গণপরিবহন প্রবেশগম্য করার দাবীতে প্রতিবন্ধী নারীরা সোচ্চার

বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস ২০১৯ উপলক্ষে প্রতিবন্ধী মানুষ ও প্রতিবন্ধী নারীর স্বাধীন চলাচল ও যাতায়াতের প্রেক্ষাপট জানতে এবং এ বিষয়ে সরকারি বেসরকারি পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত হতে গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী নারীর অবস্থান শীর্ষক একটি গণশুনানীর আয়োজন করে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এন্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই গণশুনানীতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব নাসির উদ্দিন তরফদার (উপসচিব) প্রকল্প পরিচালক – ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ), অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), বুয়েট, জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, ম্যানেজার – টেকনিক্যাল, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (বিআরটিসি) এবং জনাব ফিরোজ আলম মিলন, দপ্তর সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বি-স্ক্যান এর সমন্বয়কারি জনাব ইফতেখার মাহমুদ বি-স্ক্যান এর পরিচিতি এবং বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস পালনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন।

নিরাপদ সড়ক চাই এর জনাব ফিরোজ আলম তাঁর বক্তব্য বলেন, রেলমন্ত্রণালয়ের সাথে তারা একটি সমঝোতা চুক্তি করেছেন তাতে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হয়ে সোচ্চার হওয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত ব্যবস্থার দাবীকে সংহতি জানিয়ে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।

এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের গণপরিবহনে বা যাতায়াতের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। এ বিষয়ে এআরআই গবেষণা করতে আগ্রহী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করবেন বলে আশা করছেন।

বিআরটিসি এর মোস্তাফিজুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য উপযোগি বাস নতুন করে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভাড়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ছাড় না পেলে বিআরটিসির হটলাইন নাম্বারে যোগাযোগ করতে বলেন। বিআরটিসির চালকদের প্রশিক্ষণে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টি উলে¬খ আছে বলে জানান এবং বিআরটিএ এর নতুন চালক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েলে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান। তিনি আরও জানান, সংরক্ষিত আসন নয়টি থেকে বর্তমানে তেরোটি করা হয়েছে। যার ফলে প্রতিবন্ধী মানুষেরা আগের থেকে বেশি সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকদের অসচেতনতার কারণে তারা কাঙ্খিত আসন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা প্রতিবন্ধী মানুষদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

জনাব নাসিরুদ্দিন তরফদার ডিটিসিএ এর পক্ষ থেকে বলেন,  বিআরটি, এমআরটি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রতিবন্ধী মানুষদের উপোযগি করে তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় অযান্ত্রিক বাহন ( রিক্সা) সংরক্ষিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য যাতায়াত বিবেচনা করা হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ে তাদের নিজেদেরকেই সোচ্চার হতে হবে।

এর আগে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিবন্ধী মানুষেরা প্রবেশগম্য যানবাহন এবং সচেতনতার অভাবে গণপরিবহনে তাদের ভোগান্তীর কথা তুলে ধরেন।

হুইলচেয়ার ব্যবহারকারি আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো প্রতিবন্ধী মানুষদের বিষয়ে পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। আমরা এর বাস্তবায়ন কবে পাবো ?

সংরক্ষিত আসনে প্রতিবন্ধী নারীদের অবস্থান চান কর্মজীবি শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী সানজিদা আক্তার। চলন্ত বাসে উঠানামার ক্ষেত্রে বাসে উঠতে না পারায় রিক্সায় অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী রেবেকা মুন্সি সীমা।

শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সগীর হোসাইন সকল বাস হুইলচেয়ার উপযোগি হওয়ার দাবী তোলেন। শুধুমাত্র অল্প কিছু বাস প্রবেশগম্য হলে সেই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘক্ষণ।

শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারী হাওয়া আক্তার বলেন, বাসে তারা প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে রেয়াতী ভাড়া পান না। এ বিষয়ে সমাজসেবায় অভিযোগ জানালে তারা বলেন এটা তাদের বিষয় নয় পরিবহন মালিকদের অভিযোগ জানান।

পরিবহন শ্রমিকদের অসহযোগিতার কারণে বাসে চড়তে অসুবিধার কথা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী তনিমা।

গণপরিবহনে যৌনসহিংসতা বন্ধ করতে আহ্বান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিমউদ্দীন হলের হল সাংসদ শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নাঈম মোল্লা।

সমাপনী বক্তব্যে বি-স্ক্যান এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, ২০১২ সাল থেকে বিআরটিসির সাথে কাজ করে আজও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রবেশগম্য বাসের ব্যবস্থা করতে পারেননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ  করেন। টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট ১১.২ এ অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারি জনগোষ্ঠী নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং বয়োবৃদ্ধ মানুষের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রেখে প্রধানত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যানবাহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সুলভ এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থায় সকলের অভিগম্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয় বাস্তবায়নে সরকারের দূর্বল পদক্ষেপ এবং বাস মালিকদের প্রবেশগম্য বাস আমদানিতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনার অভাবকে দায়ী করেন তিনি। চাকুরি এবং শিক্ষার মতো যাতায়াতকে একীভ’ত পরিকল্পনার অধীনে আনতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের সাধারণ নারীদের জন্য গৃহিত নানামূখি পদক্ষেপে বাদ পড়ে যাচ্ছেন প্রতিবন্ধী নারীরা। এই বিষয়ে তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় গার্লস অ্যাডভোকেসি এ্যালায়েন্স প্রকল্পের আওতায় এই আয়োজনটি করা হয়।