্ষক অনুষ্ঠানে অধিদফতর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে গড়িমসির জন্য আমলাতন্ত্রকে দায়ী করেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে কি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেছে অধিদফতর? আমরা কি তাহলে পাকিস্তানি আমলের আমলাতান্ত্রিক সেই ভূতের মধ্যে রয়েছি?

 

অধিদফতর গঠনের যৌক্তিকতা

অতীতে সিডও বাস্তবায়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নে জেলা-উপজেলায় কার্যক্রম বাস্তবায়নে গঠিত হয় মহিলাবিষয়ক অধিদফতর। সব মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বাস্তবায়নে এ অধিদফতর সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশের নারী সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অনুদান প্রদান করে এ অধিদফতর। সিডওর মতো সিআরপিডি অনুসমর্থনকারী বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত সরকারও ২০১২ সালের মে মাসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ক্ষমতায়ন অধিদফতর  চালু করেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র সংগঠন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন (ডিপিও)। যদিও নিজস্ব মতামত প্রকাশে অপারগ ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব করে অভিভাবক সংগঠন। আইন অনুসারে ডিপিওদের তালিকা প্রণয়নে আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের মতো জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন শুধু ডিপিওদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে না, বরং এনজিওগুলোকে অনুদান প্রদান করছে। সিআরপিডি অনুযায়ী ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ডেও ডিপিওদের অগ্রাধিকার নেই।

 

সামাজিক নিরাপত্তা খাতকেই প্রতিবন্ধী মানুষের একমাত্র খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত করা বা নেতৃত্বের বিকাশ, দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ উদ্যোক্তা বিকাশে, যাতায়াত, সর্বত্র প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের জন্য এখনো কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে আমাদের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট/বিশেষ কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন, তদারকি বা আন্তঅধিদফতর  সমন্বয়কারী সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একক প্রতিষ্ঠান নেই। সিআরপিডির আলোকে প্রণীত আইন বাস্তবায়ন, প্রচলিত আইনসমূহের সামঞ্জস্যকরণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন, কর্মসূচি তদারকি, সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ করতে এ অধিদফতর  প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এই অধিদফতর ডিপিওদের এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানসমূহের পৃষ্ঠপোষকতায় ভূমিকা রাখবে। এই অধিদফতর কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মীবৃন্দ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংবেদনশীল বাজেট কাঠামো গড়ে তোলা সহজ হবে। এ ছাড়া সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিযোগ প্রদান, প্রতিকারসহ জাতীয় সমন্বয় ও নির্বাহী কমিটির এবং সচিবালয়ের দায়িত্ব পালনে এই অধিদফতর কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একীভূত সমাজ বিনির্মাণে প্রতিবন্ধী জনগণের উৎপাদনশীল, নিরাপদ ও মর্যাদাকর জীবন যাপন নিশ্চিত করতে এই অধিদফতর কাজ করবে।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদফতর বাস্তবায়নের দাবিতে সারা দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়া দরকার। তাই পিএনএসপি বিভিন্ন জেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহকে সঙ্গে নিয়ে এই দাবিতে জোরদার আন্দোলন করতে যাচ্ছে। এই আন্দোলনে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী মানুষ, তাদের পরিবার ও সংগঠন এবং সচেতন ও অগ্রসর নাগরিকদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি)

শ্যামলী, ঢাকা।