প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন

28

 

 আবুল হাসেম খান

  চট্টগ্রাম স্টেশন। সময় রাত এগারোটা। চকচকে লাল-সবুজ রঙের নতুন একটি ট্রেনের কামরায় উঠেই আশ্চর্য এক অনুভূতি হলো আবুলের মনে। সুপ্রশস্ত দরজা। লাগোয়া সুপ্রশস্ত দরজাযুক্ত টয়লেট যেখানে অনেকটা জায়গা খোলামেলা। দরজা পেরিয়ে কামরার অভ্যন্তওে বসার আসনের দিকে ঢোকার দরজাটিও বেশ প্রশস্ত। টিকিট অনুসারে নির্ধারিত আসন খুঁজে নিয়ে আবুল দেখে তার বসার আসনটির ওপর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চিহ্নযুক্ত একটি ছবি বসানো। একমাত্র বিদেশেই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নির্ধারিত স্থানে এমন চিহ্ন দেখা যায়।

 

আলোকোজ্জ্বল বাতিগুলো ট্রেনের কামরাটিকে দিনের আলোর মতো ঝকঝকে করে তুলেছে। চকচকে ফ্যানগুলো দেখেই মন ভরে যায়। আবুল বিশ্বাস করতে পারছে না,সে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ট্রেনের কামরায় বসে আছে। তার মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে। ওঠবার সময় টিকিট দেখিয়ে কামরায় উঠতে হয়েছে, টিকিট ছাড়া কামরায় কোনো মানুষ নেই। ভেতরে চা-নাশতা, চিপস-পানীয় বিক্রেতারাও বেশ সুশৃঙ্খল। জীবনের প্রথম এবং হঠাৎ দেখা এই ব্যতিক্রম পরিবেশ আবুলকে বেশ অবাক করে দিচ্ছে।

 

সরকার বিদেশ থেকে আমদানি করা নতুন ১৮টি কামরা নিয়ে একটি ট্রেন উদ্বোধন করেছে।প্রতিবন্ধী জনগণকে নিয়ে অধিকার উন্নয়ন ও আইনবিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় যেতে কত কষ্ট হতো এর আগে। সে সময় ট্রেনের কামরার দরজা দিয়ে চট্টগ্রামের প্রতিবন্ধী মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা জাহিদুল ইসলামের হুইলচেয়ারটি তোলা যেত না। রেঞ্জ নিয়েএকটি চাকা খুলে ফেলতে হতো। নতুন এই ট্রেনের ‘ক’ বগির এই কামরার প্রশস্ত দরজার কারণে এখন আর হুইলচেয়ার ওঠানোতে তেমন সমস্যা হবে না। খুবই দুঃখের বিষয় যে গত এক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। আজ আবুল সচক্ষে দেখল সেই হুইলচেয়ার নিয়ে যাতায়াতের সমস্যাটির সামান্য হলেও একটি সমাধান এসেছে।হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের জন্য বিশেষ কামরা যুক্ত করা হয়েছে। যদিও প্ল্যাটফর্ম থেকে সুউচ্চ সিঁড়ির কারণে কয়েকজন ধরে চেয়ার তোলার ঝক্কি খানিকটা পোহাতে হবে বৈকি!

 

একটি ছোট্ট মেয়ে একটু বেশি খোলা জায়গা পেয়ে ছোটাছুটি করতে পারছে। সুন্দর ফিটফাট কামরা দেখে সব যাত্রীর মনই খুশি খুশি। নতুন সিটে আরামে বসে আবুলের সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। এক যুগ পেছনের স্মৃতি রোমন্থন করছিল সে। সে সময় প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের অসুবিধাগুলো দূর করারজন্য জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেমিনার, মতবিনিময়,অ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠানের বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট মনে ভাসে। আজ এক যুগ পরে ধীরে ধীরে এসবের বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তেএসে মনটা আনন্দে ভরে যাচ্ছে। একটি সরকারি পরিবহনে প্রতিবন্ধী জনগণের জন্য এই সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি বেসরকারি পরিবহন মালিকদের সামনে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে দেওয়া যাবে।চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে বিশেষ ধরনের টাইলস বসানো হয়েছে যেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষেরা প্রবেশপথ থেকেপ্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত তার গন্তব্য স্থানটি সহজে খুঁজে নিতে পারে। টিকিট কাউন্টারে তার দাঁড়ানোর স্থানটিও সহজেই খুঁজে পাবেন তারা।

 

দূরপাল্লার যাতায়াতে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের হুইলচেয়ার প্রবেশের জন্য প্রশস্ত এই দরজাযুক্ত বগিটি এখনো আবুলের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। মনের ঘোর এখনো কাটছেনা। নতুন সিটে আরামে গা এলিয়ে প্রতিবন্ধী মানুষদেরখেলাধুলার জন্য হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষদেরনিয়ে ট্রেনে ঢাকা যাওয়ার সমস্যার আগের দিনগুলোর কষ্টকর অভিজ্ঞতার স্মৃতিগুলো সে মনে মনে চিন্তা করছে।কখন যে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে ফেনী স্টেশনে ট্রেনটি এসে থেমেছে, তা টেরই পায়নি সে। শীতকাল হওয়ায় দরজা-জানালা বন্ধ থাকার কারণে ট্রেনের চাকার কান ঝালাপালা শব্দ কামরার ভেতরে ঢুকছে না। নতুন বগি হওয়ায় ঝাঁকুনি অনেক কম। নন এসি কামরায় এসির এই আবহ বেশ ভালোভাবে উপভোগ করছে সে। তার মতো অন্য যাত্রীরাও আজকের রাতের এই আনন্দদায়ক ও আরামপ্রদ যাত্রা উপভোগ করছে, তা তাদের চোখেমুখেই ফুটে উঠেছে। অনেক আনন্দ আর সুখের আবেশে আবুল ঘুমিয়ে যায়। আর রাতের আঁধার ভেদ করে ভোঁ ভোঁশব্দ করেহুইসেল বাজিয়ে বাজিয়ে নতুন লাল-সবুজ রঙের চাকচিক্যময় নয়নাভিরাম ট্রেনটি অনেক দ্রুতগতিতে ঢাকার দিকে ছুটে চলে।

লেখক: কর্মসূচি কর্মকর্তা,

প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কার্যক্রম, উৎস, চট্টগ্রাম।