মহাচীনের পথিক

35

 

ইফতেখার মাহমুদ

 

ডা. নরম্যান বেথুনের জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে ‘দ্য স্কালপেল সোর্ড’ । টেড এলান ও সিডনি গর্ডনের লেখা বইটির বাংলা অনুবাদ হলো ‘মহাচীনের পথিক’। কল্যাণ চৌধুরী বইটি অনুবাদ করেছেন। আর কবিতা অনুবাদ করেছেন সমর সেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত এই বইটি ১৯৮০ সালে প্রথম অনুবাদ হয়। এরপর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচবার পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে। বইটির জনপ্রিয়তা সম্পর্কে এতেই আমরা বুঝতে পারি।

 

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট হিসেবে আমরা কেবল চে গুয়েভারাকেই চিনি। এমনকি আমাদের এম এন রায়কে আমরা গণনাতেই ধরি না। আজ এমনই আরেকজন সীমানাহীন কমরেডের জীবনগাঁথা লেখার চেষ্টা করছি। তার নাম নরম্যান বেথুন। কানাডিয়ান ডাক্তার নরম্যান বেথুনের জীবনী মহাচীনের পথিকের অডিও বই শুনলাম। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম মানুষের জীবন কতই না বৈচিত্র্যময় ও চ্যালেঞ্জিং হয়! অথচ আমরা যারা অলস, নিষ্কর্ম ও ভীরু, তারা জীবনের অসহায়ত্বের কাছে বিনা প্রতিরোধে নির্লজ্জের মতো আত্মসমর্পণ করি! অন্যদিকে ডা. বেথুন নিজের মতাদর্শের জন্য আত্মস্বার্থটুকু ত্যাগ করেছিলেন। ছেড়েছিলেন আয়েশি জীবনের সবকিছু। তিনি বুঝেছিলেন যে দেশ পদানত, আর যে দেশ পদানত করেছে, তার শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই এবং পদানত দেশের মুক্তি ছাড়া উন্নত দেশের মুক্তি নেই। এ কথা ডা. বেথুন বুঝেছিলেন বলেই সমুদ্র পার হয়ে তিনি এসেছিলেন চীনের মুক্ত অঞ্চলে। একজন বড় সার্জন কী না করতে পারতেন ধনতান্ত্রিক দুনিয়ায়। সব ছেড়ে-ছুড়ে তিনি এলেন কেন?

 

কানাডার গ্রাভেনহার্স্টে ১৮৯০ সালের মার্চ মাসে ম্যালকম ও এলিজাবেথের দ্বিতীয় সন্তান হয়ে জন্ম নেন নরম্যান বেথুন। বাবা ছিলেন গ্রাভেনহার্স্টে একটা চার্চের দায়িত্বে। ছিমছাম-সুখী-উদ্বেগহীন বেথুন পরিবারে কাটে নরম্যানের উদ্দাম ছেলেবেলা। নিষ্ঠাবান বেথুন পরিবারে ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যে বড় হলেও কলেজ পড়–য়া নরম্যান সব সময় নতুন চিন্তা, নতুন ভাবনাকে লালন করতেন মনে। ইতোমধ্যে তিনি পড়ে ফেললেন ডারউইনের থিওরি অব ইভল্যুশন। প্রবল ধাক্কা খেলেন বেথুন। নব্য তরুণ বেথুনের মনে একদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্যদিকে নতুন যুগের নতুন চিন্তার আহ্বান এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব চলছিল ভীষণভাবে। সাহসী নরম্যান, বীর নরম্যান নতুনের আহ্বানে সাড়া দিতে দ্বিধাবোধ করলেন না, বেছে নিলেন নতুন যুগের স্বপ্নকে, এগিয়ে চললেন জীবনের পাথেয় করে। নরম্যানের বর্ণনায়, ‘মায়ের প্রভাবে আমি ছিলাম ধর্ম উপদেষ্টার মতো আর বাবার প্রভাবে অসম্ভব কর্মমুখী। ভেতরে ভেতরে কে যেন সব সময় বলতÑ কর, কিছু একটা কর।’

 

সেই তাগিদেই সম্ভবত ধর্মযাজক বাবার ডানপিটে ছেলে নরম্যন ডাক্তারি পড়তে গিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন এবং ফ্রান্সে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ শেষে লন্ডনে ডাক্তারি পড়তে থাকেন এবং তার শৈল্পিক প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে ফ্রান্স থেকে সংগৃহীত সামগ্রী লন্ডনে বিক্রি করে টাকা কামিয়ে তা দিয়ে বই, শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতে থাকেন। বিয়ে করেন ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা ফ্রান্সেস ক্যাম্পবেল পেনিকে। নম্র, লাজুক, চাপা স্বভাবের ফ্রান্সেস কিছুতেই কটুভাষী, অস্থির-উদ্দাম নরম্যানের সাথে তাল মেলাতে পারছিলেন না। তাদের দা¤পত্য জীবন সুখের হয়নি। ডাক্তারি পড়া শেষ করে ফিরে যান কানাডায়। সেখানে ডাক্তারি শুরু করেন অভিজাত ও দরিদ্র এলাকার মাঝে, তাই হয়তো পসরা জমে ওঠেনি। পরে মুদির দোকানি ও মাংসের দোকানির চিকিৎসা করে খাবার জুটিয়ে নিতে থাকেন। গরিবের অসহায় আর্তনাদ তার বুকে বিঁধত। খুব রগচটা কিন্তু উদার মনের সোজা মানুষ ছিলেন তিনি। চরম অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের ফলে আক্রান্ত হন যক্ষ্মা রোগে। প্রাণের আশা না থাকায় তিনি ফ্রান্সেসকে বিবাহবিচ্ছেদে বাধ্য করেন। কিন্তু অদম্য সাহস ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ সিদ্ধান্তে অপারেশন করে আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারপর আবার ফ্রান্সেসকে দ্বিতীয়বারের মতো বিবাহ করেন। কিন্তু আবার সেই বিরামহীন কাজ ও খেয়ালি জীবনের মাঝে পড়ে ফ্রান্সেস নিজেই বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে অন্য আরেকজনকে বিবাহ করেন।

 

কিন্তু এত কিছুর মাঝে গরিবকে বিনা খরচে বা বস্তিতে এমনকি পতিতালয়ে গিয়ে তাদের চিকিৎসা করার মতো ডাক্তার ছিলেন এক নরম্যানই। তিনি শপথ নিয়েছিলেন, পৃথিবীর বুক থেকে যক্ষ্মাকে বিদায় করবেন। যক্ষ্মার সঙ্গে যে দারিদ্র্যের স¤পর্ক আছে, তা তিনি নিশ্চিত ছিলেন। মাঝে মাঝে ভাবতেন, ডাক্তারি করার চেয়ে মানুষগুলোকে সচেতন করা অনেক সহজ কাজ। কিন্তু বেকারত্বের বিরুদ্ধে এক কানাডার সোশ্যালিস্ট দলের প্রতিবাদ আন্দোলনের ওপর অকথ্য নির্যাতন তাকে সমাজতন্ত্রের দিকে ধাবিত হতে সাহায্য করে। পরে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে যুক্ত হন স্পেনের গৃহযুদ্ধে কানাডিয়ান ডাক্তারি দলের নেতা হিসেবে। সেখানেই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়ার সফল প্রয়োগ ঘটান।

 

তার স্পেনের লেখা অভিজ্ঞতাগুলো সত্যিই মর্মস্পর্শী। কানাডা ও আমেরিকায় স্পেনের ওপর তথাকথিত নিরপেক্ষতার ভন্ডামি বাদ দিতে এক প্রচারাভিযান শেষ করে ছুটে যান চীনে। সেখানকার কঠোর পরিশ্রম ও দারুণ সব দিকনির্দেশনামূলক লেখা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করছে। সেখানে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অপারেশন থিয়েটার বসিয়ে চীনা সৈন্য দলের মনোবল বৃদ্ধিতে দারুণ সহযোগিতা করেন তিনি। চীনের কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্যানিটারি ব্যবস্থা নিজ হাতে সাজান তিনি। কিন্তু ওষুধ সংকটে পড়লে যাজক নীলের সহযোগিতা নেন। নিজে ডাক্তার হয়েও অবরোধ নীতির কারণে গ্যাংগ্রিন হয়ে মারা গেলেন ডা. বেথুন। তার অনুবাদক তুং এবং কাঠমিস্ত্রি থেকে ডাক্তার বনে যাওয়া ফংয়ের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন নরম্যান। এমনকি তার উত্তরসূরি ভারতীয় ডাক্তারেরও পরিণতি একই হয়।

 

তার কথায় নেতা হলেন তিনিই, ‘যিনি ঝুঁকি নিতে পারেন, নির্দেশ দিতে পারেন এবং পরিচালনা করতে পারেন।’ তাই সবার উদ্দেশে বলতে চাই, আমরা যেন এই তিনটি গুণ অর্জনে সচেষ্ট হই এবং আমিও যেন সচেষ্ট হতে পারি এই প্রার্থনা রইল। আমার চেতনাকে সতেজ রাখতে আজ থেকে নরম্যান বেথুন থেকে দীক্ষা নেব নিশ্চয়ই।