দ্য আলকেমিস্ট : সাফল্যের আসল রহস্য

185

 

 আশা-নিরাশার এই জীবনে আমরা প্রতিনিয়তই নিজেদের দুর্বল আর অসহায় ভেবে অদ্ভুত অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। আমরা স্বপ্ন অনেক দেখি, তবে হতাশা নামের একধরনের ভাইরাসের কারণে আবার তা হারিয়েও ফেলি দ্রুত। স্বপ্নের পথে হাঁটতেই আমাদের যত আপত্তি। স্বপ্নপূরণের একাগ্রতা কিংবা ধৈর্য না থাকলে তা যে আজীবন অপূরণীয় থেকে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। এই বিষয়গুলো মূলত এই উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে।

 

দ্য আলকেমিস্ট’ অ্যাডভেঞ্চার ও জীবনদর্শনে পরিপূর্ণ এক উপন্যাস। যার ইচ্ছে একটি নিতে পারেন,আবার দুটোই উপভোগ করতে পারেন। যাদের সামান্য ইংরেজি পত্রিকা পড়ার অভ্যাস আছে, তারা অনায়াসে মূল ইংরেজি বইটি পড়তে পারেন। কারণ, অনুবাদ বেশির ভাগ সময়ই সাহিত্যের মূল রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত করে। বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় জীবন্ত কিংবদন্তি ব্রাজিলের অধিবাসী পাওলো কোয়েলহো বইটি লিখেছেন। অনেকের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে অনুপ্রেরণীয় উপন্যাস দ্য আলকেমিস্ট লিখে বিখ্যাত হয়েছেন লেখক।

 

খুবই সাধারণ একটা গল্প। কিন্তু অসামান্য হয়েছে এই গল্পের চিন্তা ও দর্শনের কারণে। এক মেষপালক বালক সান্তিয়াগোকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাস লেখা হয়েছে। আন্দালুসিয়ান এই রাখাল বালক প্রায়শই স্বপ্নে দেখে একটি ছোট বালক তাকে মিসরের পিরামিডের নিচে লুকানো ধন রত্নের খোঁজ করতে বলছে। সান্তিয়াগো এক জিপসির কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চায়। জিপসি তাকে মিসরে যেতে বলে। সেটাই তার লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে জানায়। স্বপ্নের সেই গুপ্তধনের খোঁজে সুদূর স্পেন থেকে মিসরে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সে। এক রহস্যময়ী লোক যে নিজেকে সালেমের রাজা বলে দাবি করে, সেও তাকে জিপসির মতো মিসরের উদ্দেশে রওনা দিতে বলে। সান্তিয়াগো তার পুরো ভেড়ার পাল বিক্রি করে তাঞ্জিয়ারে পৌঁছায় এবং সেখানে সে চুরির সম্মুখীন হয় ও নিঃস্ব হয়। তার এখন মিসরে পৌঁছানোর টাকা নেই। সে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাস্তবতা তাকে ফিরিয়ে দিতে চায় বারবার কিন্তু মনের গভীরে যার তীক্ষ্ণ প্রত্যয়, তাকে রোখে কার সাধ্য। সে একটি দোকানে কাজ নেয়। প্রায় এক বছর কাজ করে সে নিজ দেশে ফিরে ব্যবসা করার মতো যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ জমিয়ে ফেলে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দেশে ফেরত না গিয়ে মিসরের উদ্দেশে রওনা দেয়। মিসর যাওয়ার পথে এক কাচ ব্যবসায়ী তার স্বপ্নের কথা শুনে বলে, আমার ভয় হয় আমি যদি আমার স্বপ্ন পূরণ করে ফেলি, তবে হয়তো আমার আর কিছু করার থাকবে না।

 

তোমার (মেষপালক) সঙ্গে আমার তফাত হলো, তুমি স্বপ্ন বাস্তব করতে তোমার লক্ষ্য ঠিক করেছ; তা যত কঠিনই হোক না কেন। আর আমি স্বপ্ন দেখে দেখে একদিন করব এই ভেবে বাঁচি। এই পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পথিমধ্যে মরুবাসী দুই গোত্রের সংঘাতের কারণে একটি গোত্রের বসতিতে তাকে বেশ কিছুদিন থাকতে হয়। সেখানে থাকতে গিয়ে ফাতেমা নামের এক বালিকার প্রেমে পড়ে যায় সান্তিয়াগো। ঘটনাক্রমে সান্তিয়াগো মরুবাসীকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে তাদের কাজ থেকে মূল্যবান কিছু উপহার পায় এবং তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে জলাঞ্জলি দিতে বসে। এদিকে মিসরের সাহারা মরুভূমিতে তার পরিচয় হয় এক ইংরেজের সঙ্গে, যে আল-ফাউমে আলকেমিস্টের সন্ধানে যাচ্ছে, যার কাছ থেকে সে আলকেমির রহস্য শিখে নেবে। চলতে থাকল সান্তিয়াগোর তার লক্ষ্যের উদ্দেশে যাত্রা এবং তার পরিচয় হয় ২০০ বছর বয়সের আলকেমিস্টের সঙ্গে। এই আলকেমিস্ট তাকে মোহের দুয়ার থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে, মনে করিয়ে দেয় আসল লক্ষ্যের কথা। এমনকি আরব বেদুঈন মেয়ে ফাতেমাও তাকে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। এরপর পথে পরিচয় হয় এক দরিদ্র বেশে এক অদ্ভুত রাজার সঙ্গে যে তার কাছে তার অতীত সম্বন্ধে সব বলে দেয় এবং মিসর যাওয়ার জন্য তাকে পরামর্শ দেয় এবং কিছু মেষ বিনিময় করে।

 

সেই বৃদ্ধ রাজার উপদেশ আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো হলো:

১। তুমি যদি কোনো সফলতা পেতে সচেষ্ট হও,  তবে সমগ্র বিশ্ব তা বিফলে পেতে ষড়যন্ত্র করে।

২। তোমার আশপাশে বা তোমার সঙ্গে এমন সব ঘটনা ঘটবে, যেগুলো থেকে তোমার সামনে চলার বিষয়ে ইঙ্গিত থাকবে। তুমি যদি তা বুঝতে পারো তবেই পথচলা লক্ষ্য অনুযায়ী হবে।

৩। ভবিষ্যতের জন্য কখনো বর্তমানকে হারাবে না। যদি ভবিষ্যৎ পেতে ঝুঁকি নাও, তবে বর্তমানকে হারিয়ে নয়।

 

অবশেষে সে তার স্বপ্নের শেষ গন্তব্যে (মিসরের পিরামিড) পৌঁছায়। এরপর সান্তিয়াগো কি তার লক্ষ্য, যা ছিল পিরামিডের নিচের গুপ্তধন সেই লক্ষ্যে অটুট থাকবে, নাকি আলকেমিস্টের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর নতুন লক্ষ্য ঠিক করবে? মিসরে তার ওপর হামলাকারী দুর্বৃত্তদের দল কী বলছিল সান্তিয়াগোর গুপ্তধনের স্বপ্ন নিয়ে? সান্তিয়াগো যে গুপ্তধনের খোঁজে এত দূর পাড়ি দিয়েছে, তার সন্নিকটে যাওয়ার পর কী হলো? সে কি আদৌ সফলতা পাবে ইত্যাকার নানা প্রশ্ন আপনার মনে দোলা দিয়ে যাবে বইয়ের শেষ পর্যায়ে এসে। তবে গল্পের শেষে সান্তিয়াগোর সফলতা জানতে ঝটপট পড়ে ফেলুন ঝরঝরে এ উপন্যাস।

 

কালজয়ী এই বইয়ে পাওলো কোয়েলহো বেশ কিছু বিষয়ে সুন্দর সুন্দর কিছু কনসেপ্ট দিয়েছেন,যা যেকোনো ব্যক্তির সার্বিক জীবনযাপনের জন্য দিকনির্দেশনামূলক হতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম যে পরিস্থিতিতে তুমি পড়বে, পরিস্থিতিই তোমাকে শেখাবে কী করে তা উতরে যেতে হয়। তবে তোমার প্রচেষ্টা ও ইতিবাচক চিন্তা এই কাজে সবচেয়ে বড় সহায়ক হবে। পুরো পৃথিবীকে জয় করার সাহস আছে যার, সে তার স্বপ্ন পূরণ করে তবেই ছাড়বে। অথবা যাকে তার লক্ষ্য সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়, সেই লোককে স্বপ্ন কীভাবে পিছু হটাতে পারে! এসব তার কাছে তেমন কোনো বাধাই মনে হয় না। মানুষ যখন তার লক্ষ্যকে নির্ধারণ করতে পারে এবং লক্ষ্যকে চিহ্নিত করতে শেখে তখন কাক্সিক্ষত সফলতা তার হাতের মুঠোয় চলে আসে। বইটি একটি দারুণ অনুপ্রেরণার মঞ্চ। যাদের স্বপ্ন আছে, যারা কোনো বিষয়কে নিজের লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করেছে এবং সত্যিই সেই লক্ষ্যে যারা পৌঁছাতে চায়; তাদের অন্তত একবার হলেও দ্য আলকেমিস্ট বইটি পড়া উচিত।

 

আগেই বলেছি, অতি সাধারণ একটি গল্প, কিন্তু অনন্যসাধারণ লেখনী। একটি সাধারণ রাখাল বালকের মিসর যাত্রার গল্পের মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে মানুষ নিজের দেখা স্বপ্নে যেন কখনো বিভ্রান্ত না হয়। একটি বাস্তববাদী স্বপ্ন মনে পুষে আপনি যদি একটি লক্ষ্য স্থির করেন,পথ যতই বন্ধুর হোক না কেন, আপনি লক্ষ্যে পৌঁছাবেনই। আপনি মাঝে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসতে চাইলেও আপনি ফিরে আসতে পারবেন না, কারণ তখন ‘পুরো বিশ্বই ষড়যন্ত্র করবে’ আপনাকে আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। আপনি যদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাখেন এবং সাহসী হন, তাহলে যত কিছুই ঘটুক না কেন, আপনি লক্ষ্যে পৌঁছাবেনই আপনার দৃঢ় সংকল্পের জন্য। লেখক আরেকটি বার্তা দিয়েছেন, তা হলো আমরা যেন স্বপ্ন দেখা বন্ধ না করি। কারণ, যে স্বপ্ন দেখতে পারে, সে তা বাস্তবেও রূপ দিতে পারে।

 

উপন্যাসের নাম দ্য আলকেমিস্ট হয়েছে কিন্তু এখানে একটি আলকেমিস্টের চরিত্র আছে সে জন্য নয়, বরং লেখক পুরো গল্পের মতো নামকরণও করেছেন রূপক অর্থে। আপনি যদি হতাশায় নাও ভোগেন, আপনার জীবনের পথ খুবই মসৃণ তারপরও বলব এই অসাধারণ অনুপ্রেরণীয় উপন্যাসটি পড়ার জন্য।

 

একনজরে :

বইয়ের নাম : The Alchemist  (দ্য আলকেমিস্ট)

লেখক : পাওলো কোয়েলহো

প্রকাশনের সময় : ১৯৮৮ (পর্তুগিজ ভাষায়)

ইংরেজিতে অনুবাদ : ১৯৯৩

ধরন : রূপকধর্মী উপন্যাস (Allegorical Fiction)

পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৬১

দাম : ৫০ টাকা।