ষাটের দশকের প্রেরণা

32

 

সৈয়দ রিপন

ষাটের দশকের সময়ের একটি গ্রাম। এক দেশের এক রাজার মতো সেই গ্রামেও বাস করত ছোট্ট এক মেয়ে। বাবা তাকে আদর করে ডাকতেন আকাশ। মায়ের ঘোর আপত্তি। ছেলেদের মতো এই নাম দেওয়াই যাবে না। লোকে কী বলবে! কিন্তু কীভাবে যেন এই নামটাই প্রচলন হয়ে গেল।

 

এই আকাশ কই গেলি! দুপুর হয়ে এলো এখনো ভাত খেলি না। মা সারা বেলা এভাবেই মেয়েকে সামলে রাখেন। হঠাৎ মায়ের মন কালো হয়ে গেল। মেয়ের বাবা এবার জেদ করছে মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলবে। তাও যেনতেন শিক্ষিত না, একবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাবুদের মতো পড়াবে। মায়ের সেই আগের রোগ ধরা পড়ল। লোকে কী বলবে! একলা মেয়ে কীভাবে চলাচল করবে! এবার মা একা নন। আশপাশের ময়মুরব্বি সকলেরই একই কথা। এই নিয়ে প্রতিদিনই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় চলছে।

 

এসবের মধ্যেই আকাশের বেড়ে ওঠা। তারপর একদিন সে বাবার লক্ষ্মী রাজকন্যার মতো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে উচ্চ শিক্ষায় আলোকিত হলো। মা এবার ব্যতিব্যস্ত মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য। ওদিকে আকাশ জেদ ধরেছে, সে এখন চাকরি করবে। তাও আবার শহরের সরকারি চাকরি। মা কিছুটা আমতা-আমতা করলেও এবার ভাবলেন, অনেক তো হলো সমাজের পক্ষে কথা বলা। এবার না হয় মেয়ের পক্ষে থাকি।

আকাশের আকাশে সুন্দর ছোট ছোট শুভ্র মেঘ জমা হতে থাকল। সরকারি চাকরি হলো। ছোট্ট পরিবার হলো। সব স্বপ্নই আকাশের পূরণ হতে লাগল। তবু আকাশ কিছুটা মনমরা।

বাবা-মা তো বাবা মা-ই। তারা বুঝলেন মেয়ে তাদের ভালো নেই। বাবা আকাশকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, আমার আকাশ মায়ের একি হলো!

 

আকাশ বাবাকে সজোরে আঁকড়ে ধরে বলে ওঠে, বাবা! আমি তো সমান শ্রম ও মেধা দিই। তবু ওরা আমাকে কেন প্রাপ্য সম্মান দেয় না! আমার কাজের পরিবেশ, আমার চাহিদা ওরা পুরুষশাষিত প্রশাসন কী বুঝবে। আমি বারবার প্রশাসনকে চিঠি দেই। তর্ক করি। তবু প্রশাসন মনে করে, নারীর এত প্রয়োজনীয়তা নেই। নারীর হয়ে নারীর জন্য পুরুষ কীভাবে কথা বলবে বাবা? পুরুষেরা কি নারীর সব চাহিদা বুঝতে পারে!

 

বাবা মুচকি হাসি দিয়ে মেয়েকে বসালেন। নিজেও পাশে বসতে বসতে বললেন, আরে আমার লক্ষ্মী মেয়ে! তুই যদি এভাবে ভেঙে পড়িস, তাহলে এই দুষ্ট চক্র ভাঙবে কে। সমাজ ও প্রশাসনকে বোঝাতে শুরু করে দে নারীর আলাদা সত্তা। নারীর স্বকীয়তা-নিজস্বতা নিয়েই সে মহীয়ান। তার ওপর রয়েছে নারীর কর্মকান্ডের অর্থনৈতিক গুরুত্ব। বারেবারে বলতে থাক। তবেই আগল ভাঙবে। তাহলেই না সরকার বাধ্য হবে এই দুষ্ট চক্র ভেঙে তোদের সাহায্য করতে।

অবশেষে শুরু হলো দেশব্যাপী নারীর সম-অধিকারের আন্দোলন। এ রকম অসংখ্য আকাশ মিলে নারীর ওপর কর্তৃত্ব করতে চাওয়া পুরুষের শোষণ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারল। নারী স্বাধিকারের আন্দোলনের সফলতা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং নারীকে কর্মক্ষম, স্বনির্ভর; বিশেষ করে সমাজের সর্বস্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন করতে গঠিত হলো আলাদা একটি অধিদফতর।

 

সাগর গল্পটা পড়া শেষ করতে না-করতেই মা এসে পড়ল। সাগর এক গাল হাসি দিয়ে বলল, চল মা আমরা স্কুলে যাই। মা সাগরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। গন্তব্য সাগরের স্কুল।

 

এভাবে মা সাগরকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যায়। সমাজ তো সমাজই। তাদের আবার আবেগ একটু বেশি। সাগর আর তার মা এখন আর এসব বিষয় তেমন একটা পাত্তা দেয় না। এক পড়ন্ত বিকেলে সাগর মাকে বলল, মা আমার ইচ্ছে আমি পড়া শেষ করে চাকরি করব। কিন্তু আমাদের চলাচলের জন্য যে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটা কি সাধারণ মানুষ বুঝবে। তুমি তো আমার মা, আমার প্রয়োজন বুঝতে পারো। কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। আমার চাহিদার ভিন্নতা, প্রয়োজন কাকে জানাব। সরকার আমাদের জন্য যা কিছুই করে, তা চালায় সাধারণ মানুষ। হতে পারে তারা বেশির ভাগই ভালো মনের মানুষ। কিন্তু তারপরও তারা আমাদের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা কীভাবে বুঝতে পারবে। আমার আজ বারবার মনে হচ্ছে, গল্পের আকাশ আপুর মতো আমাদেরও এই দুষ্ট চক্র ভাঙতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্ব প্রতিবন্ধী মানুষেরাই দেবে।

 

মা, সাগরের কপালে চুমু দিয়ে বলল, এ জন্য আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতরের দাবিতে ৪ মার্চ থেকে দেশব্যাপী আন্দোলনের অংশীদার হতে যাচ্ছি। যখন আমাদের জেলায় হবে, তোকে নিয়ে আমি যাব সেখানে। সরকার অবশ্যই তোদের কথা বুঝবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সরকার অবশ্যই এই দুষ্ট চক্র ভাঙবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর গঠন করবে। যেখান থেকে তোদের চলাচলের রাস্তা তৈরি হবে। তোরা সমানভাবে অংশীদার হতে পারবি এই সমাজের। পাবি সমমর্যাদা। প্রতিষ্ঠা পাবে সমনাগরিক অধিকার।