বাঙালির চিরায়ত কৃষ্টি চর্চায় প্রতিবন্ধী জনগণ

22

নুরুন্নাহার তনিমা

 

জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক,

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা

অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা।

 

নতুন বর্ষের শুরুর লগ্নে ধরণীকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র হওয়ার, কবিগুরুর এই আকুতি আমাদের বাঙালি সত্তাকে প্রতিবছরেই নিয়ে যায় ঐতিহ্যের দিকে। জীর্ণতাকে বিদায় জানিয়ে অপ্রাপ্তির বেদনা ধুয়ে-মুছে বৈশাখকে স্বাগত জানাতেই চিরায়ত বাঙালির এই লোকজ উৎসব চৈত্রসংক্রান্তি। ফিরে দেখা এবং বরণ করার এই চক্রবাঁকে দাঁড়িয়ে চৈত্রসংক্রান্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পুরাতন থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনকে আলিঙ্গন করতে। দুয়ের মধ্যবর্তী সময়কে গুরুত্ব দিতে।

 

কিন্তু বাঙালির চিরায়ত এ কৃষ্টি চর্চায় প্রতিবন্ধী জনগণ বিচ্ছিন্ন। আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা বিকাশে প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) প্রাঙ্গণে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে এ বছরও এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পিএনএসপি তার জন্মলগ্ন থেকেই সব ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের মিলনমেলা ঘটাতে, বিশেষত বাঙালির চিরায়ত কৃষ্টি চর্চায় প্রতিবন্ধী মানুষদের সব সময় উৎসাহিত করতে চায়। আমার জন্যে প্রথম প্রথম এসব বেশ বড় ধরণের চমক ছিলো। কিন্তু ভালো লাগা ছিলো অনেক বেশি। গানের প্রতি ভালোবাসার টানেই ছুটে যাই পিএনএসপি’র ডাকে। নতুনভাবে জানা বাঙালিয়ানার এ সংস্কৃতিকে। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা!

 

 

 

বিদায় চৈত্রসংক্রান্তি ১৪২৩ উপলক্ষে ৩০ চৈত্র, ১৪২৩; ছায়া ঢাকা শান্ত রোদেলা সেই বিকেলে পিএনএসপি প্রাঙ্গণে ভিড় জমিয়েছিল বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষেরা। ভিড় জমিয়েছিল তারা গান শুনতে এবং শোনাতে। সেই সঙ্গে ছিল মুড়ি-মুড়কির ব্যবস্থা। যেন প্রাণের উৎসবে মেতে ওঠে সেদিন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত অবধি চলেছে এই আয়োজন। পিএনএসপি প্রাঙ্গণে আগামীতে আরও বেশি এ ধরনের আয়োজন করার অনুরোধ রয়েছে আমাদের প্রতিবন্ধী শিল্পীদের পক্ষ থেকে। সেদিন আমার সঙ্গে আরও গান গেয়েছিলেন টঙ্গী থেকে আগত শ্রদ্ধেয় আখতার হোসেন, প্রতিবন্ধী শিল্পীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন সুর-সঙ্গী চক্রের সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলনসহ শিল্পী মিলন হোসেন, শিরিন জাহান মিতু, আইনীনা আজিজ শাম্মী, মিঠুন ইসমাইলী, সজল প্রমুখ।

 

চৈত্রসংক্রান্তি বাংলাদেশের সবচেড়ে বড় সর্বজনীন উৎসব হিসেবে বিবেচিত। মানুষের আচার ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্য, সামাজিক স¤পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি ইত্যাদি অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যমে সে জাতির সংস্কৃতি বোঝা যায়। আর এ সংস্কৃতি আমাদের চিন্তায় মননে অবস্থান করে নেয়। শিকড় গাড়তে শুরু করে আমাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশে। পরিবার তথা অভিভাবক এবং স্বজন সর্বোপরি শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক আবহ এ চর্চার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ নেই। পালনের চর্চা নেই। মুক্তবুদ্ধির চর্চা নেই। বিষয়গুলো আলোচনার দাবি রাখে। নতুবা নিজেদের বিকাশ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী হওয়াটা গর্বের নয় মোটেই; বরঞ্চ এগিয়ে যাওয়াটা সম্মানের। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় কতটা সচেতন? মনের সংকীর্ণতাকে কাটিয়ে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যের পথে আমরা কি হাঁটতে আগ্রহী?

 

বৈশাখ মানুষের সংকীর্ণতা দূর করে, হৃদয় বড় করে। সংক্রান্তি উদ্যাপন ও বৈশাখের বরণে অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলার মধ্য দিয়েই বাঙালি এক দিনের জন্য নয়, তিন শ পঁয়ষট্টি দিন ধরেই আদর্শ বাঙালি হয়ে উঠতে পারে। এ দেশের সকল নাগরিকÑ পাহাড়ি, আদিবাসী, বিহারি, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী মানুষ তথা নারী ও পুরুষনির্বিশেষে সকলেই যেন আদর্শ বাঙালি হয়ে উঠতে পারে। সকলে এক অঙ্গীকারে মিলিত হতে পারে। মানুষে মানুষে সব ভেদাভেদ দূর হয়ে যাক। সমাজে সকলে সমান, প্রত্যেকে মোরা প্রত্যেকের তরে। কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই

 

 নিশি অবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত,

 আমি আজি ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত।

 বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে রও, ক্ষমা কর আজিকার মত,

 পুরাতন বরষের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।