অধিদফতর বাস্তবায়নে এনজিও বিরোধিতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী

15

 

অপরাজেয় প্রতিবেদক

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিদফতর বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং এনজিও নেতৃবৃন্দের বিরোধিতাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের জাতীয় নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদের (পিএনএসপি) সমন্বয় ও উদ্যোগে দেশব্যাপী চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে এসে ডা. মাহফুজুর রহমান এ বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম-অধিকারের জন্য। কিন্তু এত বছর পরেও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিবন্ধী মানুষের অধিদফতর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের সম-অধিকার নিশ্চিত করা।

 

উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে বিগত এপ্রিল ও মে মাসে চট্টগ্রামসহ মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও নেত্রকোনায় মানববন্ধন পালিত হয়। জেলা প্রতিনিধিদের তথ্যমতে, মানববন্ধনগুলোতে সর্বস্তরের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে বিপুল উপস্থিতি লক্ষণীয়। অধিদফতর বাস্তবায়িত না হলে প্রতিবন্ধী মানুষকে রাজপথে সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দেন স্থানীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

 

চট্টগ্রামে পিএনএসপিসহ আরও ৭টি সংগঠন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে গত ২৯ এপ্রিল মানববন্ধন করে। যৌথভাবে এ কর্মসূচিতে অংশ নেয় কোস্টাল ডিপিও এলায়েন্স, চন্দনাইশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা, পূর্ব বাকলিয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন, বি-স্ক্যান, সিডাব চট্টগ্রাম, সংশপ্তক এবং উৎস।

মানববন্ধনে বক্তব্য প্রদানকালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আন্দোলনের কর্মী, গবেষক ও পিএনএসপির পরিচালক রফিক জামান বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য শুধু সামাজিক নিরাপত্তা খাতেই কাজ হয়। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সংস্কৃতি, ক্রীড়াসহ সকল খাতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর উদ্বোধন করার তিন বছর পরেও এর বাস্তবায়ন না হওয়ার তীব্র নিন্দা জানান চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করতে গিয়ে যারা প্রতিবন্ধিতা বরণ করেছেন, তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র দায়িত্ব নিলেও দেশের প্রতিবন্ধী জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিন্দনীয়।

 

সরকারের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া নানা ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে উল্লেখ করে পিএইচপি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ও সমাজসেবক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হুমায়ুন কবির বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষকে মূলধারায় সমমর্যাদায় অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রয়োজনে তা অর্জনে প্রতিবন্ধী মানুষকে রাজপথে সোচ্চার হতে হবে।

 

সর্বস্তরে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং প্রতিবন্ধী জনগণের উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিসমূহের মধ্যে সমন্বয় করতে এই অধিদফতর বাস্তবায়ন অপরিহার্য বলে মনে করেন মানববন্ধনে আগত বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

 

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন রাইট অ্যাকশন ফর ডিসঅ্যাবিলিটির (র‌্যাড) সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহান, কোস্টাল ডিপিও এলায়েন্সের সাধারণ স¤পাদক স্বরূপানন্দ চক্রবর্তী, চন্দনাইশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ স¤পাদক সেলিনা আক্তার রওশন চৌধুরী, পূর্ব বাকলিয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের আহ্বায়ক মুহম্মদ আলমগীর, বি-স্ক্যানের সভাপতি ও ত্রৈমাসিক অপরাজেয় স¤পাদক সাবরিনা সুলতানা, সিডাব চট্টগ্রামের সাধারণ স¤পাদক শহিদুল ইসলাম সাজ্জাদ, চট্টগ্রাম বধির উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নিমাই বণিক, সংশপ্তকের কর্মসূচি সমন্বয়কারী নার্গিস চৌধুরী, উৎসের নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসেম, সিএসডির সাধারণ স¤পাদক বিশ্বজিত গুপ্ত এবং পিএনএসপির সমন্বয়ক ইফতেখার মাহমুদ।

 

দেড় শতাধিক প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে চট্টগ্রামে এ কর্মসূচি স¤পন্ন হয়। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক সংগঠন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংগঠনসমূহ, পেশাজীবী, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।

 

উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের প্রাণের দাবি অবিলম্বে অধিদফতরের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় ডিপিও নেটওয়ার্ক পিএনএসপির দেশব্যাপী আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে মানববন্ধন কার্যক্রম আয়োজিত হচ্ছে। গত ৪ মার্চ, ২০১৭ খুলনা থেকে শুরু হয়ে এ পর্যন্ত ১১টি জেলায় এ মানববন্ধন কর্মসূচি স¤পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন পালন ছাড়াও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কমিটিসহ সকল সংসদ সদস্য এবং সকল রাজনৈতিক দলকে এ বিষয়ে লিফলেট ও পত্র প্রেরণ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে নেতৃত্ব প্রদানকারী ডিপিও নেটওয়ার্ক পিএনএসপি জানায়।

 

মেহেরপুর সংবাদদাতা জানায়, পিএনএসপি, রুরাল ভিশন এবং মেহেরপুর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যেগে গত ২২ এপ্রিল জেলা প্রেসক্লাবের সামনে স্থানীয় প্রতিবন্ধী মানুষ ও তাদের অভিভাবক সংগঠন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন করেন।

কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের হালিম, রুরাল ভিশনের সভাপতি আনারুল ইসলাম, মেহেরপুর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আকলিমা খাতুন, সভাপতি ওমর ফারুক, এসপিডি প্রতিনিধিসহ পিএনএসপির সমন্বয়ক ইফতেখার মাহমুদ, সহযোগী সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম প্রমুখ।

 

 

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা জানায়, কুষ্টিয়া জেলা পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ২২ এপ্রিল মানববন্ধন পালন করে মুক্তির পথে প্রতিবন্ধী ফেডারেশন, বর্ণালী প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা ও পিএনএসপি। যৌথভাবে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রতিবন্ধী মানুষেরা অংশ নেয়।

 

 

নেত্রকোনা সংবাদদাতা জানায়, মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী নাগরিক ও অভিভাবক সংগঠন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন সমিতি, পল্লী দৃষ্টিহীন উন্নয়ন সংস্থা এবং সুইড বাংলাদেশ নেত্রকোনা শাখার যৌথ উদ্যোগে গত ২০ মে নেত্রকোনায় মানববন্ধন পালন করা হয়। নেত্রকোনা পুরাতন কালেক্টরেট মাঠ-সংলগ্ন সড়কে পালিত হয় এ কর্মসূচি।

 

 

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে ২০১০ সালের অটিজম সচেতনতা দিবসে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে অধিদফতরে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় একই বছরের আগস্ট মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ফাউন্ডেশনকে অধিদফতরে রূপান্তরের সাংগঠনিক কাঠামোগত অনুমোদন দেয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্থবির হয়ে যায় এই প্রক্রিয়া। পরবর্তীকালে অর্থ মন্ত্রণালয় এর অনুমোদন দেয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের প্রকল্প বাস্তবায়নসহ নানা জটিলতায় আবারও থমকে যায় অধিদফতর গঠন প্রক্রিয়া। তবে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে আবারও সচল হয় এই প্রক্রিয়া। ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতরের ফলক উন্মোচন করেন। জানা যায়, এই অধিদফতর গঠনের উদ্যোগের শুরু থেকে কয়েকজন আমলা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত এনজিও নেতৃবৃন্দ এবং তাদের নেটওয়ার্ক জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম স্বীয় স্বার্থে এর বিরোধিতা করে আসছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী অধিদফতরের ফলক উন্মোচন করার দীর্ঘ তিন বছরেও অধিদফতর বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে প্রতিবন্ধী জনগণ।

 

উল্লেখ্য, জুন, ২০১৫-এর ত্রৈমাসিক অপরাজেয় এ নিয়ে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে।