যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি

36

 

অপরাজেয় প্রতিবেদক

আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীর ঋতুকালীন পরিচর্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন জাতীয় বাজেটেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দের।

এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের হাইজিন বেজলাইন জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণেরও দাবি জানান প্রতিবন্ধী নারীরা।

 

প্রান্তিক কিশোরী ও নারীর মাসিক পরিচর্যা ও বাধাসমূহ; না বলা কথামালা শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের এক সেমিনারে প্রতিবন্ধী নারীরা এ দাবি জানান। মাসিক বিষয়ে শিক্ষা, বদলে দেবে জীবনধারা এই প্রতিপাদ্যে গত ২৮ মে বিশ্বব্যাপী মাসিক পরিচর্যা দিবস ২০১৭ পালিত হয়। এই দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে গত ১ জুন এলজিইডি ভবনের আরআরডিইউসি মিলনায়তনে আয়োজিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম এনডিসি। ওয়াটারএইডের দেশীয় পরিচালক জনাব ডা. খায়রুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডা. আশরাফি আহমেদ, সমাজসেবা অধিদফতরের উপসচিব (প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ); ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন); ড. ফাহমিদা হোসেন, উপপরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাসের (বি-স্ক্যান) সমন্বয়ে কনসার্ন উইমেন ফর ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট (সিডব্লিউএফডি), ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ফর রুরাল পুয়োর (ডর্প), ফ্রেশওয়াটার এ্যাকশেন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া (এফএএনএসএ), প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশেন বাংলাদেশ, সেনোরা, ওয়াশ এল্যায়েন্স বাংলাদেশ, ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশেন কোলাবরেটিভ কাউন্সিল (ডব্লিউএসএসসিসি) এবং ওয়াটারএইড যৌথভাবে এই আয়োজন করে।

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৪৯০টি উপজেলা এবং ৩৩০টি পৌরসভার ৪ হাজার ৮৮০টি কিশোরী ক্লাবে প্রতিবন্ধী কিশোরীদের অন্তর্ভুক্তকরণ এবং স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি প্যাড তৈরির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তা তৈরির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন সভার প্রধান অতিথি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম এনডিসি।

 

জাতীয় শিক্ষাক্রমে প্রতিবন্ধী নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্তসহ সরকারের এ বিষয়ক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী নারীর অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি আরও বলেন, মেয়েদের ঋতু পরিচর্যার বিষয়টি তারা গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন এবং ইতোমধ্যেই তাদের নতুন প্রকল্পের অধীন বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব টয়লেট নির্মাণ করার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন।

 

সমাজসেবা অধিদফতরের উপসচিব ডা. আশরাফি আহমেদ সরকারের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপের উল্লেখ করে বলেন, জরিপ চলমান। সবাইকে জরিপ ফরম পূরণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হবে সরকারের জন্য।

 

যারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা, পোশাক পরিধান এবং টয়লেট ব্যবহার করতে পারে না বা সমস্যার মুখোমুখি হয়, তাদের বিশেষত আরও বৈষম্যপীড়িত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারী, অটিস্টিক নারী, মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী নারী, ডাউন সিন্ড্রোম নারীদের ঋতুকালীন পরিচর্যা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য, পরিচ্ছন্ন থাকার পদ্ধতি বিষয়ে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নেওয়ার দাবি জানানো হয় মূল প্রবন্ধে। এর জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ এবং সব ধরনের প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীদের ওপর জরিপ ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রমের আহ্বান জানানো হয় এই প্রবন্ধে। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বি-স্ক্যানের সভাপতি সাবরিনা সুলতানা।

 

অন্যদিকে প্রান্তিক কিশোরী ও নারীবিষয়ক একটি প্রবন্ধে ওয়াশ অ্যালায়ে›স বাংলাদেশের দেশস্থ প্রতিনিধি অলোক মজুমদার বলেন, সারা দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ কিশোরী ও নারী ঋতুকালীন অসাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করে থাকে এবং এই কাপড় রোদে শুকাতে দেওয়া হয় না। শতকরা ৪০ ভাগ টয়লেটে পানি ও সাবান থাকে না। তিনি বলেন, লিঙ্গসমতা আনতে হলে সব নারীর ঋতুকালীন পরিচর্যায় স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।

মুক্ত আলোচনায় অন্য বক্তারা শিক্ষা ভবনসহ সব ক্ষেত্রে প্রবেশগম্য টয়লেট এবং স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়।

 

দেশের বেশ কিছু জেলা থেকে আগত বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী নারী ও শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অন্যান্য প্রতিবন্ধী নারী তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতি কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানান।

সারা দেশ থেকে আগত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের নারী প্রতিনিধি এবং প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী ছাড়াও এই বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিগণ, এনজিও প্রতিনিধিবৃন্দ, ওয়াশ নিয়ে কর্মরত মূলধারার সংস্থাসমূহের প্রতিনিধি, ইউএনএফপিএ, গ্লোবাল ওয়াশ অ্যালায়েন্স, ইউএনএইড, আইসিডিডিআরবি, সুইজারল্যান্ড দূতাবাস প্রতিনিধি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দসহ দেড় শতাধিক নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন সভায়।

 

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ইয়াকুব খান, সমন্বয়ক, ফানসা; রফিক জামান, পরিচালক, পিএনএসপি; সালমা মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক, বি-স্ক্যান; তেহসিনা খানম, ব্র্যান্ড এক্সিকিউটিভ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড; নাসরিন জাহান, নির্বাহী পরিচালক, ডিসঅ্যাবল্ড চাইল্ড ফাউন্ডেশন; মর্জিনা আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, ডিসঅ্যাবল্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি; আসিফ সিদ্দিকী, সভাপতি, প্যারেন্টস ফোরাম প্রমুখ।