জুঁই ও তার হিংস্র চোখ (২য় পর্ব)

88

 

 

সৈয়দ কামরুজ্জামান (রিপন)

 

 গত পর্বের পর

 

১১

বাবা, কালকে কাজটা তুমি ঠিক করো নাই। আমাকে একা ফেলে চলে গেলে আর এলেই না। আমি তো একটু পরপর পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি তুমি আসছ কি না। আর এখন তুমি পেপার নিয়ে বসে আছ। এই নেও তোমার চা।

বাবা, আমার হাত থেকে চা-টা নিয়ে হেসে বলল, আর কটা দিন সবুর কর, স্বাধীনতা বুনেছি।

আমি চোখের ভুরু কুচকে বললাম, কী বুনেছ?

স্বাধীনতা মা স্বাধীনতা। পশ্চিম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীরা এবার আর পার পাবে না। হয় এসপার না হয় ওসপার। এ জন্যই তো সকাল সকাল পেপারটা পড়ছি ওদের মনোভাব বোঝার জন্য।

হুম্ম্, পেপার পড়েই তুমি সব বুঝে গেলে!

তা না, তবে কিছুটা তো আভাস পাওয়া যায়। চল তোর মায়ের কাছে যাই। দেখি কী নাশতা বানিয়েছে।

 

 

১২

বাবা, দেখো তো আমাকে এই হলুদ রঙের শাড়িটা কেমন দেখাচ্ছে?

আগে তো গল্পে পড়তাম লাল পরী, নীল পরী। এখন তো দেখছি হলুদ পরীও এসে গেছে। খুব সুন্দর লাগছে জুঁই-মা।

হুম্ম্, মা তো প্রথমে রাজিই হয়নি। বলে, হলুদ রঙের শাড়ি ক্যাট-ক্যাটা লাগবে। আসলে মায়ের রং সম্পর্কে কোনোধারণাই নেই।

বাবা হেসে বলল, এর জন্যই তো বাবা-মেয়ের ফ্যাসফ্যাসা রঙের জামা পরতে হয়।

 

 

মা, পাশের রুম থেকে বলছে, তোমরা কী সব নিয়ে হাসাহাসি করছ?

বাবা হেসে বলল, জুঁইয়ের বাবার অর্ধাঙ্গিনীকে নিয়ে…

মা সঙ্গে সঙ্গে বলল, সে আবার কে?

আমি আর বাবা আবারও হাসতে লাগলাম।

 

বাবা হাসতে হাসতে বলল,হঠাৎ করে আজকে হলুদ শাড়ি?

এমনিই পরলাম। বিড়বিড় করে বললাম, মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি হলুদ রঙের শাড়ি পরে খোলা সবুজ মাঠে, ঘাসের শিশির কণার ওপর খালি পায়ে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছি। কোনো ক্লান্তি লাগছে না। মনে হয় আরও দৌড়াই। কালকেও এই একই স্বপ্ন দেখলাম।

কিরে, কী বললি, কিছুই বুঝলাম না!

আমি হেসে বললাম। কিছু না বাবা। তোমার তো ভোলামন। তাই স্মরণ করে দিলাম। আজকে কিন্তু মার্চের প্রথম দিন। আগামী ২৫ তারিখে কিন্তু আমার জন্মদিন। তাই এক মাস আগেই সতর্ক করে দিলাম। ওই সময় যতই কাজ থাকুক, সারা দিন কিন্তু আমার সঙ্গেই থাকতে হবে।

নুরুল হক এবার হেসে বললেন, আরে আমার পাগলি মেয়ে। ২৫ তারিখ তো এখনো অনেক বাকি…

 

এমন সময় দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। বাবা উঠে দরজা খুলতেই, আরিফ ভাই ভেতরে ঢুকে বাবাকে বলল,

স্যার, আজকের খবরটা কি শুনেছেন?

কই, পেপার তো পড়লাম। তেমন কোনো খবর তো চোখে পড়ল না।

না স্যার, এই মাত্র খবরটা রেডিও থেকে জানলাম। ইয়াহিয়া ৩ মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে।

বাবা সঙ্গে সঙ্গেই রেডিওটা অন করল। শুনতে পেল ৩ মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে।

বাবা বিড়বিড় করে বলল,এটা তো ঠিক হলো না,  ওরা তো আমাদের সঙ্গে বেঈমানি করছে। এই বলেই বাবা বের হয়ে গেল। আরিফ বাবার পেছনে পেছনে গেল।

 

 

১৩

হুইলচেয়ারটা একটুঝুঁকে ক্যালেন্ডারের ২য় পাতার ওপর একটি ক্রস আঁকলাম। কালকে ১-এর ওপর করেছিলাম আজকে ২-এর ওপর। এভাবে ২৫ তারিখ পর্যন্ত করে যাব। এভাবে অপেক্ষা করার মজাই আলাদা। মা প্রতিবারই বলে, এভাবে ক্যালেন্ডারটা নষ্ট করিস না। তবে আমার মনে হয় মাও এই কাজটি দেখে মজা পাচ্ছে। মা-মেয়ে আর কী করবে। বাইরে তো তেমন বেশি যেতে পারি না। তাই এসব ছোটখাটো কাজে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছি।

 

এমন সময় বাবা এসে বলল,জুঁই-মা জানিস,আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় কী হবে?

আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, কী হবে বাবা!

আজকে বটতলায় আমাদের নতুন পতাকা উত্তোলন করা হবে। আজকে খুব খুশি খুশি লাগছে। মনে হচ্ছে এটা শুধু আমারই পতাকা।

চলো বাবা, আমরাও ছাদে পতাকা উত্তোলন করি।

অবশ্যই করব। এখন আমি বটতলায় যাই। দেখি ওরা পতাকা উত্তোলন করছে কি না। আসার সময় পতাকা নিয়ে আসব। তখন তুই আর আমি দুজনে মিলে পতাকা উত্তোলন করব!

এই বলেই বাবা ছোটদের মতো জয় বাংলা বলতে বলতে বের হয়ে গেল।

 

 

১৪

আজকে ৭ তারিখে ক্রস দিলাম। আমাদের বাসা থেকে একটু দূরে রেসকোর্স ময়দান। বাবা বলেছিল,আজকে এই মাঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দেবেন। বাইরে থেকে বিভিন্ন রকমের স্লোগানের আওয়াজ আসছে। বারান্দায় হুইলচেয়ারটা একটু ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দেখলাম বিভিন্ন জায়গা থেকে হরেক রকমের মানুষ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে রেসকোর্স ময়দানের দিকে যাচ্ছে।

মন খুব চাচ্ছিল ছাদে যেতে। মাকে বলার সাহস পেলাম না। বাবা তো খুব সকালেই উধাও। তাই বারান্দায় বসে দেখার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি, আরিফ ভাই দাঁড়িয়ে আছে।

 

আরে,আরিফ ভাই তুমি কখন আসলা, খেয়ালই করলাম না!

আরিফ ভাই হেসে বলল, এই তো মিনিটখানেক। এসেই দেখি তুই মনোযোগ সহকারে কী যেন দেখছিস। কী দেখছিলি।

আমি কথাটা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য বললাম, বাবা তো আমাকে কোনো কাজ দেয়নি। হঠাৎ করে তুমি এলে। বাবার কি কিছু লাগবে।

নাহ্। স্যার তো সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানে। কার কী কাজ এগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে। স্যার তো নিজেই মঞ্চের জন্য বাঁশ আনতে গিয়েছিল! এতক্ষণ স্যারের সঙ্গেই ছিলাম। মোটামুটি সব কাজ শেষ। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে গেছেন। একটু পরেই ভাষণ দেবেন। কী পরিমাণ মানুষ হয়েছে, তুই কল্পনাও করতে পারবি না। সবার এক কথা ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’। আরও আছে ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ আরও কত রকমের স্লোগান। এসব শুনলেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। এই দেখ, আমার হাতের লোমগুলো কেমন খাড়া হয়ে গেছে।

আরিফ ভাইয়ের কথা শুনে আমারও মনের ভেতর কিছুটা উত্তেজিত হয়ে উঠল। কোনোমতে নিজেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে আরিফ ভাইকে বললাম, তা তো বুঝলাম, তাহলে তুমি এখানে কেন?

আরিফ কিছুটা অবাক হয়ে বলল, কেন মানে। সবাই এই ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে আর তুই হবি না। এটা কোনো কথা হলো। তুই তো আমাদের এই আন্দোলনে একজন সক্রিয় যোদ্ধা। তোর নিজের হাতের লেখা এই সব পোস্টার আমরা প্রতিটি আন্দোলনে ব্যবহার করেছি। তোর তো অবশ্যই থাকতে হবে।

আমি কিছুটা হেসে বললাম, আমি তো সব সময় তোমাদের সঙ্গেই আছি। বিশ্বাস করো আমার মন কিন্তু এখন ওই রেসকোর্স ময়দানে বসে আছে।

আরিফ ভাই কিছুটা কড়া ভঙ্গিতে বলল, অত সব বুঝি না। আমার সঙ্গে তুই এখনই ছাদে যাবি। একটু পরেই ভাষণ শুরু হবে। হাতে একদম সময় নেই।

 

 

১৫

ছাদে গিয়ে দেখি,কোথাও কোনো ফাঁকা মাঠ নেই। সবদিকে লোকারণ্য। মনে হচ্ছে বিশাল সমুদ্র সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি কোনো কথা না বলে, নিজেই হুইলচেয়ারটা চালিয়ে ছাদের চারপাশে ঘুরলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। যে যার মতো দাঁড়িয়ে বা বসে আছে।

আরিফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাব, তখনই দেখি আরিফ ভাই রেডিওটা কানে দিয়ে কী যেন শুনছে। মাঝে মাঝে রেডিওটাকে বাড়ি মারছে।

হঠাৎ করে চারদিকের কোলাহল একটু কমে গেল, আমি আর আরিফ ভাই একটু ঝুঁকে দেখি, একজন সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি ও কালো কোট পরিহিত অবস্থায় হেঁটে এসে মঞ্চে দাঁড়ালেন। তখন প্রায় বেলা সোয়া তিনটা। লোকটি মঞ্চে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক থেকে তুমুল করতালি ও জয়বাংলা স্লোগান হতে লাগল। তখনই আমি বুঝতে পারলাম, এই লোকটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

আমাদের বাসা থেকে রেসকোর্স ময়দান একটু দূর হলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কথা স্পষ্ট শুনতে পেলাম আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার একটি লোককে হত্যা করা হয়,আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবা। মনে রেখো, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করেছাড়বো ইনশাল্লাহ।

 

কখন যে ভাষণ শেষ হয়ে গেল, খেয়ালই করলাম না। পাশে ফিরে দেখি আরিফ ভাই জোরে বলছে ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’। অদ্ভুত এক আকর্ষণে আরিফ ভাইয়ের মতো আমিও জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলাম ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’,তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’।

 

 

১৬

ক্যালেন্ডারের ২৫ তারিখের ওপর ক্রস দিলাম। দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই মনে হলো আজকে শুধু আমারই দিন। আজকে আমার জন্মদিন।

মায়ের কাছে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

পাগলি মেয়েটা আজকে কী হলো!

কিছু না মা আজকে তোমাকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরব। আজকে আমি যা যা বলব, তুমি আজকে তাই শুনবে। কোনো আপত্তি করবে না। আজকে সারা দিনটা শুধু আমার।

এমন সময় বাবা কয়েকটি লাল গোলাপ নিয়ে এসে বলল,শুভ জন্মদিন জুঁই-মা। বল, তুই কী চাস!

আমি চাই সারাদিন তুমি আমার সঙ্গে থাকবে আর গল্প করবে। আর বাবা, আরিফ ভাইকে বলবে আজকে যেন দুপুরে আমাদের সঙ্গে খায়।

বাবা বলল, ঠিক আছে। এখন একটু বাজার থেকে ঘুরে আসি।

 

 

এরপর মা আমাকে কয়েকটি চুমু দিয়ে বলল,আমার খুকি যে এত বড় হয়ে গেছে খেয়ালই করিনি।

আমি কিছুটা বিরক্তির অভিনয় করে, মাকে বললাম, মা! আমি কি এখনো সেই ছোট্ট খুকি আছি, যে তুমি এখনো আমাকে চুমু দেবে। হাত দিয়ে গালটা মুছতে মুছতে বললাম মা, হলুদ শাড়িটা একটু ইস্ত্রি করে দিয়ো। দুপুরে গোসল করার পর পরব।

মা হাসতে হাসতে বলল, ঠিক আছে মা, ঠিক আছে। এখন একটু সামনে আয়। চুলগুলো ঠিক করি দেই।

 

 

১৭

দুপুরের দিকে আরিফ ভাই কয়েকটি রজনীগন্ধা আমার হাতে দিয়ে বলল, অনেক খুঁজে এই কয়েকটি ফুল পেলাম। কারফিউর কারণে মনে হয় ফুলের সাপ্লাই কমে গেছে। আগে খালাম্মার সঙ্গে দেখা করে আসি।

এই বলে আরিফ ভাই কিছুটা সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। পেছন ফিরে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আরে, তোকে হলুদ শাড়িটায় খুব মানিয়েছে।

আরিফ ভাই তুমি কী যে বলো। আচ্ছা, মা রান্নাঘরেই আছে। দাঁড়াও আমি ডাকছি!

এই বলেই আমি মা মা করে ডাকছি। ওপাশ থেকে মা আসতে আসতে বলল কিরে এত ডাকছিস কেন।

 

আরে আরিফ, তুমি কখন আসলা।

এই তো খালাম্মা একটু আগে। স্যার কি আজকে বাসায়?

মেয়ে এমনভাবে আবদার করছে, তাই না করতে পারল না। কিন্তু বাসায় থেকে লাভ কী। ওই একই তো কাজ করছে। তখন থেকে রেডিও কানে নিয়ে বারান্দায় বসে আছে। তুমি বাবা একটু হাত-মুখ ধুয়ে আসো, এই ফাঁকে আমি সব রেডি করছি।

একটু পরেই আমরা খাবারের টেবিলে বসলাম।

 

খাওয়া শুরু হবার কিছুক্ষণ পরেই আরিফ ভাই বলল

আচ্ছা খালাম্মা, আপনাদের নিচে যে অবাঙালি অধ্যাপক আর তার ফ্যামিলি থাকত, তারা কি কোথাও বেড়াতে গেছে? দরজা তালাবদ্ধ দেখলাম।

তা তো জানি না। তবে আজকে খুব সকালে যখন বারান্দায় গেলাম, দেখলাম তারা অনেকগুলো মালপত্র নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। যখন তাদের ডাকলাম, তখন আমাকে দেখে কিছুটা চমকে গেল। কিছুটা আমতা আমতা করে সেই অধ্যাপক বলল, জরুরি কাজে তারা করাচিতে যাচ্ছে।

নুরুল হক বলল, তাই নাকি। আমি তো কিছুই জানি না।

আমি দেখলাম, আরিফ ভাই কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল। খাবারটা তাড়াতাড়ি শেষ করে বলল,

খালাম্মা, আপনার হাতের রান্নাটা অনেকটা আমার মায়ের মতো। অনেকদিন পর এমন খাবার খেলাম। এখন আমি যাই, কিছু খোঁজখবর নিতে হবে। জুঁই গেলাম, যদি পারি কালকে সকালে আসব, সারাদিন তোর সঙ্গে থাকব।

এই বলেই আরিফ ভাই চলে গেল। কিছু যে বলব, এই সুযোগই পেলাম না। বাবাকে দেখলাম রেডিওটাহাতে নিয়ে আবার বারান্দায় চলে গেল।

 

 

১৮

বেশি খাওয়া-দাওয়ার কারণে কিনা জানি না তবে ঘুমটা খুব ভালো হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৫টা দিকে উঠে দেখি আকাশ প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। মাকে বললাম বাবা কই। মা বলল বিকেলের দিকেই বের হয়ে গেছে।

হুইলচেয়ারটায় বসে বারান্দায় গেলাম। তখনই দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে নিজ নিজ বাসায়। কী মজা সারাদিন ঘুরাঘুরি আর সন্ধ্যা হলেই বাসা। আর আমি সারাদিনই বাসায়। হঠাৎ করে আকাশটা সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেল। চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম, রাস্তার আলোগুলো জ্বলছে না। মনের ভেতর কেমন যেন একটা ভয় ঢুকে গেল। বারান্দায় আর থাকতে পারলাম না, মায়ের কাছে গেলাম।

কিরে এত তাড়াতাড়ি চলে এলি।

ভালো লাগছিল না। মা বাবা কখন আসবে।

আমাকে বলছিল একটু হেঁটে আসি।

 

তখনই দরজার ঠকঠক আওয়াজ হলো। মা দরজা খুলতে গেল।

বাবা ভেতরে ঢুকেই বলল, আজকে চারপাশটা একটু অন্যরকম। কেমন যেন একটা গুমোট গুমোট ভাব। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে।

আমি বললাম,

এইজন্য মনে হয় সবাই তাড়াতাড়ি বাড়ি গেছে। এক হিসাবে ভালোই হয়েছে, আজকে তাড়াতাড়ি আসতে পারলে। ঘুম থেকে উঠেই দেখি তুমি নেই। ভেবেছিলাম আসতে আসতে তোমার রাত ১১টা-১২টা বাজবে।এখন আমাকে এই কবিতা আবৃত্তি করে শুনাবা। অনেকদিন তোমার আবৃত্তি শুনি না।

 

 

১৯

                        প্রত্যহ যারা ঘৃণিত ও পদানত,

                        দেখ আজ তারা সবেগে সমুদ্যত;

                        তাদেরই দলের পেছনে আমিও আছি,

                        তাদেরই মধ্যে আমিও যে মরি-বাঁচি।

তাই তো চলেছি দিন-পঞ্জিকা লিখে

বিদ্রোহ আজ! বিপ্লব চারিদিকে।।

 

বাবার আবৃত্তির মায়ায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিদ্রোহ কবিতার ভেতরে কখন যেঢুকে গেলাম। মনে হচ্ছে আমিই লিখছি দিনপঞ্জিকা। বিদ্রোহ দলের পেছনে থেকেও যেন অনুভব করছি তাদের পিপাসা, তাদের দাবি। হঠাৎ মায়ের ডাকে নিজেকে ফিরে পেলাম।

রাত ১১টা প্রায় বেজে গেছে, তোমরা খেতে আসো।

এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কারেন্ট চলে গেল। বাইরের রাস্তার লাইটগুলো আগে থেকেই বন্ধ। কারেন্ট যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। মা কোথা থেকে যে মোমবাতিটা নিয়ে এলো! আমার কল্পনার গহ্বরটা হঠাৎ আসার মতো উধাও হয়ে গেল।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে প্রচ- রকম আওয়াজ পেলাম। চমকে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। মাও সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে ছুটে এলো। বাবা আস্তে আস্তে আমার হাতটা আলগা করে উঠে দাঁড়াল, তখনই আবারও প্রচন্ড রকম গোলাগুলির আওয়াজ হতে লাগল। মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। মা বিড়বিড় করে ইয়াসিন সুরা পড়তে লাগল।

বাবাকে অনেকটা উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। বাইরে যাওয়াটা কি ঠিক হবে! বারবার আমার আর মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ করে বাবা দৌড়ে বারান্দায় গেল। কিছুক্ষণ পর ঠিক একইভাবে দৌড়ে রুমে ঢুকে মেইন দরজার সব ছিটকিনি আটকিয়ে দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল।

 

মাও কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। বলল কী হয়েছে তোমার। বাইরে কী দেখেছ?

বাবা কিছুটা নিচু স্বরে বলল বাইরের রাস্তায় অনেকগুলো আর্মির গাড়ি আর প্রচুর মিলিটারি। এত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় এত মিলিটারি থাকার কথা না। আমার তো মনে হয় আরিফ যেটা সন্দেহ করেছিল ওটাই সত্য হচ্ছে।

আমিও নিচু স্বরে বললাম আরিফ ভাই কী বলেছিল?

ওই হারামিরা কখনোই আমাদের স্বাধীনতা দিবে না। ওরা এখন টালবাহনা করছে মরন কামড় দেওয়ার জন্য।

ওই সব কথা এখন না বলে ভাবো এখন কী করব। ওরা যদি আমাদের বাসায় এসে পড়ে। মায়ের এই কথার সঙ্গেসঙ্গে দরজায় দুড়–ম দুড়–ম আওয়াজ হতে লাগল।

আমার তো তখন গলা শুকিয়ে কাঠ। বাবা উঠে দরজার কাছে গেল তখনই মা বাবার হাত ধরে বলল এই কে কে এইভাবে আওয়াজ করছে।

দরজার ওপাশ থেকে আমরা সরকারের লোক। দরজা খোলেন। কিছু কথা আছে।

জানি না মা কোথা থেকে এত সাহস পেল। বলল, এখন দরজা খোলা যাবে না। যা বলার কালকে সকালে এসে বলো।

কথা শেষ হতেই দরজায় আরও জোরে আওয়াজ হতে লাগল। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে কয়েকজন আর্মি অস্ত্র হাতে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বাবাকে ধরে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যেতে লাগল। আমি আর মা, বাবাকে ধরতে যাব তখনই কিছু আর্মি আমাদের আটকালো এবং জোর করে ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে গুলির শব্দ।

মেঝেতে লাল টকটকে রক্ত আর তার পাশেই শুয়ে আছে বাবা। মা দেখার সঙ্গেসঙ্গেই হেঁচকা টানে হানাদারদের হাত থেকে ছুটে বাবার কাছে গিয়েই বাবাকে ডাকতে লাগল। কিন্তু বাবা সেই আগের মতোই শুয়ে আছে। আমি চিৎকার করে বাবা বলতে যাব কিন্তু পারলাম না। মনের ভেতর প্রচন্ড রকম ঘৃণা আর জিদ এসে গেল। হিংস্র চোখে হারামি হানাদারদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমার তাকানো দেখে হারামিরা হাসতে লাগল আর উর্দুতে জঘন্য কিছু কথা বলতে লাগল। এমন সময় এক আর্মি সজোরে আমার বাম হাতে একটা লাথি মারল। হাতটা হুইলচেয়ারের লকের উপর ছিল। লকটা ভেঙে গেছে কিন্তু হাত দিয়ে অনবরত রক্ত পড়তে লাগল। প্রচন্ড ব্যথায় মাথা ঝিমঝিম করছে তবু আমি কাঁদছি না। একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছি।

আমার এই অবস্থা দেখে তারা কিছুটা ভয় পেয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের জন্য তারা নীরব হয়ে গেল। হঠাৎ একজন সজোরে হুইলচেয়ারটা ধাক্কা দিল। একে তো লক ভাঙা আর আমারও তেমন ইচ্ছা ছিল না থামানোর। প্রচন্ড গতিতে হুইলচেয়ারটা চলে যাচ্ছে ছাদের শেষ মাথায়। মনে হচ্ছিল আমিই সেই ঘরে ফেরা পাখি এই তো এখনই উড়ে যাচ্ছি।

 

ছাদে কোনো রেলিং না থাকায় আমি পড়ে যাচ্ছি। কিন্তু কোনো ভয় হচ্ছিল না। হঠাৎ করে চারপাশটা বদলে গেল, মনে হলো খালি পায়ে বিশাল সবুজ মাঠে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছি। একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে সবুজ মাঠে শুয়ে পড়লাম, কোনো ব্যথা অনুভব করলাম না। চোখের সব দৃশ্য ঝাপসা হয়ে আসছে…দেখছি মা আর বাবা একই রকম পতাকা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে…

 

 

২০

পরদিন খুব সকালে হানাদার বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আরিফ জুঁইদের বাসায় গেল। দেখল, জুঁই ঠিক সবুজ মাঠের মাঝখানে শুয়ে আছে হলুদ রঙের শাড়ি পরে আর তারই রক্তে চারপাশটা লাল বৃত্ত আকার ধারণ করছে।

আরিফ বিড়বিড় করে বলল, এত সহজেই আমরা ওদের ছেড়ে দেব না। এর প্রত্যুত্তর আমাদের দিতেই হবে। এই বলেই আরিফ বের হয়ে গেল…