দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দাবাড়ুদের গল্পসল্প

34

 

বাপ্পি সরকার

 সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, আমরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষেরা সঠিক পদ্ধতিতেই দাবা খেলি। মূলধারার টুর্নামেন্টেও নিয়মিত পদচারণা আমাদের। জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পিছিয়ে নেই আমরা।

সব ধরনের খেলার মধ্যে একমাত্র দাবা খেলাতেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষেরা সব নিয়ম বজায় রেখে মূল স্রোতোধারার টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ ব্রেইল বোর্ডে দাবা খেলে থাকেন বলে একে ব্রেইল চেসও বলা হয়ে থাকে।

 

দাবার ব্রেইল বোর্ড

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষেরা সাধারণত স্পর্শের মাধ্যমে দাবা খেলেন। ঠিক যেভারে তারা ব্রেইল পড়েন। এ ক্ষেত্রে একধরনের বিশেষ দাবা বোর্ড ব্যবহার করা হয়। যাকে আমরা ব্রেইলি দাবা বোর্ড বলি।

ব্রেইল বোর্ডে স্পর্শের মাধ্যমে দাবার গুটির অবস্থান নির্ধারণ করা হয় এবং সে মোতাবেক চাল দেওয়া হয়। এই বিশেষ ধরনের দাবা বোর্ড সাধারণ দাবাবোর্ড থেকে একটু ভিন্ন। এই বোর্ডে প্রতিটি ঘরে একটি করে ছিদ্র থাকে এবং গুটির নিচে পিন স্বরূপ কিছু বাড়তি অংশ থাকে, যাতে গুটিগুলো ছিদ্রের মধ্যে বসে যায়। ফলে গুটিতে স্পর্শ করলেও গুটিগুলো পড়ে যায় না। সাদা গুটি এবং কালো গুটি আলাদা করার জন্য কালো গুটির মাথায় ছোট্ট একটি বাড়তি পিন থাকে, যাতে করে স্পর্শের মাধ্যমে সাদা ও কালো গুটির মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায়। কালো ঘরগুলো সাদা ঘর অপেক্ষা একটু উঁচু থাকে, ফলে স্পর্শ করে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ সাদা ঘর এবং কালো ঘরের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন। প্রতিটি চাল দেওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী খেলোয়াড়দের চালগুলো পরিষ্কারভাবে বলতে হয়, যাতে করে প্রতিপক্ষ সেই চাল মোতাবেক স্পর্শের মাধ্যমে গুটির অবস্থান বুঝতে পারেন এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী চাল দিতে পারেন। মূলধারায় যেমন দাবাড়ুদের প্রতিটি চাল অ্যালজেব্রেয়িক নোটেশন অনুযায়ী লিখতে হয়, ঠিক তেমনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দেরও দাবার চালগুলোকে অ্যালজেব্রেয়িক নোটেশন অনুযায়ী রেকর্ড করতে হয়। নতুবা ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা হয়।

 

 

 

                          ব্রেইলি দাবার গল্পসল্প

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবা খেলার একচ্ছত্র অধিপতি বা নিয়ন্ত্রক ফিদে নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। একইভাবে আন্তর্জাতিক ব্রেইল দাবার সব নিয়ন্ত্রণ আইবিসিএ (ইন্টারন্যাশনাল ব্রেইল চেস অ্যাসোসিয়েশন) নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার। এই সংস্থার উদ্যোগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের বেশ কিছু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যা হলো

  •  টিম অলিম্পিয়াড
  •  ইন্ডিভিজ্যুয়াল ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ
  •  ফেমিনিন ইন্ডিভিজ্যুয়াল ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ
  •  জুনিয়র ইন্ডিভিজ্যুয়াল ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ
  •  ওয়ার্ল্ড টিম চ্যাম্পিয়নশিপ
  •  ইউরোপিয়ান ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ
  • এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ
  • এফআইডিই অলিম্পিয়াড

 

অতি সম্প্রতি ভারতের কর্ণাাটক প্রদেশের মানিপাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের এশিয়ান দাবা প্রতিযোগিতা। যেখানে অংশগ্রহণ করেছে এশিয়ার অন্যতম চার দেশ ভারত, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা। এই চার দেশ থেকে মোট ২২ জন (ভারত ১৫,শ্রীলঙ্কা ৩, বাংলাদেশ ২ ও ফিলিপাইন ২) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন।

 

আন্তর্জাতিক রেটিং অনুযায়ী বাংলাদেশের টপ দুজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় এযাজ হোসেন এবং বাপ্পি সরকার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন। মোট ৮ রাউন্ডের এই টুর্নামেন্ট দিন দশেকের মতো চলে। ৭ পয়েন্ট নিয়ে টুর্নামেন্টে চ্যা¤িপয়ন হন ২৪ বছর বয়সী একজন ভারতীয় তরুণ মেধাবী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় কিষান গাঙ্গুলী। ৫ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের এযাজ হোসেন ৭ম এবং ৪.৫ পয়েন্ট নিয়ে বাপ্পি সরকার ১১তম হন। যদিও এটি একটি ইন্ডিভিজ্যুয়াল প্রতিযোগিতা, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়,ভারতের পরই বাংলাদেশের স্থান এবং পর্যায়ক্রমে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান রয়েছে।

 

শেষ কথা

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্রিকেট,ফুটবল এবং হকির মতো খেলায় ব্যাপক বিনিয়োগ থাকলেও দাবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায় তেমন অগ্রগতি দেখা যায় না। যদিও পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মো. নিয়াজ মোরশেদ প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার কিন্তু বাংলাদেশ সেই কৃতিত্ব ধরে রাখতে এক রকম ব্যর্থ হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ যেমন ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কার মতো দেশ দাবা খেলায় ব্যাপক অগ্রসর হয়েছে। একই অবস্থা বাংলাদেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দাবা খেলোয়াড়দের। প্রচার ও প্রসারের অভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের দাবা খেলা একরকম বন্ধ হতে চলেছে। এমনকি অনেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় যারা দাবাকে ভালোবাসেন, এ বিষয়টি স¤পর্কে একেবারেই অজ্ঞ নন যে তারাও দাবা খেলতে পারেন। এ ছাড়া ব্রেইল দাবা বোর্ড বাংলাদেশে সহজলভ্যও নয়। কারণ তা বাংলাদেশে তৈরি হয় না। আমদানি করতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। ফলে অনেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দাবা খেলোয়াড়ের আগ্রহ থাকলেও ব্রেইল চেস বোর্ডের অভাবে তারা খেলতে পারছেন না। ধারণা করা যায়, সারা দেশে শতাধিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দাবা খেলোয়াড় রয়েছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ব্রেইল দাবা বোর্ড এবং প্রশিক্ষণের অভাবে খেলোয়াড়রা তাদের নিয়মিত অনুশীলন করতে পারছেন না। এই অবস্থার উত্তরণ সাধন করতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ, যেমন নিয়মিত ব্রেইল দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন। এ ছাড়া দেশে ব্রেইল দাবা বোর্ড তৈরি এবং তা সুলভ মূল্যে পাওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা প্রয়োজন।