মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন

3

 

আবুল হাসেম খান

 

কিছু মানুষকে রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। যাদের নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিশ্রাম-ঘুম নেই। তাদের গায়ে ময়লা কাপড়। রাস্তা থেকে সারা দিন ময়লা টুকরা কাপড়-কাগজ ইত্যাদি কুড়ায়। ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে এসব মানুষের পিছু নেয়। তাদের দিকে ঢিল ছুড়ে আহত করে, মারধর করে, উত্ত্যক্ত করে। অমানবিক জীবন-যাপন তাদের, তারা আমাদের দেশের মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, চলতি কথায় আমরা তাদের পাগল বলে চিনি।

 

সর্দি-জ্বর, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, হার্ট, কুষ্ঠ, যক্ষ্মা ইত্যাদি সব সমস্যায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাই আমরা। সমস্যা জটিল হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনেক অর্থ খরচ করে চিকিৎসাসেবা নেই। কিন্তু মানসিক দিকের কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসক বা সাইকোলজিস্টের কাছে যাই না বা এ বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার মতো সচেতনতা এখনো সৃষ্টি হয়নি।

 

বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, প্রিয়জন হারানোসহ নানা ক্ষতির কারণে বিভিন্ন সময় মানুষ মানসিক কষ্টে ভোগে। বিভিন্ন কারণে মনের কষ্ট ও দুশ্চিন্তার ফলে অনেক সময় নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এভাবে মানসিক সমস্যার সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় মনোসামাজিক স্বাস্থ’্যসেবা, কাউন্সেলিংয়ের আওতায় এলে এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করে সুষ্ঠু ও সমৃদ্ধ জীবন-যাপন সম্ভব।

 

পরিপূর্ণ সুস্থ থাকার জন্য মানসিকভাবে সুস্থ থাকা প্রয়োজন। জৈবিক, সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেকেই মানসিক অসুস্থতার শিকার হন। সবাই মিলে একসঙ্গে চেষ্টা করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন সম্ভব। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রাপ্ত বয়স্ক জনগণের ১৬.০১% মানসিক সমস্যায় ভুগছে। ১৮ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের ১৮.৪% মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য দেশে দক্ষ জনবল খুবই অপ্রতুল।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে গত বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ : সবার জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা’। এই প্রতিপাদ্যর মর্মবাণীকে তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রচারমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানসিক সংকটে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা গ্রহণ করতে সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সমাজে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সহযোগিতা করতে হবে।

 

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে চার ধরনের জনবল প্রয়োজন হয় : সাইক্রিয়াটিক, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী, নার্স, সমাজকর্মী। এই জনবল তৈরি করতে সরকারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা, মানসিক হাসপাতাল পাবনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের মানসিক রোগ বিভাগে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ পরিচালিত নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি সেন্টার, চট্টগ্রামে ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশ্যাল অ্যাকশন (উৎস) সাইকেথেরাপি, সোসিওড্রামা, প্লেব্যাক থিয়েটারসহ ‘অলটারনেটিভস’-এর বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। পৃথিবীব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ‘অলটারনেটিভস’-এর ব্যবহার বাড়ছে। সুলভ মূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ‘অলটারনেটিভস’-এর ব্যবহার জনপ্রিয় করা আমাদের মতো দরিদ্র দেশে একান্ত প্রয়োজন।

 

শিশুকালেই পরিবারে তার মানসিক বিকাশ ঘটে। পারিবারিক নানা ধরনের সমস্যা শিশুর সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। কিশোর, যুব, প্রবীণ অর্থাৎ জীবনের সকল পর্যায়েই মানুষের সুষ্ঠু মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবার প্রয়োজন রয়েছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিষয়টি মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য আইন না থাকায় বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে তেমন বরাদ্দ থাকছে না। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন দ্রুত জাতীয় সংসদে অনুমোদন করে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে সুশীল সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

আসুন, সমাজ উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যক মানসিক স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তুলি। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করে এবং বাজেট বরাদ্দ দিয়ে দেশকে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ অর্জনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।

 

লেখক: কর্মসূচি কর্মকর্তা, থিয়েটার থেরাপি সেন্টার অব দ্য ডিজঅ্যাবল্ড (টিটিসিডি), উৎস, চট্টগ্রাম।